আমি কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে পারতাম? ওই বিপুল পৈশাচিক শক্তি মানবদেহের সীমানা অতিক্রম করেছে বহু আগেই। পরের দিন দুপুরবেলা, নিজের শরীর আর মনকে সুস্থির করে, মানসিক হাসপাতালে নিজের পিস্তলটা নিয়ে গিয়েছিলাম। এডওয়ার্ডের খুলি তাক করে আমার পিস্তলটা খালি করে দিয়েও আমি নিশ্চিন্ত হতে পারিনি যে, এই অভিশাপ পৃথিবীর বুক থেকে চিরনিশ্চিহ্ন হল কি না– আমি চাইছিলাম ওর দেহটা দাহ করতে, সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে ওর প্রতিটা অংশ। কিন্তু হা হতোস্মি!! দেহটাকে নাকি এখনই কবর না দিয়ে সুরতহালের জন্য কাটাছেঁড়া করা হবে। আমি বারবার বলছি, ওকে পোড়াও, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দাও। না হলে কারও মুক্তি নেই।
ওই জীবন্ত দেহটাকে যখন আমি গুলি করি, আমি নিশ্চিত ছিলাম সে এডওয়ার্ড নয়। তবে আমি জানি, ওরা আমার জন্য ফিরে আসবে আসবেই। তবে আমার ইচ্ছাশক্তি এত দুর্বল নয়, আমি প্রাণপণে বাধা দেব। আমার পুরুষকার ওই আতঙ্কের সামনে মাথা নত করবে না। কোনও অবস্থাতেই না। একটা প্রাণ, তার জন্য তিন তিনটে দেহ বিসর্জন দিতে হল। এপ্রাহিম, অ্যাসেনাথ এবং এডওয়ার্ড। এবার কে?? আমি নয়– না না, আমার শরীর আমি ওই দানবকে দেব না, আমি জুঝব– সর্বশক্তি দিয়ে।
কী যে বলছি, নিজেও জানি না। আবোল-তাবোল কথা ছেড়ে আমি বরঞ্চ আসল ঘটনাতে ফিরি। সেই ভয়াল, সৃষ্টিছাড়া, ক্লেদাক্ত, পূতিগন্ধময় নরকের জীবটার কথা আর বলতে চাই না। পুলিশ কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। রাত দুটো নাগাদ ওই বস্তুটাকে তিন তিনজন পথচারী দেখতে পায়– হাই স্ট্রিটের ওপর চলাফেরা করতে। তার পদচিহ্নও পুলিশ খুঁজে পেয়েছে।
রাত দুটোর কিছু পরে, আমার বাড়ির দরজায় ঘণ্টীটা বেজে ওঠে। বোঝাই যাচ্ছিল আগন্তুক যথেষ্ট উত্তেজিত। সে মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছিল এডওয়ার্ডের তিন-দুই সংকেত নকল করার।
গভীর ঘুমের থেকে আচমকা জেগে উঠে আমার মাথাটা ঘুলিয়ে গিয়েছিল। ডার্বি এসেছে? আমার বাড়িতে? জানি, ওর বহু স্মৃতি হারিয়ে গেছে, তাই হয়তো কোডটা মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সে৷ হয়তো নতুন এডওয়ার্ড তার পুরাতন চেতনার স্মৃতি খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছে সংকেতটাকে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সতর্ক হলাম, এত রাতে কী ব্যাপার? ওকে কি আগেভাগেই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিল? নাকি ও পালিয়ে এসেছে। সেখান থেকে? হাউসকোটটা জড়িয়ে আমি নীচে নেমে এলাম। নামতে নামতে চিন্তা করলাম, আমি হয়তো সব কিছুই একটু বেশি বেশিই ভাবছি। হয়তো এডওয়ার্ড সুস্থ হয়ে গেছে– পূর্বের জীবনে ফিরতে চেয়ে সে নিজে কিছুটা উত্তেজিত, উদ্গ্রীব। যা-ই হোক-না কেন, এডওয়ার্ড আমার বৈমাত্রেয় ভাই, ওকে আমি সাহায্য করবই।
