পরের বসন্তে আর ছত্রাক বা সাদা ঘাস নয়, বরং স্বাভাবিক ঘাস মাথা তুলল বাড়ির পেছনের জমিটায়। বাগানের বন্ধ্যা গাছগুলোয় ফুল ফুটল, পাখিরা বাসা বাঁধল, ফলও হল। ক্যারিংটন হ্যারিস বাড়িটা ভাড়াও দিতে পারলেন।
ডক্টর এলিহু হুইপল সারাজীবন কুসংস্কারের কথা উঠলেই নাক কুঁচকে বলতেন, সব ঝুট হ্যায়! বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে সে দিন মনে হল, তাঁর কথার সূত্র ধরে আমি অন্তত ওই অশুভ জিনিসটাকে এই বাড়ি থেকে দূর করতে পেরেছি। বলতে পেরেছি, তফাত যাও!
[প্রথম প্রকাশ: গল্পটি উইয়ার্ড টেলস ম্যাগাজিনের অক্টোবর ১৯৩৭ সালের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর : ঋজু গাঙ্গুলী]
পরপার
পরপার (FROM BEYOND)
[প্রভিডেন্সে ঘটা লাভক্র্যাফটের এই প্রথম গল্পটিতে তিনি সায়েন্টিফিক হরর গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন। সেই সময়ের ফিজিক্স সম্পর্কে লাভক্র্যাফটের যেটুকু জ্ঞান ছিল তাই নিয়ে তিনি মহাবিশ্বের রহস্যকে নিজের গল্পের মধ্যে ধরেছেন। লাভক্র্যাফটের কসমিক হররেরও এটাই প্রথম দিককার উদাহরণ যেখানে তিনি বুঝিয়েছেন এই মহাবিশ্বের অগণিত আশ্চর্য প্রাণীদের কাছে মানবজাতির অস্তিত্ব একেবারেই তুচ্ছ।]
এ ক-দিনেই কেমন বীভৎসভাবে পালটে গেছে ক্রফোর্ডের চেহারা। চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না।
ক্রফোর্ড টিলিংহাস্ট। আমার এককালের প্রাণের বন্ধু। এর আগে তাকে দেখেছি প্রায় দু আড়াই মাস আগে। সেবার যখন মোলাকাত হয়, তার অতিপ্রাকৃত গবেষণার আসল উদ্দেশ্যের কথা সে দিন খুলে বলেছিল ক্রফোর্ড। কিন্তু আমি ভয়ে আঁতকে উঠে দু-একটা আপত্তি জানাতেই সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল সে। একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়ে আমাকে বিদায় করেছিল তার ল্যাবরেটরি আর বাড়ি থেকে।
এরপর টুকরোটাকরা খবর এসেছে কানে। সে নাকি তার সেই হতচ্ছাড়া বৈদ্যুতিক যন্ত্রখানা নিয়ে আস্তানা গেড়েছে চিলেকোঠার ঘরে। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ, চাকরবাকরদেরও ঘেঁষতে দেয় না কাছে।
কিন্তু স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে, মাত্র দশ সপ্তাহের মধ্যে ক্রফোর্ডের চেহারাখানা বদলে এমন কুৎসিত কদাকার রূপ নেবে। তার আগের তাগড়াই শরীরটা শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে। ঝুলে-পড়া শিথিল চামড়ায় লেগেছে ধূসর হলদেটে রঙের ছোঁয়া। কালি-পড়া কোটরে বসে-যাওয়া দুই চোখ জ্বলছে কেমন এক বুকে কাঁপুনি-ধরানো দীপ্তিতে। বলিরেখা-পড়া কপালে ডালপালা মেলেছে অজস্র শিরা-উপশিরা। হাত দুখানা বিরামহীনভাবে কেঁপে চলেছে থরথর করে। এককালের পরিষ্কার করে কামানো মুখ ঢেকে গেছে একরাশ সাদা দাড়িতে। সাদা হয়ে গেছে মাথার ঝাঁকড়া চুলের গোড়াগুলোও। পোশাক-আশাক পর্যন্ত আলুথালু, অবিন্যস্ত। সে হতশ্রী চেহারাটার ওপর চোখ পড়লে শিউরে না উঠে উপায় নেই।
মাসকয়েকের বিচ্ছেদের পর ক্রফোর্ডের অসংলগ্ন ভাষায় লেখা চিঠিখানা পেয়ে সে রাতে যখন তার বেনেভোলেন্ট স্ট্রিটের বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন এই কদাকার মূর্তিতেই দর্শন পেলাম তার।
