আনন্দে উদবেল হয়ে আমি প্রায় ছুটে গেলাম হাসপাতালে। কিন্তু যখন নার্স আমাকে এডওয়ার্ডের কাছে নিয়ে গেল, বিস্ময়ে, আতঙ্কে আমি বারুদ্ধ হয়ে গেলাম। বিছানার ওপর বসে আমার দিকে যে রুগি হাত বাড়িয়ে দিল, তার এনার্জি এবং ব্যক্তিত্ব দেখে চমকে গেলাম। এডওয়ার্ডের পক্ষে এত চনমনে থাকা তো অসম্ভব। যে এডওয়ার্ডকে আমি চাক্ষুষ করেছি এই সেদিন পর্যন্ত, তার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার সঙ্গে এই মানুষটার তুলনাই চলে না। কেউ এত চটপট ঠিক হতে পারে নাকি? তা-ও ওরকম পর্যায়ের এক মানসিক আঘাত অতিক্রম করে?
আমি বুঝলাম, গণ্ডগোল রয়েছে, বিস্তর গণ্ডগোল। যখন রুগি আমার সঙ্গে কথা বলল, আমার দিকে তাকাল– আমি চকিতে বুঝে গেলাম এ সেই অ্যাসেনাথ বা এপ্রাহিম। একই চাহনি, দৃঢ়বদ্ধ ঠোঁট, মার্জিত কিন্তু বিদ্রুপাত্মক কথা বলার ভঙ্গি– আমাকে মুহূর্তে সেই রাতের গাড়ির স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। আমি বুঝলাম, এ সেই যে সে রাত্রে আমাকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছিল, আমার বাড়িতে এসে ভুলে ভরা সংকেতে ডোর বেল বাজিয়েছিল। কিছুক্ষণ পূর্বের আমার হর্ষোৎফুল্ল মন কী এক নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কে আর বিষাদে পূর্ণ হয়ে গেল।
ওকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে বাধা দেওয়ার আর কোনও কারণ বা যুক্তি দিতে পারলাম না। কিন্তু আমার বারংবার মনে হতে লাগল যে, ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না। এ যদি এডওয়ার্ড না নয়, তাহলে সে এখন কোথায়? এই মূর্তিমান আতঙ্ককে এখান থেকে নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে? একে কি দুনিয়ার বুকে চলে-ফিরে বেড়াতে দেওয়াটা উচিত হবে?
হাজার প্রশ্নের ভিড়ে আমার মাথাটা সারাদিন ব্যস্ত রইল। এডওয়ার্ডের দেহের মধ্যে ঠিক কে রয়েছে? কী রয়েছে? ওই বড় বড় চোখের তারায় যে জ্যোতি দেখেছি, সেটা কার? কে ওই দেহের মধ্যে দিয়ে আমাদের দুনিয়াকে প্রত্যক্ষ করছে, অনুভব করছে? রহস্যের খাসমহলে যেন আমি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে গেলাম। বাকি কাজকর্ম শিকেয় উঠল। পরের দিন সকালে হাসপাতাল থেকে ফোন এল, যে এডওয়ার্ড একই রকম রয়েছে, অবনতির কোনও লক্ষণ নেই। পরের দিন সকালেই ওকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু সে দিনই রাত্রের দিকে আমার চরম স্নায়ুবৈকল্য হবার উপক্রম হল।
সেই ঘটনাই আমি এবার আপনাদের বলব।
.
০৭.
