একজন ঘুমন্ত মানুষের পাশে বসে কখনও রাত জেগেছেন? বড় একা লাগে ওই সময়টায়। দুনিয়ার যত রাজ্যের ভয় তখন এসে দানা বাঁধে মনের নরম জায়গাগুলোয়। কাকার গভীর শ্বাসের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল বাইরে বৃষ্টি আর হাওয়া মিলে তৈরি হওয়া হাহাকার। জানলা দিয়ে আসা আবছা আলোয় দাগে ভরা দেওয়ালের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল জলের দানা। পরিবেশটা এতই শ্বাসরোধী হয়ে উঠল যে, আমি দরজা খুলে দিলাম। বাইরে থেকে আসা ভেজা বাতাসটাই বুক ভরে নিলাম। মাথাটা সাফ হয়ে আসছিল ওই হাওয়ায়। তখনই কাকার শ্বাসের শব্দটা আমাকে সচেতন করল।
গত আধ ঘণ্টায় কাকা বেশ কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করেছিলেন ঘুমের মধ্যেই। আমি অবাক হইনি। বয়স হলে মানুষের ঘুম পাতলা হয়। কিন্তু এবার তাঁর নিশ্বাসের আওয়াজটা আমার অন্যরকম লাগল। ওঁর ঘুম ভেঙে যেতে পারে জেনেও আমি ফ্ল্যাশলাইটটা ফেললাম খাটের ওপর। দেখলাম, কাকা ওপাশ ফিরে শুয়ে আছেন। আমি এবার ওপাশে গিয়ে সোজা কাকার মুখে আলো ফেললাম। যা দেখলাম, সেটা আমাকে দারুণ ভয় পাইয়ে দিল।
এলিহু হুইপলের ঘুমের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম। সেই অবস্থায় তাঁর মুখে একটা গভীর প্রশান্তির ভাব থাকে। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি কাকার মুখে একটা অস্থিরতা দেখলাম। যেন… যেন কাকা আর নিজের মধ্যে নেই। বরং তাঁর শরীরের মধ্যে যেন বাসা বেঁধেছে অন্য অনেকে। তাদের ধাক্কাধাক্কি আর অস্তিত্বের লড়াই ফুটে উঠছে কাকার নিশ্বাস-প্রশ্বাসে, মুখে, আর খুলে-যাওয়া চোখে!
কাকা বিড়বিড় করতে শুরু করলেন। আমি প্রথমে কথাগুলো বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই জড়ানো শব্দ আর নিচু গলার মধ্য দিয়ে একটা জিনিস বুঝতে পেরে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে কনকনে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
এলিহু হুইপল ফরাসি ভাষায় বিড়বিড় করছেন!
আমার জ্ঞানগম্যি কাকার তুলনায় কিছুই না। কিন্তু মানুষটার সাহচর্য পেয়েছিলাম বলে আরও একটা জিনিস বুঝতে পারলাম। প্যারির বিখ্যাত জার্নাল রেভ দে দু মদ-এর জন্য বিশ্বের ভয়ংকরতম কয়েকটা কিংবদন্তি অনুবাদ করেছিলেন কাকা। এই মুহূর্তে, এই অভিশপ্ত বাড়িতে ঘুমে, বা অজ্ঞান অবস্থায় তিনি সেগুলো থেকেই ছেড়ে ছেড়ে কয়েকটা কথা বলছেন।
হঠাৎ কাকার সারা মুখ জুড়ে ঘামের বিন্দু দেখা দিল। মনে হল, যেন একটা অমানুষিক লড়াই চলছিল ওঁর ভেতরে, যাতে সাময়িকভাবে কেউ পিছু হটেছে। কাকা ফরাসির বদলে ইংরেজিতে ফিরে এলেন, আর আর্তনাদ করে উঠলেন, দম আটকে যাচ্ছে। আমার দম আটকে যাচ্ছে! বলে। চোখ খুলে আমাকে দেখেই কাকা উঠে বসলেন। আমি ওঁর হাত ধরে ওঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। একটু শান্ত হয়েই কাকা মুখ খুললেন।
আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। বললেন কাকা, একটা ভয়ানক স্বপ্ন! কিন্তু সেটা শুরু হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই। রোজকার কাজ বা কথাগুলো যেভাবে টুকরো টুকরো হয়ে ঘুমের মধ্যে ঘাই মারে, সেভাবেই… আর তারপর…!
