চেতন বস্তুর মধ্যে যে প্রাণীগুলো সর্বপ্রথম চোখে পড়ে, তাদের কুৎসিত মিশকালো অবয়ব যেন জেলি দিয়ে গড়া। যন্ত্রের কম্পনের সঙ্গে তাল রেখে থিরথির করে কাঁপে তাদের শরীরগুলো। অতুল সংখ্যায় তারা ভেসে বেড়ায় যেন কোনও অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে। পরস্পরের শরীরের মধ্যে দিয়ে অনায়াসে অতিক্রম করে যায় তাদের থলথলে চেহারাগুলো। মাঝেমধ্যে প্রাণীগুলো অতর্কিত আক্রমণে গ্রাস করে পরস্পরকে। আক্রান্ত জীবটি বেমালুম মিলিয়ে যায় কোনওরকম চিহ্ন না রেখেই।
শিউরে উঠলাম আমি, হতভাগা চাকরবাকরগুলো কী করে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। প্রথমবার নজরে আসা আমাদের চারপাশের গোপন জগৎটার বাকি খুঁটিনাটিগুলোও ঠাহর করতে চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল জীবগুলোর চিন্তাই।
এতক্ষণ আমার ওপর নজর রাখছিল ক্রফোর্ড। এবার ভেসে এল তার কণ্ঠস্বর।
দেখছ? ওদের দেখতে পাচ্ছ? তোমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে তোমার চারপাশ দিয়ে, তোমার মধ্যে দিয়ে কারা ছিটকে ছিটকে ভেসে বেড়ায়, এবার বুঝতে পারছ? আকাশ, বাতাস– এসব আদতে কোনও প্রাণীতে গড়া, এবার বুঝতে পারছ? এবার বলল, সীমানার প্রাচীর আমি ভেঙে নামিয়েছি কি না? কোনও জীবিত মানুষ এযাবৎ যা দেখেনি, সেইসব জগৎ তোমায় দেখিয়েছি কি না? বলো! বলো!
সেই তুমুল বিশৃঙ্খলার মধ্যে চিৎকার করতে থাকে ক্রফোর্ড, ক্রোধে বিকৃত মুখখানা নিয়ে আসে আমার মুখের কাছে। পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর আক্রোশে চোখ দুটো তার জ্বলতে থাকে আগুনের মতন। বিরক্তিকর গুঞ্জন তুলে চলতে থাকে যন্ত্র।
কী ভাবলে? ওই এলোমেলো ভাসতে-থাকা জীবগুলো নিকেশ করেছে চাকরবাকরদের? ওহে বুদ্ধ, ওগুলো নিরীহ। কোনও ক্ষতি করে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও চাকরবাকরগুলো উধাও হয়ে গেছে, তাই না? কী করে বলো তো? তুমি আমায় বাধা দিয়েছিলে। যখন আমার দরকার ছিল প্রচণ্ড উৎসাহের, তখন নিরুৎসাহ করেছিলে তুমি আমায়। সৃষ্টিরহস্যের সত্য তুমি জানতে চাওনি, এত বড় কাপুরুষ তুমি। কিন্তু এইবারে পেয়েছি তোমায়। কীসে তুলে নিয়ে গেছে চাকরগুলোকে? কেন গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়েছিল তারা? জানো না, না? কোনও সমস্যা নেই, এখনই জানতে পারবে। তাকাও আমার দিকে। শোনো ভালো করে, কী বলছি। তোমার কী মনে হয়ে বস্তু, আকার– এসবের আদৌ কোনও অস্তিত্ব আছে? ওহে, সৃষ্টির যে গভীরে আমি গিয়েছি, তোমার পুঁচকে মগজখানা তার কল্পনাও করতে পারবে না। অনন্তের গণ্ডির বাইরেটা অবধি দেখতে পেয়েছি আমি। নক্ষত্রলোক থেকে টেনে এনেছি দানবদের। এক-এক পদক্ষেপে জগৎ থেকে জগৎ টপকে যারা মৃত্যু আর মত্ততা বিলোয়, নিজের কাজে লাগিয়েছি সেইসব ছায়াশরীরকে করায়ত্ত করেছি শূন্যতাকে। যারা মানুষকে গ্রাস করে, যাদের স্পর্শে মানুষ বিলীন হয়ে যায়, তারা সব আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে