এই স্পষ্ট ছবিখানাও কিছুক্ষণের মধ্যেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। ফুটে উঠল আর-এক ভয়ংকর মানসচিত্র। চারপাশে যেন কেবল আদি-অন্তহীন এক নিঃসঙ্গ শূন্যতা। শব্দহীন, দৃশ্যবস্তুহীন সে শূন্যতায় যেন অস্তিত্ব নেই কোনও কিছুরই। শিউরে উঠলাম ছোট শিশুর মতনই। আতঙ্কে পেছনের পকেট থেকে টেনে বের করলাম বহুকালের সঙ্গী পিস্তলখানা।
সেই নিঃসীম শূন্যতার কোনও এক সুদূর প্রান্ত থেকে ধীরগতিতে ভেসে এল অদ্ভুত ধ্বনি। অতি অস্পষ্ট তার আওয়াজ, অতি মৃদু তার কম্পন, অথচ তাকে সুরেলা বলে চিনে নিতে ভুল হয় না। সে ধ্বনিতে মেশানো মাত্রাছাড়া বন্যতা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দিল কেমন একটা হালকা যন্ত্রণা। আনমনে ভাঙা কাচ ঘষলে যেমন অনুভূতি হয়, বোধ করলাম সেইরকম একটা কিছু। সেই সঙ্গে শব্দের উৎস থেকে ভেসে এল হিমশীতল দমকা বাতাস, বয়ে গেল আমার পাশ দিয়ে।
বসে রইলাম নিশ্বাস বন্ধ করে। বুঝতে পারলাম, শব্দ আর বাতাস, প্রকোপ বাড়ছে দুটোরই। মনে হতে লাগল, আমি যেন বাঁধা রয়েছি রেললাইনের সঙ্গে, আর দূর থেকে ছুটে আসছে কোনও দানবিক ইঞ্জিন।
ডাকতে গেলাম ক্রফোর্ডকে। সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল সমস্ত অদ্ভুত অনুভূতি। ঘরের ম্রিয়মাণ আলোয় নজরে পড়ল কেবল ক্রফোর্ড আর তার যন্ত্রখানা। ক্রফোর্ডের দৃষ্টি আমার হাতের পিস্তলের ওপর, মুখে তার রক্ত-জল-করা হাসি।
তার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে অসুবিধে হল না যে, আমি যা দেখেছি আর শুনেছি, সে দেখেছে-শুনেছে তার চাইতে ঢের বেশি। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার কথা বলতে যেতেই আমাকে থামিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে।
যতটা সম্ভব চুপ করে থেকে বোঝার চেষ্টা করো। আর নড়াচড়াও কোরো না। ভেবো না, ওই যন্ত্রের কিরণে কেবল আমরাই দেখতে পাই। ওর প্রভায় আমাদেরকেও দেখা যায়। চাকরবাকরগুলো বিদেয় হয়েছে তো বলেছি। কিন্তু কী করে তা বলিনি, না? ওই মাথামোটা হাউসকিপার মিসেস আপডাইককে আমি পইপই করে মানা করেছিলাম আলো জ্বালাতে। শোনেনি। একতলার আলো জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের তার আকর্ষণ করে নিয়েছিল অনুরূপ কম্পনকে। ফল হয়েছিল সাংঘাতিক। অন্য এক জগতের শব্দ আর দৃশ্যের মধ্যে ডুবে থেকেও এখান থেকেই শুনতে পেয়েছিলাম মরণ চিৎকার। পরে দেখেছিলাম, সারা বাড়িময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে কেবল জামাকাপড়ের স্তূপ। কেউ নিস্তার পায়নি। মিসেস আপডাইকের জামাকাপড়গুলো সামনের হলঘরের সুইচের কাছে পড়ে ছিল। সেটা দেখেই বুঝতে পারি, আলোটা জ্বালাতে গিয়েছিল সে-ই। নড়াচড়া না করলে খানিকটা নিরাপদে থাকবে। মনে রেখো, যে ভয়ংকর জগৎ আমরা ঘাঁটাঘাঁটি করছি, সেখানে আমরা দুর্বল, অসহায়। বলছি না, নড়াচড়া কোরো না!
