কী ছিল ওই জিনিসটা?
পুরোনো রেকর্ড থেকে পড়া একটা কথা মনে পড়ল। এক্সেটারের বাসিন্দা কিছু বুড়োবুড়ির বয়ান রেকর্ড করেছিলেন কাকা। তাদের বক্তব্য ছিল, কিছু খুব পুরোনো চার্চের লাগোয়া কবরখানার ওপর এক ধরনের কুয়াশা বা ধোঁয়া জমে মাঝেমধ্যে। তারা প্রাকৃতিক হয় না। বরং মানুষকে শুষে, নিংড়ে নেওয়ার জন্যই তাদের জন্ম হয়। সেই কথাগুলোর সঙ্গে আমি মেলালাম ফায়ারপ্লেসের পাশে তৈরি-হওয়া সেই অদ্ভুত চেহারার ছত্রাকটাকে।
মনে হল, পালটা মার দেওয়ার একটা উপায় আমি খুঁজে পেয়েছি।
বাড়ি গেলাম। স্নান সারলাম। ফোনে কয়েকটা জিনিসের অর্ডার দিয়ে বললাম, পরদিন সকালে যেন সেগুলো বেনিফিট স্ট্রিটের ওই দরজার সামনে পৌঁছে দেওয়া হয়। তারপর বিশ্রাম আর বই-পড়াতেই দিনটা কাটল। আমি জানতাম, খুব বড় কাজ করতে হবে পরদিন ওই জিনিসগুলো দিয়ে।
কী জিনিস?
শাবল আর বেলচা। মিলিটারি গ্যাস-মাস্ক। ছ-টা বড় কন্টেনারে ভরতি সালফিউরিক অ্যাসিড!
পরদিন সকাল এগারোটায় আমি খুঁড়তে শুরু করলাম। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, কারণ ঘরের ভেতরটা যেমনই হোক না কেন, বাইরেটা রোদে ঝলমল করছিল। আমি একাই যা করার করছিলাম। হ্যারিসকে আমি কিছু বলিনি। ভয় ছিল, যদি ও আমাকে খোঁড়াখুঁড়ি না করতে দেয়! অনেক পরে আমি ওকে ব্যাপারটা খুলে বলেছিলাম, কারণ না বলে উপায় ছিল না।
আমার লক্ষ্য ছিল ফায়ারপ্লেসের পাশের অংশটা। ওখানকার কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত মাটিটা খুঁড়তে খুঁড়তে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। যেখানেই আমার শাবলের ঘায়ে সাদা ছত্রাকগুলো ভেঙে যাচ্ছিল, সেখানেই বেরিয়ে আসছিল একটা দুর্গন্ধযুক্ত হলদে পুঁজের মতো তরল! আরও খুঁড়লে কী বেরোতে পারে ভেবে আমার হাত কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, কিছু জিনিস মাটির গভীরে, অন্ধকারে থেকে যাওয়াই হয়তো ভালো। তবু আমি থামিনি।
গর্তটা গম্ভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছিল দুর্গন্ধ। বেশ কিছুটা নীচে পৌঁছোনোর পর হঠাৎ খেয়াল হল, এতটা নীচ থেকেই যে জিনিস এমন মারাত্মক খেল দেখাতে পারে, একেবারে সামনে থেকে সেটা কতটা বিপজ্জনক আর বড় হবে! মুহূর্তের জন্য দারুণ ভয় আমাকে অসাড় করে দিল। কিন্তু সাহস আর একটা মরিয়া ভাব আমাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করল। আমি লাফিয়ে গর্তটা থেকে উঠে এলাম। চারদিকে ছড়িয়ে-থাকা মাটির স্তূপটা গর্তের দু-পাশে এমনভাবে সরিয়ে রাখলাম, যাতে দরকার পড়লেই তা-ই দিয়ে গর্তের মুখটা বুজিয়ে দেওয়া যায়। অ্যাসিডের কন্টেনারগুলো হাতের নাগালে সাজিয়ে রাখলাম। ক্রমবর্ধমান গন্ধের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য গ্যাস-মাস্ক পরলাম। তারপর আবার খুঁড়তে শুরু করলাম।