ক্রফোর্ডের হাতে মোমবাতি, সারা শরীর কাঁপছে ঠকঠক করে। আমায় বাড়িরে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বারংবার পেছন ফিরে তাকায় সে। যেন সেই জনমানবহীন সেকেলে বাড়িটায় ওঁত পেতে থাকা অজানা কোনও কিছুর আতঙ্ক চেপে বসেছে তার মনে।
দর্শন আর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করাটা ক্রফোর্ডের আদৌ উচিত হয়নি। ওসব বিষয়ের চর্চা ঠান্ডা মাথার নির্মোহ গবেষকদেরই মানায়। ক্রফোর্ডের মতন কাজ-পাগল, আবেগি মানুষ এসবের মধ্যে মাথা গলালে তার পরিণতি হয় ঠিক দু-রকমের। অসফল হলে নেমে আসে চূড়ান্ত হতাশা, আর সফল হলে সঙ্গী হয় এক অবর্ণনীয়, অকল্পনীয় আতঙ্ক। এত দিন ক্রফোর্ড ছিল তার গবেষণায় অসফল। নিঃসঙ্গতা আর নৈরাশ্য ছিল তার সহচর। কিন্তু আজ তাকে দেখে আতঙ্কে গুলিয়ে উঠল শরীর। বুঝলাম, সাফল্যের কবলে পড়েছে সে।
দশ সপ্তাহ আগেকার কথা মনে পড়ে গেল, যে দিন পইপই করে সাবধান করেছিলাম ক্রফোর্ডকে। কিন্তু সে দিন উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল সে। অস্বাভাবিক উচ্চকণ্ঠে জ্ঞান দিয়েছিল আমায় পণ্ডিতি ঢঙে।
এই পৃথিবী আর ব্রহ্মাণ্ডের আমরা কতটুকুই বা জানি? যেমন সীমিত আমাদের পর্যবেক্ষণক্ষমতা, তেমনি ক্ষুদ্র আমাদের চারপাশের জগৎ সম্বন্ধে ধারণা। জগৎটাকে বোঝার জন্যে আমাদের শরীরটা গড়ে উঠেছে যেমনভাবে, বিশ্বপ্রকৃতির বিষয়বস্তুগুলো আমারা বুঝি ততটুকুই। তাদের মূল রূপ সম্বন্ধে আমাদের ধারণাই নেই এতটুকুও। বৃথাই আমরা ভাবি, এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের সব গূঢ় রহস্য আমাদের পাঁচটা দুর্বল ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝে ফেলেছি। কিন্তু কল্পনা কর এমন এক শ্রেণির জীবের, যাদের ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা আরও গভীর, আরও বিস্তৃত। কিংবা যাদের ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির পরিসরই আলাদা। তারা আমাদের এই চেনা জগৎটাকেও একবারে আলাদা নজরে দেখবে তো বটেই, আমাদের খুব কাছে ইন্দ্রিয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে জড়-চেতনশক্তির যে আর-একটা দুনিয়া আছে, তাকেও তারা সমানভাবে দেখতে পারবে, বুঝতে পারবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সৃষ্টির এই গুপ্ত অংশ লুকিয়ে আছে আমাদের হাতের নাগালেই। আর আমি আবিষ্কার করে ফেলেছি সেই গুপ্ত জগতের আবরণ উন্মোচন করার পদ্ধতি। না, ঠাট্টা করছি না। ওই যন্ত্রটা দেখছ? চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ওর থেকে ছড়িয়ে যাবে তরঙ্গ। মানুষের শরীরে যেসব সুপ্ত, অপরিণত ইন্দ্রিয় আছে, জাগিয়ে তুলবে সেগুলোকে। শুধু মানুষ কেন? যে-কোনও জীবিত প্রাণীর ইন্দ্রিয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরের সব নানান দৃশ্যপট খুলে যাবে আমাদের সামনে। অন্ধকার, যা দেখে কেঁদে ওঠে কুকুরে, মাঝরাতে যা দেখে কান খাড়া করে ফেলে বেড়ালে, দেখতে পাব সেইসব। দেখতে পাব এমন আরও অনেক কিছু, যা আজ পর্যন্ত নজরে পড়েনি কোনও জীবিত প্রাণীর। টপকে যাব স্থান-কাল-মাত্রা, শরীর না নড়িয়েই ডুব দেব সৃষ্টিরহস্যের অতলে।
