[প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৪ সালের জুন মাসে গল্পটি দ্য ফ্যান্টাসি ফ্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
ভাষান্তর: সুমিত বর্ধন]
পিকম্যানের মডেল
পিকম্যানের মডেল (PICKMANS MODEL)
[পিকম্যান আর লাভক্র্যাফটের মধ্যে মিল প্রচুর। পিকম্যানও তাঁর মতোই বাস্তবতার সঙ্গে মহাবিশ্বের অজানা ভয়ংকরকে নিয়ে ছবি আঁকে। পিকম্যানের অদ্ভুত ছবি যেমন শিল্প হিসেবে অত্যন্ত উঁচুদরের হলেও শিল্পবিশেষজ্ঞরা সেগুলিকে মানতে চান না, সেরকম লাভক্র্যাফটেরও ধারণা ছিল তাঁর গল্পগুলি বিশ্বসাহিত্যের অন্যান্য সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বোস্টনের উত্তর অংশে যথেষ্ট সময় কাটিয়ে লাভক্র্যাফট গল্পটির পটভূমি সেখানে ফেলেছিলেন।]
এলিয়ট, মোটেই ভেব না যে, আমি পাগল হয়ে গেছি। এই পৃথিবীতে অনেক মানুষেরই আমার থেকেও অদ্ভুত ধরনের কুসংস্কার আছে। অলিভারের দাদুকেই দেখো, বুড়োটা মোটরগাড়িতে চাপতে চায় না। তো, আমি যদি ওই ফালতু সাবওয়েটা পছন্দ না করি, সেটা আমার ব্যাপার। আর ট্যাক্সিতে করেই যখন এখানে আরও তাড়াতাড়ি আসা যায়, তাহলে আমি সাবওয়ে ব্যবহার করতে যাবই বা কেন? ট্রেনে করে আসতে চাইলে পার্ক স্ট্রিট থেকে হেঁটে সোজা পাহাড়ের মাথায় উঠতে হত।
আমি জানি… গত বছর তুমি যখন আমায় দেখেছিলে, তখন আমার অবস্থা আরও খারাপ ছিল। কিন্তু তার জন্যে একটা হাসপাতাল সঙ্গে করে নিয়ে চলার তো কোনও কারণ নেই। ভগবান জানেন, আর আমিও বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র ভাগ্যের জোরেই আমি সুস্থ আছি আজকে। তা ছাড়া… তুমি তো এত কৌতূহলী ছিলে না কখনও!
ঠিক আছে, যদি তুমি শুনতেই চাও। আর, কেনই বা চাইবে না? তোমারও উচিত তো। আমি ভেবেছিলাম, তুমি যখন জানতে পারবে, আমি আর্ট ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেছি আর পিকম্যানের সঙ্গেও বন্ধুত্ব বিচ্ছেদ করেছি; তখন তুমি ওই অভিভাবকদের মতো আহা-উঁহু-মার্কা চিঠি লিখে পাঠাবে। আমি অবশ্য পিকম্যানের খোঁজে একবার ফিরে গিয়েছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তবে আমি, আমি ছিলাম না তখন।
না! আমি জানি না পিকম্যানের কী হয়েছিল! আর সে কথা আমি জানতেও চাই না। তুমি নিশ্চয়ই কিছু তথ্য পেয়েছ, যখন আমি ওদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। না, না, আমি ভাবতেও চাই না সে কোথায় যেতে পারে। যদি খোঁজার হয় তাহলে পুলিশকে খুঁজতে দাও। যদিও পুলিশ জানেই না যে, সে পুরোনো নর্থ এন্ড প্লেসটা পিটার ছদ্মনামে ভাড়া নিয়েছে। আমি ঠিক জানি না, ওই জায়গাটা আবার চিনতে পারব কি না– অবশ্য সে চেষ্টা আমি আর করিনি; দিনের আলোতেও না।
হাঁ, আমি জানি… আমি ভয় পাই যে, আমি জানি। আজকাল আমি সাবওয়েও ব্যবহার করতে পারি না। এমনকী, ভাঁড়ারঘরেও নামতে পারি না। উফ! আমি ভেবেছিলাম, তুমি বুঝবে আমার সঙ্গে কী হয়েছে! যখন আমি পুলিশের কাছে কিছু জানাতে চাইনি, তখনই বুঝবে তুমি। ওরা আমাকে বলেছিল ওদেরকে রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে। যদিও রাস্তাটা আমিই একমাত্র জানতুম, কিন্তু ওখানে ফিরে যাওয়া! রক্ষে করো!
