এইসবের মধ্যে রোবি হ্যারিসের উন্মাদনা ক্রমেই অন্য চেহারা নিচ্ছিল। ঠিক কী বলে চিৎকার করতেন রোবি, সেই বিষয়ে কাগজপত্র নীরব। তবে ফরাসি ভাষায় কিছুমাত্র দখল না-থাকা সত্ত্বেও ওই ভাষায় তিনি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন– এটা লেখা আছে। অপলক চোখে তাঁর দিকে কে যেন তাকিয়ে আছে, কে যেন তাঁকে খেতে আসছে– এইসব বলে আর্তনাদ করতেন রোবি। বাড়ির পরিস্থিতি এতই ঘোরালো হল যে, সাময়িকভাবে উইলিয়ামকে তার খুড়তুতো দাদা পেলেগের কাছে সরিয়ে দেওয়া হয়। উইলিয়ামের অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল তার ফলে। ১৭৭২ সালে জেনাস মারা যায়। রোবি নাকি পাগলের মতো হেসেছিলেন সেই মৃত্যুসংবাদ পেয়ে। পরের বছর তাঁরও মেয়াদ ফুরোয়।
১৭৭৫ সালে শুরু হয় গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে তার কলোনির ঝামেলা। সেটা ক্রমে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হয়। উইলিয়াম হ্যারিসের শরীর যতই ক্ষয়টে থোক না কেন, মাত্র ষোলো বছর বয়সে সে জেনারেল গ্রিনের বাহিনীতে যোগ দেয়। তারপর উইলিয়ামের স্বাস্থ্য এবং সম্মান, দুয়েরই প্রভূত উন্নতি হয়। ১৭৮০ সালে রোড আইল্যান্ড এলাকার ভারপ্রাপ্ত ক্যাপটেন থাকার সময় এলিজেবেথটাউনের বাসিন্দা ফেবে হেটফিল্ডের সঙ্গে উইলিয়ামের বিয়ে হয়। পরের বছর যুদ্ধ থামলে, সেনাবাহিনী থেকে সসম্মানে অবসর নিয়ে উইলিয়াম সস্ত্রীক তাঁর পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়িটা মজবুত অবস্থায় ছিল। এলাকাটাও বেশ পশ হয়ে উঠেছিল তদ্দিনে, যার ফলে রাস্তাটার নাম ব্যাক স্ট্রিটের বদলে বেনিফিট স্ট্রিট হয়ে গিয়েছিল।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, উইলিয়ামের প্রত্যাবর্তন সুখের বা আনন্দের হয়নি। তত দিনে মার্সি এবং মারিয়ার শরীর-স্বাস্থ্য জবাব দিয়ে দিয়েছে। ১৭৮২-র শরৎকালে ফেবে একটি মৃত কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। ১৭৮৩-র মে মাসে মারিয়াও পাড়ি জমায় দুনিয়া ছেড়ে। এরপর উইলিয়াম হ্যারিসের মনে আর কোনও সংশয় ছিল না। এই বাড়ি যে বিপজ্জনক– এটা বুঝে উইলিয়াম প্রথমে গোল্ডেন বল সরাইয়ে, তারপর বড় ব্রিজের ওপারে ওয়েস্টমিনস্টার স্ট্রিটের ওপর নতুন বাড়ি বানিয়ে সেখানেই চলে যান। ১৭৮৫ সালে তাঁদের ছেলে ডাটির জন্ম হয়। ১৭৯৭ সালের মড়কে উইলিয়াম আর তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। পেলেগ যেভাবে একসময় রুগণ উইলিয়ামের দেখাশোনা করেছিলেন, সেভাবেই তাঁর ছেলে র্যাথবোন হ্যারিস এবার ডাটির দায়িত্ব নেন।