তারপর? কাকার দিকে জলের ফ্লাস্ক এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
তারপর চেনাজানা জিনিসগুলো অন্যরকম হয়ে যেতে লাগল! জানি, স্বপ্নে এরকম হয়। কিন্তু এবার মনে হচ্ছিল, যেন জিনিসগুলোর জ্যামিতি বদলে যাচ্ছে। সময় আর স্থান দুটোই যেন গলে গলে পড়ছে। একটা ছবির ওপর চেপে বসছে আর-একটা ছবি। সেটা অন্য জায়গার, না অন্য সময়ের… কিছু বুঝতে পারছি না। তার কিছুক্ষণ পর ব্যাপারটা আরও ভয়ানক হয়ে উঠল।
আপনি কাউকে দেখতে পেয়েছিলেন?
একবার মনে হল, যেন আমি একটা অগভীর গর্তের মধ্যে পড়ে আছি, আর বাইরে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মাথায় তেকোনা টুপি-পরা বেশ কিছু রাগি, হিংস্র লোক! কাকার গলার কাছটা যেভাবে ওঠানামা করছিল, তাতে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে, কথাগুলো মনে করতে মানুষটির ইচ্ছে করছে না, পরক্ষণেই মনে হল, যেন একটা
খুব পুরোনো বাড়ির মধ্যে আছি আমি, যার বাসিন্দারা ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে! কিন্তু তার মধ্যেও একটা জিনিস বুঝতে পেরেছিলাম।
কী?
আমি যাদের দেখেছিলাম, তাদের মধ্যে অনেকেই এই হ্যারিস পরিবারের মানুষ। আমি ওদের কয়েকজনকে চিনতাম, ছবিও দেখেছি। তাই ওদের মুখের আর চেহারার বিশেষত্ব চিনতে অসুবিধে হয়নি আমার। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল।
হ্যাঁ। আমি উদবিগ্ন হয়ে বললাম, আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, আপনি কষ্ট পাচ্ছেন। আপনার কি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল?
শুধু শ্বাস নিতে নয়। কাকার মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটল, একাশি বছর বয়সি এই শরীরের সব কটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তখন লড়াই করছিল। কার বিরুদ্ধে? জানি না। তবে কেউ, বা কিছু একটা আমার শরীর দখল করতে চেষ্টা করছিল ভীষণভাবে।
আমি জানি, আপনারা কী ভাবছেন। এই বর্ণনা শুনে আমার চোখ থেকে ঘুম-টুম উড়ে যাওয়ার কথা, তাই না? কিন্তু বাস্তবে উলটোটাই হচ্ছিল। ঘুমে আমার চোখ জুড়ে আসছিল। বাধ্য হয়ে আমি লম্বা হলাম, আর কাকা আমার পাশে বসলেন একেবারে সোজা আর সজাগ হয়ে। ঘুমে আমি একেবারে তলিয়ে গেলাম। স্বপ্ন দেখাও শুরু হল প্রায় তক্ষুনি। কিন্তু স্বপ্নগুলো আদৌ সুখদায়ক ছিল না। অস্বস্তিতে, ভয়ে আমি চ্যাঁচাতে চাইছিলাম, অথচ পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, যেন আমি হাত-পা-মুখ-বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছি। আমার চারপাশে যেন এমন অজস্র মানুষের ভিড়, যারা আমাকে মারতে চাইছে। এমনকী কাকার মুখটাও যেন বিকৃত হয়ে আমাকে গিলতে আসছিল স্বপ্নে। শেষ অবধি একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার আমার শরীর-মন থেকে ঘুমের কম্বলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।