ওক কাঠের ভারী দরজাটা খুলতেই একটা বিকট বিশ্রী গন্ধ এবং হাওয়ার একটা তীব্র ঝটকা আমাকে পেড়ে ফেলল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ছিটকে পড়ে গড়িয়ে গেলাম খানিকটা। কিছুক্ষণ সেই পূতিগন্ধময় ভারী বাতাসে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল আমার। কয়েকবার বমি করার জন্য ওয়াক তুললাম। তারপর একটু সুস্থির হয়ে তাকিয়ে দেখি, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা কালচে ছোটখাটো কুঁজো অবয়ব। আমি চমকে উঠলাম– এটা আবার কে? আমি তো একে এডওয়ার্ড ভেবেছিলাম।
ম্লান আলোয় ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, অবয়বটার শরীরে লেপটে রয়েছে এডওয়ার্ডেরই ওভারকোট। কিন্তু আগন্তুক এতটাই বেঁটে যে, কোটের নীচের অংশটা পুরোপুরি মাটি স্পর্শ করছে। হাতা গোটানো হলেও, সেখান থেকে ডার্বির হাতও দেখা যাচ্ছে না। আগন্তুকের মাথাটা কেমন যেন ঘাড়ের ওপর জবুথবু হয়ে বসানো। সারা মুখে এডওয়ার্ডের স্কার্ফটা জড়িয়ে রাখা, তার ফলে মুখটাও দৃশ্যমান নয়। এটা কী? বিপুল কৌতূহলে দ্বিধাগ্রস্তভাবে মূর্তিটার দিকে এক পা এগোতেই, সেটা একটা শব্দ করে উঠল, গ্লাব গ্লাব। শব্দটা করেই সে আমার দিকে একটা দলাপাকানো কাগজ ছুঁড়ে দিল। কাগজটা তুলে দেখি, সেটা ঘন হাতের লেখায় ভরতি একটা চিঠি। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই আমি চিঠিটা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম।
নিশ্চিতভাবেই এটা এডওয়ার্ডের হাতের লেখা। কিন্তু সে এত বড় একটা চিঠি লেখার কষ্ট করতেই বা গেল কেন, যখন একটা ফোন করলেই আমাদের মধ্যে কথা হতে পারত? আর লেখাটাই বা এত অপরিষ্কার, কাঁপা কাঁপা কেন? বাইরের হালকা আলোতে চিঠিটা ভালোভাবে পড়া গেল না তাই ঘরের মধ্যে ঢুকে আলোটা জ্বেলে দিলাম। বাইরের ওই মূর্তিটাও থপথপ করতে করতে আমার সদর দরজা পেরোল, কিন্তু আমার পড়ার ঘরের চৌকাঠ পেরোল না। বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকল। ভাগ্য ভালো, এত কিছুর মধ্যেও আমার স্ত্রী-র ঘুম ভাঙেনি, না হলে এই বস্তুটিকে দেখে তিনি যে কী করতেন তা ভাবতেও ভয় করছে।
চিঠিটা পড়তে পড়তে আমার হাঁটু কাঁপতে লাগল। বেশিক্ষণ নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম সামান্য পরেই। জ্ঞান ফিরতে দেখি, সেই অভিশপ্ত চিঠিটাও হাতেই ধরা রয়েছে। চিঠির বয়ান এরকম–
ড্যান, হাসপাতালে যাও আর ওটাকে খতম করো, নির্মূল করো ওটাকে। ওই জিনিসটা আর এডওয়ার্ড ডার্বি নয়। ওর মধ্যে এখন কে বসে আছে জানো? অ্যাসেনাথ। সাড়ে তিন মাস আগেই যে মৃত!! আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম, ড্যান। অ্যাসেনাথ বাড়ি ছেড়ে যায়নি, আমি ওকে হত্যা করেছিলাম। আজ না-হয় কাল আমি সেটা করতামই। আচমকাই আমি এই সিদ্ধান্তটা নিই। সে রাতে আমরা একা ছিলাম, আর আমার আত্মা আমার নিজের দেহেই ছিল। ওর অন্যমনস্কতার সুযোগে হাতের কাছে রাখা মোমবাতিদানটা দিয়ে ওর মাথা আমি খুঁড়িয়ে দিই। না হলে, হ্যালোইনের পরদিনই গুপ্তবিদ্যার মাধ্যমে আমার দেহকে কবজা করে নিত ও।
