না, ক্রফোর্ড টিলিংহাস্টের এইসব কথাবার্তায় মোটেও মজা পাইনি আমি। কারণ তাকে চিনতে বাকি ছিল না। তাই উলটে কড়া কড়া কথা শুনিয়েছিলাম তাকে। কিন্তু আবিষ্কারের নেশায় সে তখন পাগল। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল আমায় গলাধাক্কা দিয়ে।
না, আজও তার সেই উন্মাদনা কাটেনি। কেবল আমার ওপর রাগের চাইতেও প্রবল হয়ে উঠেছে আমাকে তার কাজের ফিরিস্তি শোনানোর বাসনা। তাই অপাঠ্য হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিতে একরকম হুকুমের ভাষায় ডেকে পাঠিয়েছে আমাকে।
ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে ক্রফোর্ডের প্রেতমূর্তি। বৃত্তের আকারে আলো ফ্যালে তার হাতের মোমবাতি। তার পেছনে বাড়ির অন্দরে পা রেখে এক অজানা ভয় স্পর্শ করে আমাকেও। মনে হতে থাকে, অন্ধকারের আনাচকানাচে কোনও আতঙ্ক বুঝি-বা নিঃশব্দ পদসঞ্চারে পিছু নিয়েছে আমার। আলোর বৃত্তাকার সীমানার বাইরে যেন রূপ ধরে আস্তানা গেড়েছে দশ সপ্তাহ আগে শোনা শব্দ আর কল্পনাগুলো। ক্রফোর্ডের নিস্পৃহ, শীতল কণ্ঠস্বরে মেশে তার সঙ্গে। কেমন গুলিয়ে উঠতে থাকে আমার সমস্ত শরীর।
কাজের লোকগুলো থাকলেও তবু খানিকটা স্বস্তি পাওয়া যেত। কিন্তু ক্রফোর্ডের কাছে শুনলাম, তারা নাকি বিদায় নিয়েছে দিন তিনেক আগেই। গতবার ক্রফোর্ড খেপে উঠে আমাকে গলাধাক্কা দেওয়ার পর থেকে বুড়ো গ্রেগরিই যা হোক আমাকে কিছু খবরাখবর দিত। কিন্তু সে-ও যে আমার মতন একজন বিপদ-আপদের বন্ধুকে কিছু না জানিয়েই মনিবকে ফেলে পালিয়েছে, সেটা শুনে বড় আশ্চর্য লাগল।
হঠাৎ তলব করার কারণটা সঠিক বুঝতে পারছিলাম না বটে। কিন্তু আন্দাজ করতে পারছিলাম, অচিরেই ক্রফোর্ড আমাকে শোনাতে চলেছে কোনও চমক-লাগানো রহস্য কিংবা আবিষ্কারের কথা। অতএব খানিকক্ষণের মধ্যেই ঘুচে গেল ভয় আর আতঙ্ক। উলটে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কৌতূহল আর অধীর আগ্রহ। কল্পনার জগতেরও বাইরের বিষয় নিয়ে বেহিসেবি অনুসন্ধানের বিরুদ্ধে দিনকয়েক আগে সরব হয়েছিলাম আমিই। কিন্তু আজ যখন ক্রফোর্ড অনেক মূল্য চুকিয়ে সাফল্যের পথে, তখন তার ওই অদম্য উদ্দীপনা যেন স্পর্শ করল আমাকেও।
ঠকঠক করে কেঁপে ওঠে ক্রফোর্ডের অমানুষিক চেহারা। দুলতে থাকে তার হাতের মোমের আলো। তার পেছনে পেছনে আমি হাঁটি জনবিহীন বাড়ির অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে।
খেয়াল করলাম, বাড়িতে বিদ্যুৎসংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। ক্রফোর্ডকে জিজ্ঞেস করতে উত্তর পেলাম, বিশেষ কারণ আছে।
সাহসে কুলোয়নি… বাড়াবাড়ি হয়ে যেত।
ক্রফোর্ড বিড়বিড় করে বকে চলে আপন মনে। বুঝলাম, এ এক নতুন রোগে ধরেছে তাকে।