বিশ্বাস করো, সেই দিন আমি পিকম্যানের সঙ্গ কোনও সামান্য কারণে ছেড়ে দিইনি। অন্তত ওই ডক্টর রেইড বা জো মিন্ট অথবা বসয়ার্থের মতো কোনও সংকীর্ণমনা বুড়ির মানসিকতায় তৈরি কারণগুলোর জন্য তো নয়ই। …উঁহু! উঁহু। পিকম্যানের আঁকা ওই অমানুষিক রোগগ্রস্ত ছবিগুলো আমাকে কোনও শক দেয়নি। বরং সেই দিন আমি গর্ব বোধ করছিলাম। পিকম্যানের মতো একজন জিনিয়াসের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে বলে আমার বুক ফুলে উঠেছিল। তার শিল্পগুলো মানুষকে যেখানেই টেনে নামাক-না কেন, রিচার্ডের থেকে উঁচুদরের আঁকিয়ে বোস্টন আর কখনও পায়নি, যত দিন না পিকম্যান এসেছে। আমি আগেও এই কথা বলতুম, আর এখনও বলব। আমার বক্তব্য থেকে আমি একচুলও সরে আসিনি, আসবও না। এমনকী ওর ওই বিখ্যাত নারকীয় ভক্ষণ ছবিটা দেখার পরেও।
আসলে, পিকম্যানের শিল্পকলা বোঝার জন্য যেমন অঙ্কনক্ষেত্রে গভীরতার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন জীবনের এক অন্তর্নিহিত উপলব্ধির। আজকাল তো যে-কোনও পত্রিকার প্রচ্ছদই নিজেদেরকে খানিকটা লাল-কালো রঙে চুবিয়ে ঘোষণা করতে থাকে, এই হল অন্ধকারের আতঙ্ক অথবা ডাকিনীর প্রতিহিংসা অথবা খোদ শয়তানের প্রতিবিম্ব। কিন্তু আমি মনে করি, একমাত্র সত্যিকারের শিল্পীরাই পারে প্রকৃত আতঙ্ককে চিত্রকলায় ফুটিয়ে তুলতে। তার অনুষঙ্গে প্রয়োজন শুধু দুটি জিনিস, ভয়ের নিবিড় উপলব্ধি এবং আন্তরিকতা। কারণ একজন প্রকৃত শিল্পীই জানে আতঙ্কের অঙ্গসংস্থান অথবা ভয়ের দেহবিদ্যা। সঠিক লাইন আর অনুপাত, যা সেই প্রচ্ছন্ন প্রবৃত্তিকে অথবা পুরুষানুক্রমে বইতে থাকা জিনের স্মৃতিতে রক্ষিত ভয়কে দৃঢ়ভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। সঠিক রঙের অনুপাত আর আলোছায়ার খেলাই নাড়িয়ে দেয় অন্তরে লুকিয়ে-থাকা সুপ্ত অজানা বোধটাকে।
তোমাকে অবশ্য এই ব্যাপারে ব্যাখ্যা করে বলার কিছুই নেই। তুমি তো জানোই, কেন ফুজেলির আঁকা ছবি মনের ভেতরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, আর একটা সস্তা ভূতের গল্পের প্রচ্ছদ মানুষকে হাসতে বাধ্য করে। এই জীবনের বাইরের কিছু একটা ওরা অনুভব করেছে। সেটা দিয়েই ওরা আমাদের মুহূর্তের জন্যে আটকে ফ্যালে। ডোর পেয়েছিল। সাইম পেয়েছে। আঙ্গালোরা অব শিকাগো ছবিতে যা ফুটে উঠেছে। আর পিকম্যান, সে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে এমনভাবে পেয়েছে, যা আগে কেউ কখনও পায়নি। আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব, কেউ যেন কখনও না পায়।