সেই রাতের কথা মনে করলে এখনও নিঃসীম আতঙ্কে শিউরে উঠি–ভয়ের এই আদিম অনুভূতি কীভাবে যে আমার মনকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে, তা আমার ধারণার বাইরে। কিছুতেই সে অবস্থা থেকে আমি আজও বেরিয়ে আসতে পারিনি।
মাঝরাতের একটা টেলিফোন কল দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। বাড়িতে আমি একাই জেগে ছিলাম। ফোনের আওয়াজ শুনে লাইব্রেরিতে গিয়ে ফোনটা ধরলাম। নিঃশব্দ। কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করে রিসিভারটা সবে ক্রাডেলে রাখতে যাচ্ছি, আচমকা একটা শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। যেন কেউ ভীষণ কষ্ট করে কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু স্বর ফুটছে না। রিসিভারটা কানে লাগিয়ে গভীর মনোযোগে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম সেই দূরাগত শব্দের অর্থ। জলে ডোবা কোনও ব্যক্তি যেমন কথা বলতে গেলে গ্লাব, গ্লাব শব্দ করে, ঠিক সেরকম কিছু একটা যেন শুনতে পেলাম। মনে হল কেউ যেন শব্দ বা বাক্য ভেঙে নির্দিষ্ট ছন্দে কিছু একটা বলতে চাইছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে, কে? কে বলছেন?
উত্তর এল, গ্লাব গ্লাব গ্লাব।
আওয়াজটা যান্ত্রিক। হতে পারে, ও প্রান্তে যে রয়েছে, তার মাইক্রোফোনটা খারাপ আছে। তাই কথা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না। আমি গলাটা খানিক চড়িয়েই বললাম, শুনুন, আপনার কথা কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। আপনি বরঞ্চ ফোনটা রেখে দিন। বলার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ কলটা কেটে দিল।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিল, কলটা এসেছিল ওল্ড ক্রাউনিংফিল্ডের থেকে। সে বাড়ির পরিচারিকার রাত্রে থাকার কথাই নয়। পুলিশ যখন বাড়িটা তল্লাশি নিতে গিয়েছিল, তখন ভূগর্ভস্থ ঘরে গিয়ে দেখতে পায়, সব কিছু কীভাবে ওলটপালট হয়ে আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চতুর্দিকে। আলমারি তছনছ করা, টেলিফোনের ওপর অদ্ভুত সব হাতের ছাপ। সব কিছুতেই কেমন যেন একটা বিকট পূতিগন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে। পুলিশ অবশ্য নিজের মতো একটা থিয়োরি খাড়া করে ফেলে বাড়ির চাকরবাকরগুলোকে ধরার জন্য হুলিয়া জারি করে তৎক্ষণাৎ।
ধরা পড়ার পর চাকরগুলো স্বীকার করেছিল, পূর্বেকার কোনও কৃতকর্মের পৈশাচিক প্রতিশোধ নিতে এসব করা হয়েছে। কে বা কারা করেছে, সে বিষয়ে তারা অবগত নয়। তবে সেই প্রতিশোধের আগুনে আমিও জ্বলেছি, কারণ এডওয়ার্ডের বন্ধু, পরামর্শদাতা বলতে কেবল আমিই ছিলাম।
ওই মূর্খ পুলিশের দল কী জানে? ওরা জানতেও পারবে না, কী হয়েছিল এডওয়ার্ডের সঙ্গে। কিছু আদিম রহস্য সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে পৃথিবীর বুকে তাদের অধিকার কায়েম করে এসেছে। সেই রহস্যের অন্তে যে ভয়ানক সত্য লুকিয়ে রয়েছে, তাকে অনুধাবনের ক্ষমতা ছিল কেবল মুষ্টিমেয় কিছু লোকের। তারা এই রহস্যের চাবিকাঠিকে লুকিয়ে রেখেছিল মানুষের অধীত জ্ঞানের সীমানা থেকে অনেক দূরে। কিন্তু কেউ কেউ তার সন্ধান পায় খুঁড়ে তুলে আনে সেই গুপ্তজ্ঞান মুক্তি দিতে চায় সেই মূর্তিমান আতঙ্কদের। বিপন্ন হয়ে পড়ে পৃথিবী, বিপন্ন হয়ে পড়ে তার মনুষ্যজগৎ। এপ্রাহিম, অ্যাসেনাথ এরা ওই পিশাচের এক-একটা রূপ। এডওয়ার্ডকে তারা নরকে টেনে নিয়ে গেছে এবার, এবার আমার পালা।
