সেলারের মধ্যে পুরোনো বাক্সগুলো যেখানে ডাঁই করা আছে, তার নীচে ওকে মাটিচাপা দিই। আর সমস্ত তথ্যপ্রমাণ লোপাট করি। পরের দিন সকালে চাকরগুলো কিছু সন্দেহ নিশ্চয়ই করেছিল, কিন্তু ওদের নিজেদেরই এত কুকর্ম রয়েছে যে, ওরা যেচে পুলিশের কাছে যেতে সাহস করেনি। আমি ওদের তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, টাকা দিয়ে মুখ বন্ধও রাখতাম, কিন্তু জানতাম না– এই বিশেষ কাল্ট-এর লোকজন পরে কী করতে পারে। প্রথমে আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু পরে বুঝলাম, আমার মগজটাকে, আমার আত্মাকে যেন বাইরে থেকে থেকে কেউ টানছে, উপড়ে নিতে চাইছে আমার চেতনাকে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, এপ্রাহিম বা অ্যাসেনাথের মতো আত্মারা তাদের দেহ থেকে ততক্ষণ পুরোপুরি মুক্ত হয় না, যতক্ষণ তাদের দেহটার কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকে। অ্যাসেনাথ তাই আমাকে ছেড়ে যায়নি, আমাকে টেনে রাখত, চেষ্টা করত, কীভাবে আমার মধ্যে ঢুকে পড়বে, দখল করবে আমার শরীরটা। আর বদলে আমার আত্মাকে ঢুকিয়ে রেখে যাবে সেলারের তলায় বাক্সের নীচে পোঁতা ওই দেহাবশেষের মধ্যে।
আমি জানতাম, কী হতে চলেছে। আমি তাই মরিয়া হয়ে অভিনয় করলাম হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এত করেও কিছু হল না। একদিন নিজেকে আবিষ্কার করলাম নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে দমবন্ধ অবস্থায়। অ্যাসেনাথের পূতিগন্ধময় শবদেহের মধ্যে, সেলারের তলায়।
আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার শরীরে অ্যাসেনাথ পাকাপাকিভাবে ঢুকে পড়েছে। সে হাসপাতালেই রয়েছে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। হ্যালোইনের পরে যে গুপ্ত অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, তাতে তার শারীরিক উপস্থিতির আর দরকার নেই। সে যে ফিরে এসেছে, এটুকু বার্তাই সেই ভয়ানক তন্ত্রানুষ্ঠান সম্পন্ন করার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সেই ভয়ানক উপাসনার ফলশ্রুতি হিসাবে এই পৃথিবীর যে কী হবে, তা কল্পনাতেও আনা যায় না। আমি আর থাকতে পারলাম না। কোনওমতে সেলারের সেই বন্দিদশা থেকে হাঁচোড়পাঁচোড় করে বেরিয়ে এলাম।
আমি এখন আর কথা বলার অবস্থায় নেই। তাই টেলিফোন করে লাভ নেই, বন্ধু। তবে দেখলাম, আমি এখনও মোটামুটি লিখতে পারি। কোনওমতে জোড়াতালি দিয়ে তোমাকে আমার শেষ চিঠিটা লিখে পাঠাচ্ছি। ধরে নাও এটাই আমার অন্তিম ইচ্ছে এবং নির্দেশ। ওই শয়তানটাকে মেরে ফেলল। যদি এই পৃথিবীতে শান্তি চাও, তাকে বাঁচাতে চাও, তাহলে ওই মৃতদেহটাকে জ্বালিয়ে দেবে। কোনও অস্তিত্ব যেন না থাকে ওটার। আর যদি থাকে, তাহলে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যে, ওটা ফিরে এসে কী করতে পারে।
গুপ্তবিদ্যা, অকাল্ট, কালাজাদু থেকে দূরে থাকো ড্যান। বিদায়। তোমার মতো বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য। পারলে পুলিশকে বুঝিয়ে বোলো। তোমাকে এসবের মধ্যে টেনে আনার জন্য আমায় ক্ষমা করে দিয়ো ড্যান। আমার চিরশান্তির সময় ঘনিয়ে আসছে। এই নড়বড়ে কাঠামো আর আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।
ওটাকে নিশ্চিহ্ন করো ড্যান। চিরতরে।
তোমারই –এড।
চিঠিটার শেষাংশ পড়েছিলাম জ্ঞান ফেরার পর। প্রথম কিছুটা পড়ার পরই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি আমি। যখন জেগে উঠি, তখন দরজার কাছে পড়ে-থাকা জিনিসটা দেখে আর গন্ধ শুঁকে আবার অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হয়। অবশ্য ততক্ষণে এই চিঠির বার্তাবাহকের দেহে আর প্রাণ ছিল না।
আমার খানসামাটি বেশ শক্তপোক্ত বলতে হবে। সকালে উঠে আমার ঘরের চৌকাঠে জিনিসটা দেখেই সে তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ফোন করে। পুলিশ আসার আগেই আমি ওপরের ঘরে বিছানায় স্থানান্তরিত হয়েছিলাম।
এডওয়ার্ডের নোংরা কোট আর প্যান্টের মধ্যে থেকে যা বেরোল, সে বীভৎসতা হাড় হিম করে দেওয়ার মতো। চটচটে হয়ে-যাওয়া গলিত মাংসপিণ্ডের মধ্যে কয়েকটা হাড়ের টুকরোও ছিল ছিল ভাঙা খুলির টুকরোও। দাঁতের গঠন দেখে পরে জানা গিয়েছিল– খুলিটা অ্যাসেনাথের।
[প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে উইয়ার্ড টেলস পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশ পায়। ভাষান্তর : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়]
ডেগন
ডেগন (DAGON)
[ডেগন শুধু লাভক্র্যাফটের প্রথম দিকের রচনাই নয়, এই গল্পেই প্রথম কথুলু মিথোসের বীজ বপন করা হয়। ডেগনের কথা এর পরেও বহু গল্পে লাভক্র্যাফট এনেছেন। স্বীকারক্তি, সুইসাইড নোট, প্যারানয়া, প্রাচীন অপার্থিব দেবতা, অজানার আতঙ্ক লাভক্র্যাফটের নিজস্ব ঘরানার ছাপ এই গল্পের পাতায় পাতায়।]
চূড়ান্ত মানসিক চাপের মধ্যে এই কথাগুলো লিখছি। কারণ আজ রাতের পর এ জীবন আমি আর রাখব না। টিকে থাকার জন্যে যে ওষুধ আমাকে কিছুটা স্বস্তি দিত, ফুরিয়ে এসেছে তার ভাঁড়ার। নিঃশেষ হয়ে গেছে আমার শেষ কপর্দকটুকুও এই যন্ত্রণা সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিচের নোংরা রাস্তায় চিলেকোঠার জানলা থেকে ঝাঁপ দেব একটু বাদেই।
ভাববেন না যে আমি দুর্বল হৃদয় কিংবা পাগল। সে আমার যতই মরফিনের নেশা থাকুক না কেন। এই যে তাড়াহুড়ো করে কয়েকটা লাইন লিখছি, এগুলো পড়ে হয়তো সমস্তটা বুঝবেন না। কিন্তু কিছুটা অন্তত আন্দাজ করতে পারবেন ঠিক কী কারণে স্মৃতিলোপ বা মৃত্যু, এ দুটোর একটা পথ বেছে নেওয়া আমার জন্যে কেন এত জরুরি ছিল।
