ওখান থেকে ফিরে এসে ঘটনাটা কাকাকে বললাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন কাকা। তারপর খুব শান্ত গলায় বলে উঠলেন, ওটাকে শেষ করতে হবে। আর এই কাজটা আমাদেরই করতে হবে। ব্যাস।
.
০৪.
২৫ জুন, ১৯১৯, এই তারিখটা আমি কখনও ভুলতে পারব না। সে দিন আমি আর কাকা ওই বাড়িতে অভিযান চালালাম। ক্যারিংটন হ্যারিসকে আমাদের অভিযান সম্বন্ধে জানানো হয়েছিল। কেন এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সেই রাতে ওখানে যাচ্ছি, সে বিষয়ে ওঁকে আমরা কিছু বলিনি। তবে আমাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র থেকে ভদ্রলোক কিছু আন্দাজ করেছিলেন। কাকা ওঁকে বুঝিয়েছিলেন, যা-ই হোক না কেন, সেটা আর কাউকে না-বলাই ভালো হবে। বেচারির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, তবে উনি রাজি হয়েছিলেন।
পরিকল্পনা ছিল, আমাদের দুজনের মধ্যে প্রথমে একজন, পরে আরেকজন পাহারা তথা পর্যবেক্ষণে নিযুক্ত থাকবে, অন্যজন ঘুমোবে। পরে দু-জনেই জেগে থাকবে। সেইমতো দুটো ক্যাম্প চেয়ার আর একটা ভাঁজ-করা খাট নিয়েছিলাম আমরা। সঙ্গে ছিল বেশ কিছু ভারী, দামি যন্ত্রপাতি। শেষোক্ত জিনিসগুলো ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্রানস্টন স্ট্রিটের আর্মারি থেকে ধার নিতে হয়েছিল। এমনিতে ওসব জিনিস চাইলে পাওয়া যায় না, তবে ডক্টর এলিহু হুইপল কিছু চাইলে তাতে না বলা…!
সেই রাতেও ঝড় উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, আমাদের মধ্যেও যেন ঝড়ই হচ্ছে। যেসব জিনিসকে কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের বস্তু ছাড়া আর কিছু ভাবিনি কখনও, তাদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মনকে কি তৈরি করা যায় আদৌ? আমি আর কাকা দু-জনেই এই ক-দিনের ঘাঁটাঘাঁটি থেকে বুঝতে পেরেছিলাম, কিছু একটা আছে ওই বাড়ির সেলারে। আমি তাকে দেখেওছি! তবু, মন এই মুহূর্তগুলোয় উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে বলতে চায়, ঝড় ওঠেনি, কোথাও কিছু নেই, সব ঝুট হ্যায়! কিন্তু এলিহু হুইপলের পাল্লায় পড়লে উটপাখিরাও বোধহয় স্বভাব বদলাত।
রুলে পরিবারের সঙ্গে যে অশুভশক্তির উপাসনা, এবং সেইরকম কিছু বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল– এটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। তাহলে কি সেই পরিবারের শেষ পুরুষ পল রুলে কোনওভাবে, যে যা চাইছিল তা-ই পেয়েছিল? মানুষের মতো চেহারা, ছত্রাকের মতোই একটা পরজীবী স্বভাবের বশে বাসিন্দাদের প্রাণরস শুষে টিকে থাকা, এবং মানুষের মতোই ঘৃণা আর হিংস্রতা দিয়ে আমাকে সেই সন্ধ্যায় দেখা– এগুলোর প্রতিটিই আমাদের বলছিল, পল রুলের একটা অন্ধকার অস্তিত্ব রয়েছে এই বাড়ির সেলারে। কিন্তু ওই অস্তিত্বের বাইরে তার সম্বন্ধে আমরা কিছু জানতাম না। তাই তার মোকাবিলা করার জন্য আমাকে কাকার বিজ্ঞানচেতনা আর ধারণার ওপরেই ভরসা করতে হয়েছিল।
