আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না, যে তারা কী দেখেছিল। তুমি কি জানো, সাধারণ শিল্পে একটা জলজ্যান্ত মানুষ বা প্রাকৃতিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা, আর কৃত্রিমভাবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের জন্য স্টুডিয়োতে বসে একের পর এক ছবি আঁকার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে। তবে আমি বলব, ওই শিল্পীর অদ্ভুত এক অন্তদৃষ্টি ছিল। তিনি মডেলের ওপরে ন্যস্ত করতে পারতেন বিশ্বজগতের সেই অলৌকিক দৃশ্যাবলি। যে প্রেততুল্য জগতে তিনি বাস করতেন, সেইসব দৃশ্য। ঠিক যেমন একজন জীবন্ত মানুষ আঁকা চিত্রশিল্পীর কাজের সঙ্গে একজন করেসপন্ডেন্স স্কুলের ছাত্রের তৈরি বিকৃত কার্টুনের পার্থক্য থাকে; ঠিক তেমনই শুধুমাত্র নরকের কসাইয়ের স্বপ্ন-দেখা মানুষদের আঁকা ছবি থেকে নিজের আঁকাতে বৈষম্য তৈরি করতে পারতেন তিনি।
যদি আমি কখনও দেখতে পারতুম, যা পিকম্যান দেখেছিল! তাহলে… আমি হয়তো বাঁচতাম না, যদি আমি দেখতে পেতাম, যা ওই মানুষটা দেখেছিল। যদি সে আদৌ মানুষ হয় তো…। নাহ! আচ্ছা, আরও গভীরে যাওয়ার আগে, এসো, এক গ্লাস করে খাওয়া যাক।
তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, পিকম্যানের আসল গুণ ছিল মুখাবয়ব আঁকাতে। গোয়্যার পরে আর কেউ অভিব্যক্তির এমন মোচড় অথবা আকৃতিগত দিক থেকে এতটা খাঁটি নারকীয়তা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। গোয়্যার আগেও মধ্যযুগীয় কিছু মানুষ ওই বেয়াড়া বিদঘুটে মুখওয়ালা অমানুষগুলো অথবা ওই বিকট কাল্পনিক জীবগুলো বানিয়েছিল। যেগুলো নোতরদাম বা মন্ট সেইন্ট মিচেল-এর স্থাপত্যের মধ্যে আছে এখনও। তারাও কি ওইসব জিনিসে বিশ্বাস করত? কে জানে, তারা হয়তো ওই জীবগুলোকে দেখেওছিল। মধ্যযুগে বেশ কিছু অবিশ্বাস্য গোপন ও রহস্যময় পর্ব আছে।
আমার মনে পড়ল, তুমি একবার পিকম্যানকে নিজের থেকেই জিজ্ঞাসা করেছিলে, ওই তুমি চলে যাওয়ার আগের বছরেই, কোন আকাশ থেকে সে অমন কল্পনা আর দর্শন পেল। সে তোমার মুখের ওপরে বিশ্রীভাবে হেসে উঠেছিল না? ওটার খানিকটা কারণ, রেইড সেই সময় পিকম্যানের সংস্পর্শ ত্যাগ করেছিল।
আরে, রেইড। সেই রেইড, যে তুলনামূলক বিকারতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করছিল তখন। অবশ্য ওই বিষয়টাই ছিল অমন। কুলকুণ্ডলিনী-মার্কা বিভিন্ন আড়ম্বরপূর্ণ শব্দ দ্বারা ভরতি। এ ছাড়াও ছিল আত্মিক এবং শারীরিক বিভিন্ন বিবর্তনীয় দ্যোতনা। তিনিই বলেছিলেন, পিকম্যান তাঁকে প্রতিদিনই বেশি বেশি করে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। তিনি ক্রমেই আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন৷ রেইড বলেছিলেন, পিকম্যানের আকৃতি এবং অভিব্যক্তি ধীরে ধীরে এমন দিকে পরিবর্তিত হচ্ছিল যে, ব্যাপারটা তাঁর মোটেও ভালো লাগছিল না। পরিবর্তনটা যেন ঠিক মনুষ্যপদবাচ্য নয়। এমনকী তিনি নাকি এটাও বলেছিলেন যে, পিকম্যান অস্বাভাবিক রকমের ছিটগ্রস্ত হয়ে গেছে।