বটে, কিন্তু তাদের কী করে এড়াতে হয়, আমার জানা আছে। কিন্তু তুমি পড়বে তাদের খপ্পরে, বুঝেছ? যেমন চাকরগুলো পড়েছিল। দারুণ, না? বলেছিলাম না, নড়াচড়া করাটা বিপজ্জনক। তোমায় এতক্ষণ নড়াচড়া না করতে দিয়েই বাঁচিয়ে রেখেছি। বাঁচিয়ে রেখেছি, যাতে দেখতে পাও আরও অনেক কিছু শুনতে পাও আমার কথা। নড়লে অনেক আগেই ওদের খপ্পরে পড়ে যেতে তুমি। তবে চিন্তা কোরো না। ওরা তোমাকে কোনওরকম যন্ত্রণা দেবে না। চাকরগুলো কষ্ট পেয়ে চিৎকার করেনি, চিৎকার করেছিল ওদের দেখে। আমার পোষ্যরা যে দুনিয়া থেকে আসে, সেখানকার সৌন্দর্যের মাপকাঠি অনেকটা আলাদা। আমাদের চোখে ওদের চেহারাটা তাই বড় একটা সুন্দর ঠ্যাকে না। আমি প্রায় একবার দেখে ফেলেছিলাম ওদের, কোনওমতে সামলে নিয়েছি। কিন্তু আমি চাই, তুমি ওদের দিকে তাকাও। চিন্তা কোরো না, বিলীন হয়ে যাওয়াটা মোটেই যন্ত্রণাদায়ক নয়। আরে, তাকাও-না! জানতে ইচ্ছে করছে না ওদের কেমন দেখতে? সাধে কি বলি, তুমি বৈজ্ঞানিক নও! কাঁপছ? আমার আবিষ্কার-করা অনন্য জীবদের দেখার আগ্রহে কাঁপছ? নড়ছ না কেন তাহলে? ক্লান্ত লাগছে? চিন্তা কোরো না। ওরা এসে পড়ল বলে। দ্যাখো, দ্যাখো! আরে, দ্যাখোই-না! ঠিক তোমার বাঁদিকের কাঁধের পেছনে।
এর বাকি অংশটুকু সংক্ষিপ্ত। খবরের কাগজের কল্যাণে সেটুকুও আপনাদের জানা। গুলির আওয়াজ পেয়ে পুলিশ আসে। দেখে ক্রফোর্ড মৃত, আর আমি পড়ে আছি অচৈতন্য হয়ে। পুলিশ প্রথমে আমায় গ্রেফতার করে, কারণ আমার হাতে পিস্তল ধরা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানের পর যখন দেখা গেল যে, ক্রফোর্ড মারা পড়েছে মৃগীরোগে, আর গুলি লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে কেবল যন্ত্রটা, তখন ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই পুলিশ আমায় ছেড়ে দেয়। যা দেখেছি, তার সবটুকু খোলাখুলি প্রকাশ করিনি। মনে হয়েছিল, করোনার হয়তো আমার সেসব কথায় সন্দেহ করবেন। কিন্তু যেটুকু বলেছিলাম, সেটুকু শুনে ডাক্তারটি রায় দিয়েছিলেন যে, খুনে পাগল ক্রফোর্ড নিঃসন্দেহে আমায় কোনওভাবে সম্মোহন করেছিল।
ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করতে পারলে আমার ভালোই হত। চারপাশের আকাশ বাতাসের কথা ভাবলেই মনে যে চিন্তাগুলো উঠে এসে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় প্রতিটি স্নায়ুতে, তার থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া যেত। আমি যে একা আছি, আমার সে বোধ চলে গেছে। চলে গেছে সব রকমের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ। ক্লান্ত হয়ে পড়লে মনে হয়, ভয়ংকর কিছু তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমায়। কিন্তু তা-ও ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করতে পারি না একটিমাত্র কারণে– যে চাকরবাকরগুলোকে ক্রফোর্ড টিলিংহাস্ট খুন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়, তাদের দেহগুলো আজ পর্যন্ত পুলিশ খুঁজে পায়নি।