তখন আমি প্রায় ছ-ফুট নীচে নেমে এসেছি। গর্তের কিনারা আমার গলার কাছাকাছি রয়েছে। হঠাৎ আমার শাবল মাটির বদলে একটা নরম কিছুতে আঘাত করল! ভয়ে আমার প্রায় দম আটকে গেল। মনে হল, এত দিন ধরে এতগুলো মানুষকে গ্রাস করেছে। যে জিনিস, এখনই যদি সে আমাকেও…! তবু আমি পালাইনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বুঝলাম, সাহস ফিরে আসছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় নীচটা দেখতে দেখতে আমি শাবল চালাচ্ছিলাম। অবশেষে তাকে পেলাম।
যা দেখলাম, সেটার অন্তত ওই অংশটুকু মাছের মতো আঁশওয়ালা চেহারার। আবার কাচের মতো একটা তেলতেলে ভাবও আছে তাতে। মনে হচ্ছিল, যেন জেলির মতো একটা কিছু ভাঁজ হয়ে রয়েছে ওখানে। সেই ভাঁজ বরাবর জমে গেছে তার শরীর থেকে বেরোনো রস। অনেকটা জায়গা ফাঁকা করে মনে হচ্ছিল, একটা সিলিন্ডারের মতো চেহারার জিনিসটা। প্রায় দু-মিটার ব্যাসের ওই বস্তুর অত কাছে দাঁড়িয়ে আমার স্নায়ু প্রায় ছিঁড়ে পড়ছিল ভয়ে। তবে আমি পাগলামো করিনি। বরং ঠান্ডা মাথায় গর্তটা থেকে উঠে এসেছিলাম। তারপর অ্যাসিডের পাত্রগুলো একে একে খালি করতে শুরু করেছিলাম গর্তের মধ্যে।
গর্ত থেকে উঠে-আসা হলদেটে-সবুজ রঙের আর বীভৎসতম গন্ধের সেই কুয়াশাকে আমি কোনও দিন ভুলতে পারব না। অ্যাসিডের প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল সেই গন্ধের দাপট। লোকে এখনও হলদে দিন-এর কথা বলে, যে দিন নাকি প্রভিডেন্স নদীতে কারখানার আবর্জনা পড়ে গন্ধ আর ধোঁয়ায় এলাকা ভরিয়ে রেখেছিল বহু দূর অবধি। তারা কারখানার বেশ কিছু যন্ত্র বিগড়ে যাওয়ার ফলে তৈরি-হওয়া বিকট গর্জনের কথাও বলে।
সত্যিটা শুধু আমি জানি।
ছ-নম্বর কন্টেনারটা খালি করার পর আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। ওই পূতিগন্ধ আর অ্যাসিডের ঝাঁজ মাস্ক পেরিয়ে আমার নাগাল পেয়ে গিয়েছিল প্রায়। তবে জ্ঞান ফিরে আসার পর বুঝেছিলাম, নতুন করে আর কিছু উঠে আসছে না গর্ত থেকে। তারপর আমি মাটি ফেলে গর্তটা ভরাট করা শুরু করি। প্রায় সন্ধে নাগাদ আমার লড়াই শেষ হয়। হ্যাঁ, মাটিতে তখনও ভিজে ভাব ছিল। দেওয়ালে তখনও নোনা আর ছাতার দাগ ছিল। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছিলাম, যে জিনিসটা ওই জায়গাটা বিষিয়ে রেখেছিল, তা আর নেই। যে নরক থেকে ওটা এসেছিল, হয়তো সেখানেই তাকে ফেরাতে পেরেছি আমি।
মেঝেটা সমান করার সময় আমি অবশেষে কাঁদতে পারলাম। আমার কাকার জন্য, এই বাড়ির বাসিন্দা হয়ে যত মানুষ ওই অশুভ জিনিসটির শিকার হয়েছিল, তাদের জন্য, হয়তো নিজের জন্যও… কারণ আর কখনও আমি পৃথিবীকে সহজ চোখে দেখতে পারব বলে মনে হয় না।
