আমি কিন্তু কথাগুলো পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারিনি। তার কারণগুলো একে একে লিখি।
এক চাকরের জবানিতে আমি কিছু কথা পড়েছিলাম। অ্যানের সঙ্গে তার কখনও কথা হয়নি। অ্যান হোয়াইট ওই বাড়িতে কাজ পাওয়ার আগেই সে ওখানকার কাজ ছেড়ে দিয়েছিল। প্রিজার্ভড স্মিথ নামের সেই চাকর বলেছিল, রাতে কেউ তার নিশ্বাস কেড়ে নেয়!
১৮০৪ সালে ডক্টর চ্যাড হপকিন্স জ্বরের ঘোরে মৃত্যুর জন্য যে চারটি মানুষের ডেথ সার্টিফিকেট ইশ্য করেছিলেন, তাতেও একেবারে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল একটা তথ্য। চারজনের শরীরেই রক্ত প্রায় ছিলই না!
রোবি হ্যারিস এমন কারও কথা বলতেন, যে নাকি ধারালো দাঁত বের করে তাঁকে খেতে আসত!
আরও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার পাওয়া গেল কাগজ থেকে কেটে রাখা খবরে। ১২ এপ্রিল ১৮১৫-র প্রভিডেন্স গেজেট আর কান্ট্রি জার্নাল-এ একটা মৃত্যুর বর্ণনা পাই। ২৭ অক্টোবর ১৮৪৫-এর ডেইলি ট্র্যানস্ক্রিপ্ট অ্যান্ড ক্রনি-এ ছিল অন্য একটা বিবরণ। ত্রিশ বছরেরও বেশি ব্যবধানে হওয়া এই দুটো ঘটনার মধ্যে এমন একটা মিল ছিল, যাকে মামুলি সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
১৮১৫ সালে ওই বাড়িতে স্ট্যাফোর্ড নামের এক বয়স্ক মহিলা মারা যান। ১৮৪৫ সালে মারা যান এলিয়াজার ডার্ফি নামের এক স্কুল শিক্ষক। মারা যাওয়ার আগে এঁরা দু-জনেই শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তারপর সামনে থাকা ডাক্তারের ঝুঁটি কামড়াতে গিয়েছিলেন! এটাকে জ্বরের ঘোর বলে মানা যায় না। আর-একটা কথাও কাগজে পেলাম। ১৮৬১ সালে যে মৃত্যুগুলোর পর ওই বাড়ি ভাড়া হওয়াই বন্ধ হয়ে যায়, তাতেও প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি সামনে থাকা মানুষের কবজি বা গলা কামড়ে প্রায় ফুটো করে দিয়েছিল!
মোটামুটি ওই সময়েই আমার কাকা তাঁর ডাক্তারি শুরু করেছিলেন ওই এলাকায়। আমার প্রশ্নের উত্তরে থেমে থেমে কাকা কয়েকটা কথা বলেছিলেন।
শুধু মৃত্যুর মিছিল চলার জন্য নয়। জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে-পড়া সূর্যের আলোয় ধুলোর নাচ দেখতে দেখতে কাকা বলেছিলেন, আমার কাছে বাড়িটা কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছিল অন্য একটা কারণে। ওই অপুষ্ট, রুগ্ণ মানুষগুলো এমনিতে মাতৃভাষাই ভালোভাবে লিখতে-পড়তে জানত না। অথচ তারাই অসুস্থ হলে ফরাসি ভাষায় প্রলাপ বকত, চিৎকার করত, হাহাকার করত! ব্যাপারটা কতটা অস্বাভাবিক ভাবতে পারছ?
পারছি। আমি বলেছিলাম, আচ্ছা, এটা কি শুধু ওই চারজনের মধ্যেই হয়েছিল?
উঁহু। মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন এলিহু, প্রায় একশো বছর আগে উন্মাদিনী রোবি হ্যারিসের মধ্যে এই জিনিস প্রথম দেখা আর শোনা গিয়েছিল। এই কথাটা জানতে পারার পরেই বাড়িটার ইতিহাস নিয়ে আমার চর্চা শুরু হয়। ডক্টর চেস আর ডক্টর হুইটমার্শের বাড়িতে যাতায়াত করে তাঁদের কেসবুকগুলো উদ্ধার করি। সেগুলো থেকে একটা ব্যাপারে একেবারে নিঃসংশয় হয়ে যাই। ওই বাড়ির ছোঁয়ায় মানুষগুলোর শুধু শরীরে নয়, মনেও কিছু একটা পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু কীভাবে?