সত্যিটা জানতে পেরে আর ক্রফোর্ডের হুকুমের জোড়া ধাক্কায় আমার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে এল। আতঙ্কের ধাক্কায় খুলে গেল মনের বোঝার ক্ষমতা। ক্রফোর্ড যাকে পরপার আখ্যা দিয়েছিল, ফের মনের মধ্যে ফুটে উঠল সেখানকার অনুভূতিগুলো। মনে হল, শব্দ আর গতির এক আবর্তের মধ্যে আটকে পড়েছি আমি, আমার দৃষ্টি ঢেকে রেখেছে নানান টুকরো টুকরো ছবির বিশৃঙ্খলা। ঝাপসা হয়ে এসেছে ঘরের কিনারাগুলো। দূরের শূন্যতা থেকে সামনে ডানদিকের ছাদ ফুঁড়ে ফেনার মতো উপচে নেমে আসছে মেঘের আকৃতির একটা স্তম্ভ। ফের নজরে ভেসে উঠল আগে-দেখা সেই মন্দিরের আকার। কিন্তু এবার সে মন্দিরের থাম স্পর্শ করেছে অন্তরিক্ষের এক আলোর সাগরকে। আলোর সমুদ্র থেকে একটি আলোকরশ্মি এবার ছিটকে এল একটু আগে দেখা স্তম্ভের দিকে। শব্দ, দৃশ্য আর নানান অজানা অনুভূতির খণ্ডচিত্রের এক বিচিত্র বর্ণময় বিশৃঙ্খলা যেন ছড়িয়ে গেল চারপাশে। মনে হতে লাগল যেন হারিয়ে যাচ্ছে আমার কঠিন দেহাবয়ব, তরল হয়ে গলে যাচ্ছে আমার শরীর। এর মধ্যেই মনের মধ্যে ফুটে উঠল একঝলক ছবি। অদ্ভুতদর্শন একচিলতে রাতের আকাশ। সে আকাশ ঢাকা ঘুরপাক খেতে থাকা গোলকে, সূর্যের মতনই তারা উজ্জ্বল। ক্রমশ পেছনদিকে সরতে শুরু করে গোলকের ঝাঁক। দূরে গিয়ে রূপ নেয় নক্ষত্রপুঞ্জের। আকার তার ক্রফোর্ডের মুখমণ্ডলের বিকৃত প্রতিচ্ছবির মতন।
খানিক বাদে বুঝলাম, চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে বিশালদেহী সজীব কিছু ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শরীর। না, কেবল ছুঁয়ে নয়, হেঁটে যাচ্ছে আমার শরীরের মধ্যে দিয়েই। দেখলাম, ক্রফোর্ড তাদের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। মনে পড়ে গেল তার পিনিয়াল গ্ল্যান্ড নিয়ে বলা কথাগুলো। হয়তো তার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ঠাহর করতে পারছে অনেক বেশি। তার অতিপ্রাকৃত দৃষ্টিতে যে কী ধরা পড়ছে, সেই প্রশ্নের ঝড় উঠল মনে।
হঠাৎ যেন আমার মধ্যে জেগে উঠল আর-এক পৃথক দৃষ্টিশক্তি। বাড়তি ক্ষমতা তার। আলোছায়ার উথালপাথালের মাঝে এবার দেখতে পেলাম আর-এক দৃশ্য। তার বেশির ভাগটাই ঝাপসা হলেও কিছু অংশ ফুটে রয়েছে পরিষ্কারভাবে। সিনেমার ছবি ভুলক্রমে যবনিকার রঙিন কাপড়ের ওপর পড়লে যেমন দেখতে হয়, চেনা জগতের ওপর সে দৃশ্য চাপানো তেমনভাবেই। চিলেকোঠার ল্যাবরেটরি, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, ক্রফোর্ডের কদাকার চেহারা, দৃশ্যের এই কয়েকটা জিনিস অপরিচিত নয় মোটেও। কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে বাকি স্থানটুকুতে তিলধারণের জায়গা নেই। সেখানে জানা-অজানা, জড়-চেতন নানান অবর্ণনীয় আকৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এলোমেলোভাবে। প্রতিটি পরিচিত জিনিসের সঙ্গে মিলেছে অজস্র অপরিচিত, অদ্ভুতদর্শন বস্তু। কেবল মিলেছে বললে ভুল হবে, পরিচিতের গঠনে যেন মিশেছে অচেনা বস্তু, অজানা বস্তু যেন গড়ে উঠেছে রোজের চেনা জিনিস দিয়ে১৫।