র্যাথবোন একটু কড়া ধাঁচের বাস্তববাদী লোক ছিলেন। ডাটির ভরণপোষণে যাতে সমস্যা না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য তিনি বেনিফিট স্ট্রিটের বাড়িটা ভাড়া দেন। ভাড়াটেদের মৃত্যু, বাড়িটা ছেড়ে চলে যাওয়া, কানাকানি এসবে র্যাথবোনের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তবে ১৮০৪ সালে প্রায় একসঙ্গে চারজন ভাড়াটের মৃত্যুর পর শহরের কাউন্সিল র্যাথবোনকে গন্ধক, আলকাতরা, কর্পূর দিয়ে বাড়িটা শোধন করতে আদেশ দেয়। ডাটি নিজে বাড়িটা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতেন বলে মনে হয় না। ১৮১২-য় ব্রিটেনের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে ডাটি ক্যাপটেন ক্যাহুনের নেতৃত্বে লড়েছিলেন। অক্ষত দেহেই ডাটি যুদ্ধ থেকে ফেরেন, ১৮১৪-য় বিয়ে করেন, এবং ১৮১৫-য় এক দারুণ দুর্যোগের রাতে ওয়েলকাম নামে এক পুত্রসন্তানের গর্বিত পিতা হন। ওয়েলকাম দীর্ঘায়ু হননি৷ ১৮৬২ সালে ফ্রেডরিক্সবার্গের যুদ্ধে তিনি মারা যান।
ওয়েলকাম বা তাঁর ছেলে আর্চার ওই বাড়িটা নিয়ে কিছু লিখে যাননি। বাড়িটা ভাড়া দেওয়া এমনিতেই দুঃসাধ্য ছিল। ১৮৬১ সালে আবার পরপর কয়েকটা মৃত্যু ঘটে ওখানে। গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে সেসব ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে লোকে আর ওটা ভাড়া নিত না।
.
০৩.
হ্যারিস পরিবারের এই ইতিহাস আমাকে ঠিক কতটা ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল, বোঝাতে পারব না। এতগুলো মৃত্যু, অসুস্থতা এবং সে-ও শুধু ওই পরিবারে নয়, অন্য ভাড়াটেদের পরিবারেও… এর থেকে একটাই জিনিস পরিষ্কার হয়। ওই পরিবারে নয়, বরং ওই বাড়িটায় গণ্ডগোল আছে। সেটাও এমন কিছু, যাকে মামুলি ড্যাম্প বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না।
কোন সে মৃত্যুদূত, যে ওই বাড়িতে শিকার করে চলেছে একের পর এক মানুষকে?
অনেক কিছু রেকর্ড করেছিলেন ডক্টর এলিহু। অনেক গুজব, অভিযোগ, অপবাদ… মুশকিল হল, সেই ডকুমেন্টেড জিনিসগুলোর ভাঁজে ভাঁজে মিশে গিয়েছিল এলাকার মানুষের দীর্ঘলালিত কুসংস্কার। ফলে কোন কথাটাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, আর কোনটাকে নয়, সেটা বুঝতেই আমি হিমশিম খেয়ে যাই। একটা উদাহরণ দিই। অন্তত তিনজন মানুষ একেবারে জবানবন্দি দিয়ে বলেছেন, ওই বাড়ির সেলারে যে বিচিত্র ছত্রাক হয়, তার চেহারা, গন্ধ, আলো… এগুলো তাদের প্রভাবিত করেছে। ছোটবেলার স্মৃতি থেকে আমি বুঝতে পারছিলাম, এটা হতেই পারে। কিন্তু একই নিশ্বাসে সেই লোকেরা ডাইনি আর অপদেবতা নিয়ে যত রাজ্যের ভুলভাল কথাও বলেছিল শ্রোতাদের সামনে।
অ্যান হোয়াইটের কথাই ধরুন। সেলারের ছত্রাকের বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি ও বলেছিল, ওই বাড়ির নীচে কোনও রক্তচোষার বাস! একেবারে হাল আমলেও এক্সেটারের লোকজন এই ভ্যাম্পায়ার-ট্যাম্পায়ার নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। কাজেই তখন এই কথার মহিমা কেমন ছিল ভাবুন! ওই বাড়িটা যে জমিতে বানানো, সেটা কোনও একসময়ে কবরখানা ছিল। তাই লোকে জুলজুলে চোখে কান খাড়া করে ওই বাড়ির সেলারে অ্যানের কী ধরনের ভয়াল-ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে তা শুনত। অ্যানের ওই ক্রমাগত সেলার খোঁড়ো, নয়তো মরো! কথায় ক্লান্ত হয়ে ওকে বাড়ি থেকে দূরই করে দেওয়া হয়েছিল একসময়।