পা রাখি ক্রফোর্ডের চিলেকোঠার ল্যাবরেটরিতে। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সেই হতচ্ছাড়া যন্ত্রটা। গতবারে মৃদু গর্জন তুলে চলতে দেখেছিলাম এটাকেই। কিন্তু এখন দেখলাম, যন্ত্রের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কেমন একটা মরমর, অশুভ, বেগুনি রঙের আলোর প্রভা। একটা রাসায়নিক ব্যাটারির সঙ্গে যন্ত্রটা তার দিয়ে জোড়া রয়েছে বটে, তবে মনে হল না, সেখান থেকে কোনও বিদ্যুৎ আসছে। ক্রফোর্ডকে প্রশ্ন করে জানলাম, ওই বিরামহীন আলোর উৎস নাকি বিদ্যুঞ্জাতীয় কিছুই নয়।
যন্ত্রের একপাশে আমায় বসায় ক্রফোর্ড। যন্ত্রের মাথার ওপরে একথোকা কাচের বাল্ব। চালু করে দেয় তার ঠিক নীচের একটা সুইচ। আগের দিনের মতনই মৃদু গর্জন করে চালু হয়ে যায় যন্ত্র।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে যন্ত্রের গর্জন পালটে যায় তীক্ষ্ণ আর্তনাদে। সে আর্তনাদও খানিক বাদে পরিণত হয় একটা অস্পষ্ট গুঞ্জনে। যন্ত্রের চারপাশের আলোকচ্ছটাও যেন তার সঙ্গে তাল রেখে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেই ফের নিবুনিবু হয়ে আসে। একই সঙ্গে আলোর বর্ণও যায় পালটে। অস্বাভাবিক, বিকট, সেই জগাখিচুড়ি রঙের বর্ণনা দেওয়া আমার সাধ্যের বাইরে।
আমার কপালের প্রশ্নের রেখাগুলো বোধহয় ক্রফোর্ডের নজর এড়ায়নি। ভেসে আসে তার অনুচ্চ কণ্ঠস্বর। বুঝতে পারছ না কীসের আলো? আলট্রাভায়োলেট!
বিস্ময়ে চমকে উঠি আমি। খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসে ক্রফোর্ড।
কী ভাবছ? আলট্রাভায়োলেট চোখে দেখা যায় না? তা অবশ্য সত্যি! কিন্তু কেবল আলট্রাভায়োলেট কেন, চোখে দেখা যায় না, তেমন অনেক কিছু এবার দেখতে পাবে।
শোনো হে! বহু বছরের বিবর্তনে আলগা ইলেকট্রন থেকে জৈবিক মানুষ হয়ে উঠেছি আমরা। উত্তরাধিকারে পেয়েছি হাজারটা ইন্দ্রিয়। তরঙ্গের প্রভাবে জেগে উঠছে সেসব সুপ্ত ইন্দ্রিয়। যেসব সত্য জেনেছি আমি, এইবার তুমিও জানবে সেইসব। বুঝতে পারছ, কেমন লাগবে? বলছি, দাঁড়াও।
ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিবিয়ে দেয় ক্রফোর্ড। আমার উলটোদিকে বসে আমার চোখের দিকে তাকায় বীভৎস দৃষ্টিতে।
বর্তমান ইন্দ্রিয়গুলোর সঙ্গে সুপ্ত ইন্দ্রিয়গুলোর একটা নিবিড় সংযোগ আছে। অতএব প্রথমে নানান সংকেত পাবে সেগুলোই। শুরু হবে কান দিয়ে। তারপর পালা আসবে অন্য ইন্দ্রিয়গুলোরও। পিনিয়াল গ্ল্যান্ডের কথা শুনেছ? ওটা হল ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রিয়। নিজে পরখ করে দেখেছি। কাজ করে অনেকটা দৃষ্টিশক্তির মতনই। মস্তিষ্কে ছবি পাঠায়। ওভাবেই প্রমাণ পাবে তুমি। পরপারের প্রমাণ।
চুপ করে যায় ক্রফোর্ড। চারপাশে তাকাই সেই সুযোগে। বিশাল ঘরখানার দক্ষিণের দেওয়ালটা ঢালু। সেটায় পড়েছে এমন একটা ম্লান আলো, যেটা নিত্যদিনের দৃষ্টিতে ধরা পড়ার কথা নয়। ঘরের কোণগুলো ঢাকা পড়েছে ছায়ায়। ঘর জুড়ে কেমন একটা কুয়াশাচ্ছন্ন অপ্রাকৃত পরিবেশ। সে পরিবেশ যেন কল্পনাকে টেনে নিয়ে গেল গূঢ় প্রতীক চিহ্নে মোড়া কোনও এক অশরীরী জগতে। কেমন যেন মনে হতে লাগল, আমি বসে রয়েছি অদ্ভুত এক বিশাল মন্দিরে। তার কালো প্রস্তরস্তম্ভগুলো পাষাণফলকের সিক্ত মেঝে থেকে মেঘ অবধি উঠে হারিয়ে গেছে দৃষ্টির অন্তরালে।
