আমি বাড়িটার কথা প্রথম শুনি ছোটবেলায়। ওটাকে লোকে অপয়া বাড়ি বলত। ওখানে যারাই থাকে, তাদেরই নাকি আয়ু ফুরিয়ে যায় বড় তাড়াতাড়ি। অথচ আশপাশের বাড়িতে তেমন কোনও সমস্যা ছিল না। সচরাচর এমন বাড়িকে ভূতুড়ে বলে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সেটাও করা যায়নি, কারণ জানলায় ধোঁয়াটে মুখ, হঠাৎ করে ভেসে-আসা ঠান্ডা হাওয়া, আলোর আচমকা জ্বলা-নেবা… এমন কিছু হত না ওই বাড়িটায়। তাই এলাকার সবার বক্তব্য ছিল, বাড়িটার জল-হাওয়ায় রোগব্যাধির জীবাণু বড় বেশি। তবে হ্যাঁ, লোকে মুখে মুখে কিছু কথা বলত। ওই বাড়িতে যারা কাজকর্ম করত, তারা নিজেদের মধ্যে গুজগুজ-ফুসফুস করে অনেক কিছুই বলত। সেগুলো লোকে পাত্তা দিত না। পরে যখন প্রভিডেন্স জমজমাট এলাকা হয়ে গেল, তখন লোকের ভিড়ে চাপা পড়ে গেল সব কথা।
ছোটবেলায় আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও ওই বাড়িটায় বিস্তর দস্যিগিরি করেছি। ওটা তত দিনে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। মাকড়সার জাল আর অন্ধকার, ভাঙা আসবাব আর সবুজ-হয়ে-যাওয়া দেওয়াল… এগুলোর মাঝে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দশ মিনিটও কাটাতে চাইবেন না। তবে আমাদের কাছে ওগুলো ছিল দারুণ সব অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা। বাড়িটার একমাত্র জায়গা, যেটা আমরা এড়িয়ে চলতাম, সেটা হল মাটির নীচের সেলার। ওখানে এক ধরনের ছত্রাক হত। ছাদ, দেওয়াল, এমনকী মেঝে থেকেও উঠে আসত ছত্রাকগুলো। সেগুলোর বিশ্রী গড়ন দেখে আমাদের গা-শিরশির করত। একটা সময়ে ছত্রাকগুলো ভেঙে গিয়ে সবৃজেটে-নীল আলোর গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ত। লোকে ভাবত, জলার মতো ওই বাড়ির নীচ থেকেও উঠে আসছে আলেয়া।
.
০২.
ওই বাড়িটায় আসল গোলমাল কী, সেটা স্রেফ দু-জন মানুষ জানতেন। একজন আমার কাকা ডক্টর এলিহু হুইপল। অন্যজন আমি। আমেরিকার সবচেয়ে বনেদি পরিবারগুলোর মধ্যে একটির সন্তান ছিলেন এলিহু। প্রত্নতত্ত্ব আর নৃতত্ত্ব– এই দুই শাখাতেই তাঁর মতো পণ্ডিত বিরল। বাড়িটার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর বলেই ওখানে এত লোক মারা গেছে, এমনটাই ছিল তাঁর ঘোষিত মত। ভদ্রলোকের যা ব্যক্তিত্ব, তাতে এই নিয়ে তাঁকে খোঁচাখুঁচি করা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আদরের ভাইপোর নাছোড় দাবি এড়ানোও কি সহজ? নিরুপায় হয়ে কাকা আমার কাছে একদিন তাঁর খাতাপত্র রেখে দিয়ে নাও! পড়ো! বলতে বাধ্য হন। ওই বাড়িটা নিয়ে শ-খানেক বছর ধরে চলে-আসা কানাকানি আর তাঁর নিজের নোট-করা কিছু পর্যবেক্ষণ তখনই আমার সামনে আসে।
