চাঁদের আলোয় যা দেখলাম তাতে বুঝলাম আমার দিনেরবেলায় যাত্রা করাটা বোকামি হয়েছে। রোদের তাপ না থাকলে আমার এত শক্তিক্ষয় হত না। সত্যি বলতে কি সূর্যাস্তের সময় যে পাহাড়ে চড়াটাকে ভয় পাচ্ছিলাম, মনে হল সেটা এবার অনায়াসে করে ফেলতে পারি। ঝোলাটা তুলে নিয়ে পাহাড়ে চড়তে আরম্ভ করলাম শিখর লক্ষ করে।
আগেই বলেছি প্রান্তরের বৈচিত্রহীনতা আমার ওপর কেমন একটা আতঙ্কের ছাপ ফেলেছিল। কিন্তু পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে সে আতঙ্ক বেড়ে গেল বহুগুণ। দেখলাম পাহাড়ের নিচে এক অতলস্পর্শী খাদ। চাঁদের আলো তখনও স্পর্শ করেনি তার গভীরতার জমাট বাঁধা অন্ধকার। মনে হলে যেন দাঁড়িয়ে আছি পৃথিবীর অন্তিম কিনারায়, যার পরে রাজত্ব শুরু হয়েছে অনন্ত রাত্রির অরাজকতার। মনে ভেসে উঠল প্যারাডাইস লস্ট আর নিরাকার অন্ধকারের রাজ্যে শয়তানের ভয়ানক উত্থানের অদ্ভুত সব আতঙ্ক জড়ানো স্মৃতি।
চাঁদ আকাশের আরও কিছুটা ওপরে উঠে আসতে দেখলাম সামনের উপত্যকার উতরাই যতটা খাড়া ভেবেছিলাম ততটা নয়। উঁচিয়ে থাকা পাথর আর কার্ণিশ ধরে অনায়াসে নিচে নামা যায়। শখানেক ফুটের পর ঢালের খাড়াইও অনেক কম।
মাথায় কি ভূত চাপল জানি না, হাঁচড়পাঁচড় করে পাথর বেয়ে নেমে এসে দাঁড়ালাম নিচের ঢালের ওপর। তার নিচের পাতালজোড়া অন্ধকারে তখনও আলো এসে পড়েনি।
দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই নজর গেল উলটোদিকের ঢালের একটা অদ্ভুত জিনিসের দিকে। আমার থেকে প্রায় একশো গজের মধ্যেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বিশাল কোনও বস্তু৷ চাঁদের আলোয় সাদা ঝকঝক করছে তার চেহারা। নিজের মনকে প্রথমে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম, যে সেটা বৃহৎ আকারের একটা পাথর বই আর কিছু নয়। তার গড়ন আর অবস্থান দেখে তাও কেমন যেন মনে হতে লাগল যে সেটা হয়তো প্রকৃতির হাতে সম্পূর্ণ গড়া নয়।
কিন্তু জিনিসটাকে খুঁটিয়ে দেখার পরে মনের ভেতর যে সব ভাবের উদ্রেক হল তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। বস্তুটি আয়তনে অতিবিশাল। দাঁড়িয়ে সেটা এমন এক পাতাল করে যা অতল সাগরজলে নিমজ্জিত ছিল লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। অথচ বুঝতে অসুবিধে হয় না সেটা একটা শিলাস্তম্ভ। আর তার সুগঠিত আকার এককালে যারা গড়ে তুলেছে, কিংবা হয়তো আরাধনা করেছে, তারা অতি অবশ্যই কোনও জীবন্ত, বুদ্ধিমান প্রাণী।
