মাল সরকারের দায়িত্ব নিয়ে জাহাজে চড়ে যাত্রা করছিলাম। বিস্তীর্ণ প্রশান্ত মহাসাগরের এক অকূল নির্জন অঞ্চলে জার্মান হানাদারের খপ্পরে পড়ল আমাদের জাহাজ। মহাযুদ্ধ তখন সবে শুরু হয়েছে। জার্মান নৌসেনারা তখনও তাদের যুদ্ধের শেষবেলার হতাশা এবং মানসিক অধঃপতনে একেবারে ডুবে যায়নি। জাহাজখানা তারা যুদ্ধের পারিতোষিক হিসেবে দখল করল বটে, কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের প্রতি যে ন্যায্য, ভদ্র আচরণ প্রাপ্য, তাদের আচরণ হল সেরকমই। তাদের ঢিলেঢালা নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে একলা একটা নৌকোয় চড়ে পালালাম ধরা পড়ার পাঁচদিন বাদেই। সঙ্গে নিলাম বেশ কিছুদিন চলার মতো জল আর খাবার।
মুক্তি পেয়ে নৌকো নিয়ে যখন ভাসলাম, তখন ঠিক কোথায় রয়েছি তার বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। নাবিকদের মতো দিক নির্ণয় করার ক্ষমতাও আমার ছিল না কোনওদিন। আকাশের তারা আর সূর্যের গতিবিধি থেকে আন্দাজ করতে পারছিলাম যে রয়েছি বিষুবরেখার দক্ষিণে কোথাও। তবে ঠিক কোন দ্রাঘিমাংশে তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। চোখে পড়েনি কোনও দ্বীপ বা উপকূলের রেখাও।
আশা করেছিলাম হয়তো কোনও জাহজের নজরে পড়ব, অথবা পৌঁছে যাব টিকে থাকার মতন কোনও সমুদ্রতটে। সমুদ্রের পরিষ্কার আবহাওয়ায় জ্বলন্ত সূর্যের নিচে উদ্দেশ্যহীনভাবে ভাসতে ভাসতে কেটে গেল না-গোনা অনেকগুলো দিন। এ ক-দিনে না কোনও জাহাজ চোখে পড়ল, না ডাঙার চিহ্ন দেখতে পেলাম। সেই বিরামহীন নীল উত্তাল বিশালতার মাঝে একাকীত্ব গ্রাস করল আমায়, ক্রমশ মুষড়ে পড়তে লাগলাম আমি।
অবস্থা যখন পালটালো তখন আমি ঘুমিয়ে। স্বপ্নতাড়িত এক ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমে সে সময় একনাগাড়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকি আমি। তাই ঠিক কী হয়েছিল জানার এখন আর কোনও উপায় নেই। ঘুম ভেঙে দেখলাম আঠালো পাঁকে শরীরের অর্ধেক ডুবে রয়েছে আমার। আর চারপাশে ভয়ানক ঊর্মিমালার মতো চেহারা নিয়ে দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণকালো, পঙ্কিল, এক নারকীয় প্রান্তর। একটু দূরে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে আমার নৌকোটা।
.
