উইলিয়াম হ্যারিস তাঁর বাড়িটা সেই কবরখানার ওপরেই বানিয়েছিলেন!
অতঃপর রোড আইল্যান্ড হিস্টরিক্যাল সোসাইটি আর শেপলির লাইব্রেরি অভিযান চালালাম। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, ১৬৯৬ সালে ইস্ট গ্রিনউইচ থেকে এসেছিল রুলে পরিবার। সেখানে ওই পরিবারটিকে স্থানীয় লোকে দু-চোখে দেখতে পারত না। প্রভিডেন্সে অভিবাসী হওয়া ফরাসি পরিবারগুলোর সঙ্গে ইংরেজ বাসিন্দাদের সাংঘাতিক ঝামেলা হয়েছিল, এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু তার মধ্যেও এই বিশেষ পরিবারটির ওপর লোকজন বিশেষভাবে খেপে ছিল। কেন? সে প্রশ্নের সহজ উত্তর আমি কোথাও পাইনি। তবে মনে হয়, এতিয়েন রুলে চাষবাস বা অন্য কাজকর্মের বদলে কী সব নিষিদ্ধ বইপত্র পড়ায়, আর বিচিত্রদর্শন নকশা-টকশা আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। স্থানীয় লোকেদের চাপেই রুলে পরিবারকে এই একচিলতে জায়গায় থাকতে বাধ্য করা হয়। প্রশাসন তাদের ওপর সদয় হয়ে টাউন স্ট্রিটের জেটিতে এতিয়েনের জন্য একটা কাজ জুটিয়ে দেয়। তারও প্রায় চল্লিশ বছর পর শহরে একটা বিশাল দাঙ্গা হয়। তারপর থেকে রুলে পরিবারের আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
বসত করার পর প্রায় শ-খানেক বছর ধরে রুলে পরিবারের উল্লেখ নানা কথায় বা লেখায় পাওয়া যায়। তেমন কিছু ছিল না সেই কথায়। তবে সমুদ্রের ধারে একটা ঝিম-ধরা শহরে আলোচ্য বিষয় হওয়ার জন্য তো তেমন কিছু লাগেও না। এতিয়েনের ছেলে পল ছিল বদমেজাজি এবং অভদ্র। তার আচরণের পরেই শহরের ওদিকে দাঙ্গাটা হয়। কিন্তু কী এমন করেছিল পল? নাহ্ এ প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাইনি আমি। তবে হ্যাঁ, প্রভিডেন্সের বাসিন্দারা আশপাশের লোকেদের মতো অত কুসংস্কারাচ্ছন্ন না হলেও কিছু জিনিস তাঁরা অপছন্দ করতেন। পল নাকি ভুল সময়ে, ভুল দিকে মুখ করে, ভুল জিনিস বলে উপাসনা করতেন। এই নিয়ে তাঁদের অসন্তোষের আঁচ এত দিন পরেও আমার গায়ে এসে লাগল। সেই সঙ্গে আরও একটা জিনিস জানা গেল।
ষোড়শ শতাব্দীর কডের বাসিন্দা হিউগোনট পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই রুলেরা। এই তথ্যটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। একটু অপ্রচলিত পুথিপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করি বলে আমি একটা জিনিস জানতাম।
কডের বাসিন্দা জাক রুলেকে ১৫৯৮ সালে দানব উপাসনার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে সেটা রদ করে তাকে সারাজীবনের জন্য একটা ঘুপচি ঘরে কয়েদ করে রাখা হয়। কিন্তু সে যা করেছিল, সেটা তাতে লঘু হয়ে যায়নি।
