.
০৫.
কাকা যে চেয়ারে বসেছিলেন, শোয়ার সময় আমার মুখ ছিল তার উলটোদিকে। ফলে ঘুম ভেঙে আমি প্রথমে রাস্তার দিকের দরজা, উত্তরের জানলা, মেঝে, দেওয়াল, এমনকী সিলিং– এগুলো সবই দেখতে পেলাম। জিনিসগুলো আমার চোখে এতই স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ল, যেটা ওই অবস্থাতেও অস্বাভাবিক ঠেকল। ব্যাপারটা ভাবুন। রাস্তা থেকে আসা মলিন আলো, আর ঘরের মধ্যে ওই বিশ্রী ছত্রাক থেকে বেরিয়ে-আসা আবছা দ্যুতি– এই দিয়ে তো বই পড়াও অসম্ভব ছিল। অথচ ওই মুহূর্তে আমার আর খাটের রীতিমতো ছায়া পড়ছিল সামনের দেওয়ালে! আলোটার মধ্যে একটা জোরালো, হলুদ ভাব ছিল। সেটার উৎস নিয়ে ভাবতে গিয়েই আমার খেয়াল হল, আরও দুটো অস্বাভাবিক জিনিস ঘটেছে ও ঘটছে।
প্রথমত, যে চিৎকারটা আমার ঘুম ভাঙিয়েছে, সেটা কাল্পনিক ছিল না। আমার কান তখনও সেই আওয়াজে একেবারে থরথর করে কাঁপছিল!
দ্বিতীয়ত, একটা বিকট গন্ধে আমার দম আটকে আসছিল।
এক লাফে খাট ছেড়ে উঠে আমি ওই যন্ত্রপাতিগুলোর দিকে এগোলাম। পেছন ফেরার সময় একটা আশঙ্কা ছিল। ভাবছিলাম, না জানি কী দেখতে হবে এবার। কিন্তু যা দেখলাম…!
মাটি থেকে বাষ্পের মতো করে উঠে আসছিল একটা হলদেটে আলো। সেই আলোয় তীব্রতা ছিল, কিন্তু উষ্ণতা ছিল না। মৃত্যুর শীতলতায় ভরে-রাখা আলোটা একটা দানবিক ছত্রাকের মতো চেহারা নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যেন আমি ওই আলোর মধ্যে কিছু একটা আধা-মানুষ, আধা-পিশাচ চেহারার আবছায়া অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছি। তার সারা শরীর জুড়ে রয়েছে ব্যঙ্গ আর খিদে! তার মধ্যে দিয়ে পেছনের চিমনি আর সিলিং দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু জিনিসটাকে হাওয়ার মতো কিছু ভাবতে পারছিলাম না। বরং ওটার ডিম্বাকার মাথাটা যেভাবে ভেঙে ভেঙে চিমনির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল, তা দেখে কোনও প্রকাণ্ড অজগরের কথাই মনে হয়।
আলোর কি গন্ধ হয়? হয় না। ওই গন্ধটার ফলেই আমি বুঝতে পারলাম, যেটা দেখছি, সেটা একটা দৈত্যাকৃতি ধোঁয়া বা কুয়াশার পুঞ্জ। মাটি থেকে উঠে এসে জিনিসটা পাক খাচ্ছে। আর তার ঘূর্ণনের কেন্দ্রে রয়েছে একজন মানুষ।
এলিহু হুইপল!
