তখনই দেখলাম তাকে। কালো জলে অতি সামান্য আলোড়ন তুলে উঠে এল জীবটা। বিশালাকায়, বীভৎস চেহারা তার, যেন সাক্ষাৎ পসেইডন পুত্র পলিফেমাস। কোনও এক দুঃস্বপ্নের দানবের মতন ছিটকে গিয়ে আঁশে ঢাকা দুই হাতে শিলাস্তম্ভটাকে জড়িয়ে ধরল সেটা। ভয়ানক মাথাটা ঝুঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল মাপা আওয়াজে।
ঠিক তখনই বোধহয় আমার মাথাটা বিগড়ে যায়।
আমার উন্মত্তের মতন খাদের চড়াই বেয়ে ওঠার কথা, কিম্বা প্রলাপ বকতে বকতে নৌকো অবধি পৌঁছনোর কথা বিশেষ মনে নেই। কেবল মনে আছে গান গাইছিলাম গলা ছেড়ে, আর তা না পারলে হাসছিলাম আপন মনে। আর মনে আছে নৌকোয় পৌঁছনোর কিছুক্ষণ বাদেই এক প্রলয় তুফানের কথা। সে তুফানের বাজের আওয়াজ আর প্রকৃতির প্রমত্ততার অন্যান্য শব্দের কথাও ভুলিনি এখনও।
ঘোর যখন কাটল তখন আমি সান ফ্রান্সিসকোর এক হাসপাতালে। মাঝ সমুদ্র থেকে যে জাহাজ আমাকে উদ্ধার করে তার ক্যাপ্টেনই আমাকে সেখানে পৌঁছে দিয়ে যায়। প্রলাপের ঘোরে আমি নাকি অনেক কিছুই বলেছিলাম, কিন্তু সেসব কথায় কান দেয়নি কেউই।
প্রশান্ত মহাসাগরে কোন ভূ-প্রলয়ের কথা আমার উদ্ধারকারীরা শোনেনি। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না জেনে আমিও আর বেশি ঘাঁটাইনি। একবার এক স্বনামধন্য এথনোলজিস্টকে খুঁজে বের করে তাঁকে প্রাচীন ফিলিস্টিনদের মৎস দেবতা ডেগনকে নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করেছিলাম। দেখলাম তিনি আমার কথায় কেবল আমোদই পাচ্ছেন। আমিও তাঁর চিন্তাভাবনা একবারেই গতানুগতিক দেখে আর কথা বাড়াইনি।
কিন্তু রাতের বেলায়, বিশেষত কৃষ্ণপক্ষের আকাশে যখন সামান্য ক্ষয়লাগা চাঁদ ওঠে, তাকে আমি দেখতে পাই। মরফিন ব্যবহার করে দেখেছিলাম স্বস্তি মিলেছে সামান্যই। উলটে দাস হয়ে পড়েছি এই কালান্তক নেশার। তাই শেষ করে দিতে চলেছি সব। যদিও জানি যা লিখেছি তা পড়ে মানুষ হয়তো ব্যঙ্গ করবে, নাক ওলটাবে।
প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি, জার্মান যুদ্ধ জাহাজ থেকে পালিয়ে অনাবৃত নৌকোয় যখন রোদ লেগে জ্বরের ঘোরে পড়েছিলাম, সে সময় সমস্তটা কল্পনা করিনি তো? প্রশ্ন করি বটে নিজেকে, কিন্তু উত্তরে মনের মধ্যে ভেসে ওঠে প্রায় জীবন্ত এক ভয়ানক ছবি। গভীর সমুদ্রের কথা কল্পনা করলেই মনে হয় সেই জীবগুলো বোধহয় তার তলদেশের কাদায় লেপটে বেড়াচ্ছে। হয়তো উপাসনা করছে তাদের প্রাচীন প্রস্তর মূর্তির। কিম্বা জলমগ্ন গ্রানাইটের শিলাস্তম্ভে ফুটিয়ে তুলছে নিজেদের বীভৎস অবয়ব। দুঃস্বপ্ন দেখি কোনও একদিন তারা উঠে আসবে সমুদ্র তরঙ্গের ওপরে, দূষিত নখরপিঞ্জরে বিঁধে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মানবজাতিকে টেনে নিয়ে যাবে পাতালে। সেইদিন, যেদিন জগৎজোড়া প্রলয়ের মাঝে ভূপৃষ্ঠ যাবে ডুবে, উঠে আসবে সমুদ্রের কালো কুৎসিত তলদেশ।
শেষের সেই সময় ঘনিয়ে এসেছে। দরজায় কার যেন আওয়াজ পাচ্ছি! যেন কোনও পিচ্ছিল শরীর ধীর ভারী পদক্ষেপে ধাক্কা দিচ্ছে তাতে। ওঃ ভগবান ওই হাতটা! জানলা! জানলাটা কোথায়!