আমার যত দূর মনে পড়ে, তুমিই রেইডকে বলেছিলে। পিকম্যানের ছবিগুলোই আসলে তার নার্ভের ওপরে চাপ ফেলছে, অথবা তার অস্বাভাবিক কল্পনাই তার চেতনাকে নষ্ট করে ফেলছে। আমি নিজেই যখন রেইডকে এই কথাগুলো জানিয়েছিলাম, তখন রেইডও আমাকে বলেন যে, তুমি আর রেইড এই ব্যাপারে একমত ছিলে।
কিন্তু মনে রেখো, আমি কিন্তু পিকম্যানকে এইসব কিছুর জন্যে ছেড়ে আসিনি। বরং উলটোটাই হচ্ছিল, ওই অসাধারণ কীর্তি নারকীয় ভক্ষণ ছবিটার দেখার পর থেকে, তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ক্রমে বেড়েই যাচ্ছিল। যেমনটা তুমি জানো, তেমনটাই ঘটেছিল। ক্লাবে ওটা প্রদর্শনই করা হয়নি। আর ফাইন আর্টসের মিউজিয়াম তো ওটাকে উপহার হিসাবেও গ্রহণ করেনি। আর আমি এটাও শপথ নিয়ে বলতে পারি যে, কেউ ওটা কিনবেও না। তো পিকম্যান ওটা নিজের বাড়িতেই রেখে দিয়েছিল, চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এখন ওর বাবার কাছে আছে ওটা, সালেমে। তুমি তো জানোই পিকম্যান পুরোনো সালেমীয়দের একজন। ১৬৯২-তে পিকম্যানের পরিবারের একজন নারীকে ডাকিনী সন্দেহে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
পিকম্যানের ডাকে সাড়া দেওয়াটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষত যখন আমি অদ্ভুত চিত্রকলার বিষয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম, তার পর থেকেই। হয়তো তার আঁকাই আমাকে এই ব্যাপারে মাথা ঘামাতে বাধ্য করেছিল। তথ্যের খনি হিসাবে তাকেই খুঁজে পেয়েছিলাম। অবশ্য আমার লেখাটা তৈরি করতে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামতও আমাকে সাহায্য করছিল।
পিকম্যান আমাকে তার কাছে যে সমস্ত রঙিন ছবি আর রেখাঙ্কন ছিল, সব কটা দেখিয়েছিল। ওগুলোর মধ্যে এমন কিছু কালি আর পেনের স্কেচ ছিল, ক্লাবের অন্য সদস্যরা ওগুলো দেখলে তাকে নির্ঘাত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত সদস্যপদ থেকে।
অতএব যেটা বলাই যায় যে, খুব কম সময়ের মধ্যেই আমি পিকম্যানের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একটা ছাত্রের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে শুনতাম পিকম্যানের শিল্পতত্ত্ব আর তাদের দার্শনিক ব্যাখ্যা। অবশ্য কথাগুলো তাকে ডেনভার পাগলাগারদে পাঠাবার পক্ষে একদম যোগ্য ছিল। তার কাছে অন্যান্য মানুষের আসা-যাওয়া যত কমতে থাকল, ততই আমার বীরভক্তির পারদ চড়তে লাগল। সে আর তার অদ্ভুত চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণভাবে আমাকে পেয়ে বসল।
একদিন সন্ধেবেলা সে আমাকে বলল, আমি যদি একদম মুখ বন্ধ করে থাকি আর একদমই খুঁতখুঁত না করি তাহলে সে আমাকে একদম অন্যরকম একটা জিনিস দেখাবে। এমন একটা জিনিস, যা এত দিন যে সমস্ত জিনিস দেখেছি, সেগুলোর থেকে একটু বেশিই দুষ্পাচ্য।