ভয়ের সঙ্গে যোগ হল কেমন একটা অবিশ্বাসের ঘোর। বৈজ্ঞানিক কিংবা প্রত্নত্বাত্তিকদের মতো উত্তেজিতও হয়ে পড়লাম কিছুটা। আরও একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। চাঁদ উঠে এসেছে প্রায় মাথার ওপরে। তার অদ্ভুত উজ্জ্বল আলো পড়েছে খাদের খাড়া দেওয়ালের ওপর। সে আলোয় দেখলাম সামনে ছড়িয়ে রয়েছে প্রশস্ত জলস্তর, তার দু প্রান্ত এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। আমার পায়ের কাছে ছলছল করছে তার মৃদু তরঙ্গ, আর খাদের উলটোদিকে সেই জলের ঢেউ ধুইয়ে দিচ্ছে বিশাল শিলাস্তম্ভের পাদদেশ।
শিলাস্তম্ভের গায়ে এবার নজরে পড়ল শিলালেখ আর অপটু শৈলিতে খোদাই ভাষ্কর্য। শিলালেখের অদ্ভুত দর্শন সেই হাইরোগ্লিফিক লিপি আমি আগে কখনও দেখিনি কিংবা বইতেও পড়িনি। তার বেশির ভাগ অক্ষরই যেন মাছ, তিমি, কাঁকড়া, ঝিনুক, অক্টোপাস ইত্যাদি জলজ প্রাণীর প্রতীকি রূপ। আরও দু-একটা অক্ষরে চেহারা নিয়েছে এমন কিছু প্রাণীর যারা আজকের যুগে অজানা, কিন্তু যাদের পচন লাগা শরীরগুলো আমি আগেই দেখেছি প্রান্তরের পাঁকে পড়ে থাকতে।
প্রকাণ্ড ভাস্কর্যগুলোও জলের এপার থেকেও অনায়াসে দেখা যাচ্ছিল। হতভম্ব হয়ে গেলাম তাদের ওপর চোখ পড়তেও। পাথর কুঁদে বাস-রিলিফে গড়া সেসব প্রস্তর শিল্পের বিষয়বস্তু দেখলে প্রখ্যাত ভাষ্কর ডোরে পর্যন্ত ঈর্ষায় জ্বলতেন৷ মূর্তিগুলো বোধহয় মানুষের, অথবা বলা ভালো মানুষের আদলের কোনও প্রাণীর। কোনও এক সামুদ্রিক গুহার জলে তারা খেলে বেড়ায় মাছের মতন, অথবা উপাসনা করে কোনও জলমগ্ন শিলাস্তম্ভের। তাদের চেহারার বিশদ বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করব না, কারণ সে সব কথা মনে পড়লেই মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। অবয়বের গঠন তাদের অনেকটা মানুষের মতো হলেও হাত পায়ের আঙুল তাদের হাঁসের মতন জোড়া, ড্যাবড়েবে, চকচকে দুই চোখের নিচে বসানো একজোড়া চওড়া থলথলে ঠোঁট। তাদের চেহারার বাকি সব বিশেষত্বের কথা মনেও আনতে চাই না। পো কিংবা বুলওয়ার তাঁদের দুঃস্বপ্নেও সেইরকম বীভৎসতা কল্পনা করতে পারতেন না।
তবে একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগল। মনে হলে পাথর কুঁদে গড়ার সময় পেছনের দৃশ্যপটের অনুপাত অনুযায়ী প্রাণীগুলোর আয়তন যথাযথ রাখা হয়নি। একটা ভাষ্কর্যে লক্ষ করলাম একটা প্রাণী তিমি শিকার করছে, কিন্তু আয়তনে তিমিটা তার চাইতে সামান্যই বড়। ওই আয়তন আর কিম্ভুত চেহারা থেকেই কয়েক লহমায় সিদ্ধান্ত করলাম প্রাণীগুলো খুব সম্ভব কোনও কল্পিত দেবতার রূপ। তাদের উপাসনা করত যে সব প্রাগৈতিহাসিক সমুদ্রচারী কিংবা মৎসজীবি উপজাতিরা, পিল্টডাউন মানব কিম্বা নিয়েনডারথালের প্রথম পুরুষ জন্ম নেওয়ার বহু আগেই হয়তো লুপ্ত হয়ে গেছে তাদের শেষ বংশধরেরা।
কোনও দুঃসাহসিক নৃতত্ত্ববিদেরও কল্পনাতীত এক অতীতের এই অপ্রত্যাশিত দর্শন পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম চিন্তামগ্ন হয়ে। সামনের শব্দহীন জলে তখন অদ্ভুত সব ছায়া ফেলছে চাঁদের আলো।