দুটো অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়েছিলাম আমরা।
শক্তিশালী স্টোরেজ ব্যাটারি দিয়ে চালিত কয়েকটা ক্রুকস টিউব, স্ক্রিন আর রিফ্লেক্টর দিয়ে বানানো একটা জটিল জাল ছিল প্রথম হাতিয়ার। যদি জিনিসটা একটা উপস্থিতি ছাড়া কিছু না হয়, তাহলে বাতাসে একটা দৃষ্টির অগোচর, কিন্তু প্রাণঘাতী বিকিরণ ছড়িয়ে তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন কাকা।
দ্বিতীয় হাতিয়ারটা আমাদের কারও মনঃপূত হয়নি। তবে ওটা সঙ্গে না রেখে উপায়ও ছিল না। যদি জিনিসটা বায়বীয় না হয়ে নিরেট আকার নেয়, তাহলে সেটাকে ধ্বংস করার জন্য আমাদের একেবারে আদিম একটি শক্তির প্রয়োজন ছিল। আগুন! তাই মিলিটারির কাছ থেকে ধার-নেওয়া দ্বিতীয় হাতিয়ারটা ছিল ফ্লেম-থ্রোয়ার।
এগুলো আমরা যথাসাধ্য বুঝে-শুনে ফিট করলাম। ফায়ারপ্লেসের সামনে ওই জায়গায় ছত্রাকের দাগটা তখন খুবই ফিকে হয়ে এসেছিল। আমি একবার ভাবলামও, ভুল দেখিনি তো? তারপরেই পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে গেল। নতুন উদ্যমে কোমর বেঁধে, ওই জায়গাটা ঘিরে, এবং আরও যেসব এলাকা আমাদের দুজনের কাছেই গোলমেলে ঠেকছিল, সেগুলোর দিকে নিশানা করে আমরা গুছিয়ে বসলাম। রাত তখন দশটা।
বৃষ্টির দাপটে বাইরে রাস্তার আলোগুলো টিমটিম করছিল। সেই আলোয় আর ঘরের ভেতরে ছত্রাক থেকে ছড়িয়ে-পড়া আভায় ঘরটা আরও কুৎসিত দেখাচ্ছিল। দেওয়ালে চুনের লেশমাত্র নেই, বরং ভেজা পাথরগুলোই আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। পায়ের তলায় শক্ত কাঠ নয়, বরং স্যাঁতসেঁতে, ছাতা-পড়া মাটির অস্তিত্ব প্রতিমুহূর্তে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আমরা একটা বাজে জায়গায় এসে পড়েছি। তার সঙ্গে যোগ করুন পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা আসবাব, মাথার ওপর বিম আর কড়িবরগার জাল, জায়গায় জায়গায় হাঁ করে থাকা ঘোরানো সিঁড়ি! এর মধ্যে বসিয়ে নিন আমাদের সঙ্গে আনা জটিল যন্ত্রপাতি, আর চেয়ারে বসে থাকা আমাদের।
ছবিটা কি খুব মনোরম ঠেকছে?
আমরা রাস্তার দিকের দরজাটা খোলাই রেখেছিলাম। বাইরে থেকে আলো আসার জন্যই শুধু নয়, বিপদে পড়লে পালানোর জন্যও। প্ল্যান হিসেবে যেটা আমাদের মাথায় ছিল, সেটা খুবই সরল। আমরা ওখানে থাকব। ওই বাড়িতে এখন যেহেতু মানুষের পা পড়েই না বলতে গেলে, রাতভর আমাদের উপস্থিতি ওই অশুভ জিনিসটিকে উত্তেজিত বা প্রলুব্ধ করবে। তখন সে আমাদের কাছে এলে অস্ত্রশস্ত্র প্রয়োগ করা যাবে। আমরা নিজেদের মধ্যে নানা এতোল-বেতোল কথা বলে অনেকটা সময় কাটালাম। তারপর দেখলাম, কাকার চোখ বুজে আসছে। ওঁকে কটে শুইয়ে দিলাম। কেন যেন মনে হল, এবারই যা হওয়ার হবে।