ভাবছেন হয়তো এইরকম অপ্রত্যাশিত অদ্ভুত দৃশ্যপট পরিবর্তনে আমি একেবারে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। না হইনি। বরং সেখানকার পচা জমি আর হাওয়ায় মিশে ছিল এমন এক অশুভ ইঙ্গিত যে বিস্ময় নয়, আতঙ্ক গ্রাস করেছিল আমায়। হিম হয়ে এসেছিল অন্তরাত্মা। অন্তহীন সেই পূতিগন্ধময় প্রান্তরের চারপাশে ছড়িয়ে পচাগলা মাছ। জঘন্য পাঁক থেকে ইতস্ততঃ উঁচিয়ে রয়েছে অবর্ণনীয় অন্যান্য জীবদেহ। যেদিকে দু-চোখ যায় কেবল আঠালো কালো পাঁক ছাড়া আর দেখার কিছু নেই, কান পাতলে শোনা যায় না কোনও শব্দও। মাথার ওপরে সূর্য আগুন ঝরাচ্ছে যে নির্মেঘ নিষ্ঠুর আকাশ থেকে, তার রংও নিচের জলাভূমির মতনই কালো। সে ঊষর ব্যাপ্তি আর নিথর নীরবতার বীভৎসতাকে বর্ণনা করি এমন সাধ্য আমার নেই। অখণ্ড নিস্তব্ধতায় মোড়া বৈচিত্রহীন সেই দৃশ্যপটের আতঙ্কে নাড়ি উলটে আসছিল আমার।
শরীরটাকে টেনে নৌকোয় নিয়ে যেতে যেতে কী ঘটেছে কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম। কোনও এক অভূতপূর্ব ভূস্তরীয় উপদ্রবে জলের অতল গভীরতায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ডুবে থাকা সমুদ্রের তলদেশের একাংশ ছিটকে উঠে এসেছে ওপরে। বুঝলাম এই নবীন ভূখণ্ডের ব্যাপ্তি অতিবিশাল। কারণ বহু চেষ্টা করেও সমুদ্রের ক্ষীণতম আওয়াজটুকু আমার কানে এল না। চোখে পড়ল না মাছের দেহাবশিষ্টের লোভে উড়ে আসা কোনও সামুদ্রিক পাখিও। সূর্যের তাপ বাঁচিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্তভাবে বসে রইলাম কাত হওয়া নৌকোর এক চিলতে ছাওয়ায়।
কয়েক ঘণ্টা বাদে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগল, জমির আঠালো চটচটে ভাবটা শুকিয়ে আসছে। হয়তো অল্প সময়ের মধ্যেই হাঁটাচলার মতন উপযুক্ত হয়ে উঠবে। সে রাতে ভালো করে ঘুমোলাম না। সমুদ্রতীরে পৌঁছতে পারলে হয়তো উদ্ধারের একটা সম্ভাবনা থাকে। তাই পরের দিন ঝোলায় জল আর খাবার বেঁধে নিয়ে নিখোঁজ সমুদ্রের সন্ধানে বেরনোর জন্যে তৈরি হয়ে রইলাম।
তিনদিনের দিন সকালে দেখলাম মাটি শুকিয়ে বেশ শক্ত হয়ে গেছে, অনায়াসে হাঁটা যায়। মাছের দুর্গন্ধে যদিও পাগল হওয়ার জোগাড়, তাকে বিশেষ আমল দিলাম না, আমার মাথায় তখন অন্য দুশ্চিন্তা। বুক বেঁধে পা চালালাম অজানার উদ্দেশে।
উঁচুনিচু ঊষর প্রান্তের পশ্চিম দিকে একটা উঁচু টিলা চোখে পড়েছিল, সারাদিন হাঁটলাম সেইটে লক্ষ করে। তবে পৌঁছতে পারলাম না। রাতটুকু জিরিয়ে নিয়ে ফের হাঁটা শুরু করলাম পরের দিন। তবে সেদিনও মনে হল না পাহাড়টার ধারে কাছে পৌঁছতে পেরেছি।
অবশেষে চতুর্থ দিন সন্ধেবেলা এসে পৌঁছলাম পাহাড়ের গোড়ায়। দেখলাম যা ভেবেছিলাম পাহাড়টার উচ্চতা তার চাইতে অনেক বেশি। সামনের একটা উপত্যকার জন্যে সেটাকে প্রান্তরের বুকে বেশি স্পষ্ট দেখায়। ক্লান্তিতে পাহাড়ে চড়ার ক্ষমতা ছিল না, তাই সেদিনের মতো নিদ্রা গেলাম তার ছায়াতেই।
সে রাতে কেন ভয়ানক সব দুঃস্বপ্ন দেখলাম জানি না। তবে ঘেমে নেয়ে যখন ঘুম ছুটে গেল, তখন পুব প্রান্তরের অনেক ওপরে উঠে এসেছে কৃষ্ণপক্ষের বিশাল ক্ষয়টে চাঁদ। বুঝলাম আর ঘুম হবে না, যা সব স্বপ্ন দেখেছি, তারা ধাক্কা আর দ্বিতীয়বার সহ্য করতে পারব না।