[প্রথম প্রকাশ: ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে গল্পটি দ্য ভ্যাগর্যান্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে লেখাটি বিখ্যাত পাল্প ম্যাগাজিন উইয়ার্ড টেলস-এও ছাপা হয়।
ভাষান্তর : সুমিত বর্ধন]
তফাত যাও
তফাত যাও! (THE SHUNNED HOUSE)
[আপাতদৃষ্টিতে ভূতের বাড়ির গল্প হলেও লাভক্র্যাফট সুচারুভাবে এর সঙ্গে ভ্যাম্পায়ারের জনশ্রুতি ও প্রভিডেন্সের সত্যিকারের ঘটনা ও স্থান মিশিয়ে দিয়েছেন। দ্য ডানউইচ হরর বা দ্য কল অব কথুলুর মতো এই গল্পেও লাভক্র্যাফট বিজ্ঞানের সঙ্গে অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি সংঘাত ঘটিয়েছেন। প্রথমে ছাপতে অসমর্থ হলেও লাভক্র্যাফটের মৃত্যুর পরে লেখাটি উইয়ার্ড টেলস পত্রিকায় প্রকাশ পায়।]
০১.
১৮৪০-এর দশকের প্রভিডেন্স৷ এডগার অ্যালান পো তখন প্রতিভাবান কবি শ্রীমতী ওয়াল্টার হুইটম্যানের প্রেমে পড়েছেন। বেনিফিট স্ট্রিটের ম্যানসন হাউস থেকে হুইটম্যানের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন পো। তাঁর সেই প্রেমনিবেদন সফল হয়নি, এ কথা সবাই জানেন। পো-র সেই যাত্রাপথের ডানদিকে পড়ত একটা পুরোনো বাড়ি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কী জানেন? টিলার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ওই অবহেলিত, জীর্ণ দোতলা বাড়িটার ভেতরে এমন ভয়ানক জিনিস ছিল, এবং আছে, যা পো-র লেখাকেও হার মানাবে। অথচ পো এমন কিছু আন্দাজ করতে পারেননি। সেন্ট জেমস চার্চের লাগোয়া বিস্তীর্ণ সমাধিক্ষেত্র নিয়ে পো অনেক কিছু লিখেছেন। কিন্তু ওই বাড়িটা নিয়ে তিনি কিছু লেখেননি।
অবশ্য পো-কে দোষ দেওয়া যায় না। নিউ ইংল্যান্ডের আদি বাসিন্দারা যখন ওখানে নিজেদের বাড়িঘর বানিয়েছিলেন, তখন ওই সমাধিক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে যেতে হত। পরে রাস্তাটা সোজা আর চওড়া করতে গিয়ে বিস্তর ভাঙাভাঙি হয়। তাই পো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একটা ফুট দশেক উঁচু ধূসর দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখেননি। বাড়িটার পেছনে, দক্ষিণদিকে অনেকটা ভোলা আর উঁচু জায়গা ছিল, যেটা রাস্তা থেকে দেখা যেত না। শ্যাওলা-ধরা পাথরে ঘেরা ওই জায়গাটায় কী আছে? ভাঙা সিঁড়ি, মরা ঘাস, বিবর্ণ ইটের দেওয়াল, আগাছা আর আধমরা গাছে ভরা বাগান, আর এসবের মাঝে সময়ের মার খেয়ে কালশিটে পড়ে যাওয়া সদর দরজা। এরপরেও বাড়িটাকে কে মনে রাখবে বলুন?