কাকার মুখে তাঁর শান্ত, সৌম্য ভাবের লেশমাত্র ছিল না তখন। বরং তাঁর গোটা শরীর ঢেকে যাচ্ছিল একটা কালচে ভাবে। আর তাঁর মুখে ফুটেছিল একটা ক্রুর হাসি, যা কিছু ভালো সেসবকে উড়িয়ে দেওয়ার ব্যঙ্গ, আর… খিদে। ওইভাবেই কাকা… না, কাকার শরীরটাকে গ্রাস-করে-ফেলা ওই কুয়াশা আমার দিকে এগিয়ে এল।
আমি পাগল বা অনড় হয়ে যাইনি। হয়তো এই বাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে নিজেকে মনে মনে এইরকম একটা মুহূর্তের জন্য তৈরি করছিলাম। মোদ্দা কথা হল, ওই ধোঁয়া বা জিনিসটা আমার দিকে এগোনোমাত্র আমি একটা জিনিস বুঝে ফেললাম। এই আলো বা ধোঁয়া আমাদের চেনাজানা দুনিয়ার কিছু নয়। তাই ফ্লেম-থ্রোয়ার দিয়ে এর কিসসু করা যাবে না। বরং তার মধ্যে বন্দি আমার কাকাই পুড়ে খাক হবেন ওতে। তাই আমার কাছে থাকা অন্য অস্ত্রটি প্রয়োগ করতেই হচ্ছে।
প্রায় লাফিয়ে আমি যন্ত্রটার কাছে গেলাম। ক্রুকস টিউবগুলো নীলচে আলো আর একরাশ ফুলকি ছড়িয়ে ঝলসে উঠল। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল, হলুদ আলোর দীপ্তি কমে আসছে। কিন্তু বুঝতে পারলাম ওটা স্রেফ চোখের ভুল। আদতে ওই যন্ত্রটা, আর তার থেকে হাওয়ায় ছড়িয়ে-পড়া কম্পন জিনিসটার ওপর কিছুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারছে না।
এরই মধ্যে আমি এমন একটা দৃশ্য দেখলাম, যার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। দেখলাম, কাকা মাটিতে পড়ে গেছেন। কিন্তু কাকার শরীরটা জমাট না থেকে যেন গলে গলে যাচ্ছে। মুহূর্তের জন্য সেটা জমাট বাঁধছে, আবার পরক্ষণেই শরীরটা ভেঙে থলথলে জেলি হয়ে যাচ্ছে! আমি ওই অদ্ভুত পিণ্ডের মধ্যে বহু নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধের আনাগোনা দেখলাম। মনে হল, কাকার শরীরটা যেন একটা প্রকাণ্ড শবাগারের মতো হয়ে গেছে, যেখানে মৃতেরা দলে দলে ঢুকছে, হয়তো তারপর অন্য কোথাও যাবে বলে! এক সেকেন্ডের জন্য হয়তো আমার কাকার শরীরটাও আমি তার মধ্যে মোচড়াতে দেখলাম। মনে হল, তিনি যেন ওই অবস্থাতেও আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন। তারপর ডক্টর এলিহু হুইপল হারিয়ে গেলেন ওই আলো আর গন্ধের মধ্যে।
এই দৃশ্যটা সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। আমিও কি কাকার উদ্দেশে বিদায় জানিয়েছিলাম? কী জানি! এটুকু মনে আছে যে, দরজা খুলে আমি কোনওক্রমে টলতে টলতে বেরিয়ে এসেছিলাম বাইরে, রাস্তায়, বৃষ্টির মধ্যে। তারপর কী করেছিলাম, কোথায় গিয়েছিলাম– এগুলো সব ঝাপসা। যদূর মনে পড়ে, আমি লক্ষ্যহীনভাবে হেঁটেছিলাম। কলেজ হিলের দক্ষিণ দিয়ে, এথেনিয়ামের পাশে, হপকিনস স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি অবশেষে ব্রিজ পেরিয়ে পৌঁছেছিলাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ভোরের ভেজা আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল বড় বড় বাড়ি। ওদের দেখে মনে হল, অতীতের অন্ধকার থেকে উঠে-আসা ওই হলদেটে কুয়াশাই শেষ কথা নয়। বরং সমকালেরও একটা জোরালো উপস্থিতি আছে আমার চারপাশে।
ওই ধাক্কাটা দরকার ছিল। আমি ফিরে গেলাম বেনিফিট স্ট্রিটের ওই ঠিকানায়। দরজাটা তখনও খোলা ছিল। ভেতরে ঢুকে মেঝেতে অজস্র ছোট ছোট ফুটো ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলাম না। হতবুদ্ধির মতো আমি ঘরের সব কিছু দেখলাম। যন্ত্রপাতিগুলো, ফাঁকা খাটটা, উলটে-পড়া চেয়ার দুটো, কাকার মাথার টুপিটা– এগুলো সবই আমার চোখে ধরা পড়ল। কিন্তু কাকা বা ওই ভয়ংকর হলদেটে কুয়াশার কোনও চিহ্ন আমি খুঁজে পেলাম না। একবার মনে হল, সবটাই আমার স্বপ্ন ছিল না তো? কিন্তু কাকার টুপিটাই আমাকে মনে করিয়ে দিল, গত রাতের অভিজ্ঞতাটা স্বপ্ন ছিল না।