সযত্নে সংকলিত ওই রেকর্ড অনুযায়ী বাড়িটা বানানো হয়েছিল ১৭৬৩ সালে। ওখানে বসত-করা প্রথম পরিবারের সদস্য ছিলেন উইলিয়াম হ্যারিস, তাঁর স্ত্রী রোবি ডেক্সটার, তাঁদের ছেলেমেয়েরা, অর্থাৎ এলকানা, অ্যাবিগেইল, উইলিয়াম জুনিয়র আর রুথ। হ্যারিস সেই আমলের বেশ নামকরা ব্যবসায়ী এবং নাবিক ছিলেন। হ্যারিস চেয়েছিলেন, তাঁর পঞ্চম সন্তানের জন্ম হওয়ার আগেই যেন নতুন বাড়িটা তৈরি হয়ে যায়। বাড়ি হল, ১৭৬৩-র ডিসেম্বরে তাতে হ্যারিস আর রোবির পঞ্চম সন্তানের জন্মও হল। কিন্তু বাচ্চাটি মৃত হয়েই জন্মায়।
পরের বছর এপ্রিলে হঠাৎ-হওয়া অসুখে অ্যাবিগেইল আর রুথ মারা যায়। স্থানীয় ডাক্তার ওটাকে সংক্রমণ বলেছিলেন। কিন্তু বর্ণনা থেকে ওটাকে স্রেফ শরীরের ক্ষয় ছাড়া কিছু বলা যায় না। সংক্রমণের জন্য কী দায়ী তা বোঝার আগেই জুন মাসে ওই পরিবারের এক ভৃত্য হ্যাঁনা ব্রাউন মারা যায়। অন্য ভৃত্য এলি লিডিয়াসন দুর্বলতা এবং আরও নানা কারণ দেখিয়ে কাজ ছেড়ে চলে যেতে চাইছিল। হ্যাঁনার জায়গায় মেহিতাবেল পিয়ার্স নামের যে নতুন মেয়েটি আসে, তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ায় সে ব্যাপারটা পিছিয়ে দেয়। ওই দেরিটাই কালান্ত হয়ে যায়। পরের বছরেই মারা যায় এলি৷ সেই বছরে উইলিয়াম হ্যারিসও মারা যান। বিষণ্ণ বাড়িটায় থেকে যান বিধবা রোবি আর তাঁর দুই ছেলে।
দু-বছর পর এলকানার মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর ধাক্কায় ইতিমধ্যেই কাহিল রোবি এটা বরদাস্ত করতে পারেননি। ১৭৬৮-র কোনও একসময় তাঁর মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেই সময় এর চিকিৎসা বলে কিছু ছিল না। তাঁকে বাড়ির ওপরতলায় আটকে রাখা হয়। রোবির দিদি মার্সি ডেক্সটার এই পরিবারের দায়িত্ব নিতে আসেন। বোনের আর রুগ্ণ বোনপো উইলিয়ামের যথাসাধ্য দেখভাল করতেন মার্সি।
১৭৬৮-তেই প্রথমে মেহিতাবেল মারা যায়। তারপর অন্য কর্মচারীটিও অসংলগ্ন কিছু গালগল্প শুনিয়ে, শেষে বাড়িটার গন্ধ পছন্দ হচ্ছে না বলে একদিন হাওয়া হয়ে যায়। একের পর এক মৃত্যু আর এইসব গালগল্পের অবধারিত ফল হয় একটাই। মার্সি এলাকা থেকে এমন কাউকে জোগাড় করতে পারেননি যে, ওই বাড়িটায় কাজ করতে রাজি হবে। বিস্তর চেষ্টা করে তিনি নুসনেক এলাকার বাসিন্দা অ্যান হোয়াইট নামের এক গম্ভীর, মলিনবদন মহিলাকে এই বাড়িতে কাজ করাতে রাজি করান। বস্টনের বাসিন্দা জেনাস লো বলে এক মোটামুটি করিতকর্মা পুরুষও ওই বাড়িতে এরপর কাজে ঢোকে।
এই বাড়ি নিয়ে গল্পগুলো জমাট আকার পায় অ্যান হোয়াইটের মাধ্যমে। মাস তিনেকের মধ্যে অ্যানকে বরখাস্ত করে নিউপোর্টের মারিয়া রবিন্সকে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু তদ্দিনে বাড়িটা নিয়ে বাজারে যা চাউর হওয়ার ছিল, হয়ে গেছে।