কী করেছিল জাক? জঙ্গলের মধ্যে দুটি নেকড়ের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া একটি ছেলের শরীরের পাশে জাককে পাওয়া গিয়েছিল রক্ত-মাখা অবস্থায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা সেখান থেকে একটি নেকড়েকেই পালাতে দেখেছিলেন। ফলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, অন্য নেকড়েটি আর কেউ নয়, জাক স্বয়ং। আমি এমন কোনও দলিল পাইনি, যা থেকে মনে হয় যে, এই উপাখ্যান প্রভিডেন্সেও এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু যেভাবে দাঙ্গায় পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, তাতে মনে হয়, কেউ হয়তো কিছু জেনেছিল।
বুঝতেই পারছেন, এই ব্যাপারটা সমাপতন হতেই পারত। কিন্তু আমার তখন যেখানে দেখিবে ছাই দশা। অতঃপর ওই বাড়িতে আমার আনাগোনা বাড়ল। শেষে ক্যারিংটন হ্যারিসের অনুমতি নিয়ে আমি সরাসরি বেনিফিট স্ট্রিট থেকে ওই বাড়ির সেলারে ঢোকার অনুমতি পেলাম। কারণটা ছিল অত্যন্ত সরল। পরিত্যক্ত একতলা, অন্ধকার সিঁড়ি, ছাতা ধরা দেওয়াল– এসবের মধ্য দিয়ে ওই সেলারে ঢোকার কথা ভেবেই স্নায়ুতে চাপ পড়ছিল। অস্বীকার করব না, দীর্ঘ দিনের অব্যবহারে প্রায় জ্যাম হয়ে যাওয়া দরজায় জং ধরা চাবিটা লাগানোর সময় বুক ধুকপুক করছিল। জানলাগুলো তো বটেই, আমি দরজাটাও খোলা রাখতাম। সেখান দিয়ে আসা দিনের আলোয় ঘরটার প্রতি ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখেও আমি ওখানে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, ঠান্ডা মেঝে আর অন্ধকার ছাড়া কিছু পাইনি। রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারীরা আমাকে দেখে কী ভাবতেন, কে জানে।
অবশেষে ঠিক করলাম, দিনে নয়, বরং রাতে ওখানে যাব। সে দিন মাঝরাতে আমি যখন ফ্ল্যাশলাইট হাতে ওখানে ঢুকলাম, তখন বাইরে তুমুল ঝড়বৃষ্টি চলছে। ফ্ল্যাশলাইটের জোরালো আলোয় উঁচুনিচু মেঝের মধ্যে আমি অবশেষে একটা অস্বাভাবিক জিনিস দেখলাম।
কী দেখলাম আমি?
নোনা-ধরা মাটি, চুন, এমন নানা জিনিসের মধ্যে অনেকটা ঘাড় গুঁজে বসে থাকার মতো করে স্থির হয়ে আছে একটা সাদাটে চেহারা! নিবে-থাকা ফায়ারপ্লেসের গায়ে একটা বড়, প্রায় মানুষ-প্রমাণ ছত্রাকের দাগ-লাগা দেওয়ালের ঠিক পাশেই ওটা রয়েছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় জিনিসটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন বেশ কিছুটা বাষ্প বা কুয়াশা সাদাটে হলুদ রং নিয়ে ঝিলমিল করছে। ছোটবেলায় এমনই কিছু দেখেছিলাম আমি সেলারের অন্ধকারে। সেই স্মৃতি এবং একটা অশুভ আর বিপজ্জনক কিছুর অস্তিত্ব আমাকে মুহূর্তে সজাগ করে তুলল। বুঝতে পারছিলাম, জিনিসটা আমাকে দেখছে… ক্ষুধার্ত চোখে, হিংস্রভাবে! অবস্থাটা বেশিক্ষণ চললে কী করতাম, জানি না। তবে কিছুক্ষণ পর, ঠিক ধোঁয়ার মতো করেই ফায়ারপ্লেসের চিমনির মধ্য দিয়ে জিনিসটা উঠে গেল। পেছনে রয়ে গেল কিছুটা দুর্গন্ধ, আর আমার শরীর-মন জুড়ে একটা কাঁপুনি।