কারণটা জানতে পেরেছিলেন? আমি প্রশ্ন করেছিলাম। প্রতিষ্ঠিত মহলে এসব নিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব ছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকা বলেছিলেন, তাই আমি এই প্রসঙ্গটা ভুলেই গিয়েছিলাম। এবার তুমিই যখন সেগুলো খুঁড়ে বের করলে, তখন বাকি তদন্তটা তোমাকে চালাতে হবে। কী? পারবে তো?
এমনিতে আমি যেমনই হই-না কেন, বোধহয় কাকার বিশ্বাসের মর্যাদা দিতেই আমি এই রেকর্ডগুলো নিয়ে দারুণ সিরিয়াস হয়ে পড়ি।
হ্যারিস পরিবারের শেষ সদস্য ক্যারিংটনের সঙ্গে আমি বহুবার কথা বলেছিলাম। সন তারিখের খুঁটিনাটি মেলানো, মৃত্যুর যে মর্বিড খতিয়ান ডাক্তারদের নোটবুক থেকে পাওয়া গিয়েছিল, তাকে চার্চ আর অন্য প্রতিষ্ঠানের দস্তাবেজ দিয়ে যাচাই করে নেওয়া– এসবই করেছিলাম আমি। হ্যারিস পরিবারের লোকেরা ওই ফরাসি ভাষা নিয়ে কিছু বলতে পারেনি। শুধু এটুকু বোঝা গিয়েছিল যে, মারিয়া নামের ওই পরিচারিকা কিছু জানতেন বা আন্দাজ করেছিলেন। ১৭৬৮-তে কাজে লাগার পর থেকে ১৭৮৩-তে ওই বাড়ি থেকে
হ্যারিস পরিবার পাততাড়ি গোটানো অবধি সময়টা ওখানে ছিলেন মারিয়া। রোবির শেষ সময়ের হাহাকার নিয়ে তিনিই একদা অন্যদের কিছু বলেছিলেন। কিন্তু কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে সেই কথাগুলো।
এই এলাকায় একটা শাসনব্যবস্থার পত্তন হওয়ার গোড়ার দিকের রেকর্ড দেখতে গিয়ে আমি অবশেষে কিছু জানতে পারলাম। নারাগানসেট ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে এই এলাকাটা দখল করেছিল প্রথমদিকের বাসিন্দারা। জন থ্রকমৰ্টন নামের কেউ ওই প্লটটা প্রথম পেয়েছিল। পরে ওই জায়গাটায় রাস্তা বানানো আর নতুন করে জমিজিরেত ভাগাভাগির চক্করে বিস্তর বদল হয়। হ্যাঁ, ওখানে এককালে প্ৰকমৰ্টনদের কবরখানাও ছিল। কিন্তু ব্যাক স্ট্রিট ওরফে বেনিফিট স্ট্রিট বানানোর সময় কবরগুলো নিয়মমাফিক সরিয়ে পটাকেট ওয়েস্ট রোডে সরিয়ে আনা হয়।
ওই জরাজীর্ণ ধূলিমলিন কাগজের স্তূপ থেকে কিছু পাওয়া যাবে না, এমনই ভেবেছিলাম। কপালজোরে একটা কাগজ তখনই দেখলাম। সেটা থেকে জানা গেল, জনৈক এতিয়েন রুলে আর তাঁর স্ত্রী-কে এই জমি লিজ দেওয়া হয়েছিল।
এতক্ষণে আমি একটা ফ্রেঞ্চ কানেকশন খুঁজে পেলাম! নতুন উৎসাহে বলীয়ান হয়ে কাগজে আরও খোঁড়াখুঁড়ি করলাম। জানা গেল, রুলেদের একটা ছোট্ট একতলা কটেজের পেছনেই ছিল তাদের পারিবারিক কবর। ১৭৪৭ থেকে ১৭৫৮-র মধ্যে ব্যাক স্ট্রিটকে সোজা করার জন্য কটেজটা ভাঙা হয়েছিল। কিন্তু ওই কবরগুলো সরানোর কোনও প্রমাণ আমি পেলাম না। পুরোনো ম্যাপ দেখে দেখে আমার চোখে পার্মানেন্ট হলদে ভাব হয়ে গেল। অবশেষে আমি যা খুঁজছিলাম, তা পেলাম।
