এডওয়ার্ডের বাপের আমলের যে খানসামা, তার সঙ্গে দেখা করে খবর জানতে চাইলাম। সে জানাল, এডওয়ার্ডের অবস্থার বিশেষ উন্নতি নেই। একা একা লাইব্রেরিতে সারাক্ষণ ছটফট করে বেড়ায় সে। আমি ভাবলাম, অ্যাসেনাথ হয়তো তাকে ভুলভাল চিঠিপত্র লিখছে, যার ফলে সে মানসিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ছে।
কিন্তু খানসামা জানাল, এরকম কোনও চিঠি এডওয়ার্ডের নামে আসেনি– অন্তত এ বাড়িতে ফিরে আসার পর থেকে তো নয়ই।
.
০৬.
ক্রিসমাসের সময়ের একদিনের কথা। এডওয়ার্ড তখন আমার বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই আসে। সে দিনও সন্ধেটা আমার ঘরে বসে আগামী গরমের ছুটির ব্যাপারেই আলোচনা হচ্ছিল। আচমকা এডওয়ার্ড লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে বিষম আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত। যেন সে জেগে জেগেই ভয়ানক কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে।
আমার মগজ… ড্যান– কেউ যেন টানছে, পেছন থেকে টানছে। তাকে আঁচড়াচ্ছে, খাবলাচ্ছে। ওই ডাইনিটা, ওই ওই শয়তান এপ্রাহিমের কাজ এটা। কামগ– কামগ!! মহান সোগথ, সোগথের গহ্বর- ইয়াআ– সাব নিগুরাথ! সহস্র তারুণ্যের নিয়ন্ত্রক অজ!! আগুন আগুন। লেলিহান আগুনের শিখা– দেহহীন, মৃত্যুহীন। এই তো, এখানেই, এই ধরিত্রীতেই… ডার্বি চিৎকার করে উঠল।
আবার শুরু হল!! ডার্বিকে হাত ধরে বসালাম। জোর করে গিলিয়ে দিলাম খানিক হুইস্কি। চরম ঔদাসীন্যে খানিকক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে। তারপর আবার বিড়বিড় করতে লাগল নিজের মনে।
আবার আবার সে চেষ্টা করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে। আমার বোঝা উচিত ছিল আগেই– এ জিনিস বন্ধ হওয়ার নয়। কিছু দিয়েই নয়– না দূরত্ব, না জাদু, না মৃত্যু, কেউই আমার এই অভিশপ্ত ভবিতব্যকে আটকাতে পারবে না। এরা আসে, শুধুমাত্র রাতেই আসে হানা দেয় নিঃশব্দে। আমি, আমি পালাতে পারব না, ড্যান। উফফ কী ভয়ানক, কী বীভৎস। ড্যান, আমি বোঝাতে পারব না…
চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেল ডার্বি, আর কেমন যেন অসাড় হয়ে গেল। পতনোন্মুখ ডার্বিকে জাপটে ধরে আমার ঘরে শুইয়ে দিলাম। প্রথমে ভাবলাম, ডাক্তার ডাকব, কিন্তু পরে বুঝলাম, ডাক্তার এলেই ডার্বির মানসিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠে যেতে পারে। দেখাই যাক-না– নিজে থেকে ঠিক হয় কি না। এতশত ভেবে আমিও শুতে গেলাম।
সকাল উঠে দেখি, ডার্বি খুব ভোরেই বেরিয়ে গেছে নিঃশব্দে। ওর খানসামাকে ফোন করে জানতে পারলাম, নিজের বাড়িতে পৌঁছে একতলার লাইব্রেরিতে অস্থিরভাবে পায়চারি করে চলেছে ডার্বি।
এরপর থেকে ডার্বির মানসিক অবস্থা খুব ঠুনকো হয়ে পড়ল। আমি প্রায় প্রতিদিনই ওর বাড়ি যেতাম, আর ওর সঙ্গে নানা বিষয়ে আড্ডা মেরে ওকে প্রফুল্ল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। মাঝে মাঝে আমার কথার উত্তর দিলেও, মাঝে মাঝেই ডার্বি শূন্যদৃষ্টিতে একমনে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকত। কোনওভাবে অ্যাসেনাথের প্রসঙ্গ, ডার্বির বিবাহিত জীবন বা আনুষঙ্গিক কিছুর খোঁজ উঠে পড়লে, এডওয়ার্ডকে আর রোখা যেত না। উন্মাদের মতো চিৎকার করে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করে দিত সে।
ডার্বির ডাক্তার, ব্যাঙ্ক ম্যানেজার আর উকিল– তিনজনের সঙ্গেই আমি ওর অবস্থা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করলাম। ডাক্তারবাবু তাঁর দুই সহকর্মীকে নিয়ে ডার্বিকে দেখতেও এলেন। কিন্তু বিশেষ বিশেষ প্রসঙ্গ উত্থাপনে ডার্বির শারীরিক খিচুনি এবং মানসিক পরিবর্তন এত তীব্র হতে লাগল, যে আমার পক্ষে তা সহ্য করা মুশকিল হয়ে উঠল। শেষমেশ যা আশঙ্কা করেছিলাম, সেটাই ঘটল। অ্যাম্বুলেন্সে করে ডার্বিকে আর্কহ্যামের পাগলাগারদে নিয়ে গেলেন ডাক্তার।
সপ্তাহে দু-দিন আমি ওকে দেখতে যেতাম। যেহেতু ওর অভিভাবক বলতে কেউ ছিল না, আমিই ওর অভিভাবক নিযুক্ত হয়েছিলাম। গরাদের ওপার থেকে ডার্বির রক্ত-জল-করা বন্য চিৎকার, নিশ্বাসের শব্দের মতো ফিশফিশানি আর প্রলাপ শুনতে শুনতে চোখে জল এসে যেত আমার। একটা অসংলগ্ন বাক্য সে পুনরাবৃত্তি করে যেত, আমায় করতে হত… করতে হতই এটা আমায়। ওরা নিয়ে যাবে, আমায় ধরে নিয়ে যাবে- ওইখানে, ওই অন্ধকার নরকে। ও মা গো ড্যান, বাঁচাও আমাকে, বাঁচাও।
ডার্বির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, এই পর্যায়ে সেটা আন্দাজ করা অসম্ভব ছিল। কেবল আমিই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। ডার্বি ম্যানসনে আমি ওর পুরোনো চাকরবাকরদের আবার বহাল করলাম। ওল্ড ক্রাউনিংফিল্ডের বাড়িটার কী গতি করব, সেটা আমি ভেবে পেলাম না। নানা প্রাচীন ও গুহ্যবিদ্যার আকরগ্রন্থ ও জিনিসপত্র সংবলিত বাড়িটির ভাগ্য ডার্বির হাতেই ছেড়ে দেওয়া মনস্থ করে আমি একজন সাফাইকারীকে সপ্তাহে দু-দিন গিয়ে বাড়িটির বড় ঘরগুলি ঝাড়পোঁছ করতে আর ফার্নেসে আগুন জ্বেলে রাখতে নির্দেশ দিলাম।
জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল, যা যুগপৎ আশাপ্রদ এবং ভয়ংকর। পাগলাগারদ থেকে আমার কাছে আচমকা ফোন এল এই মর্মে যে, ডার্বির চেতনা এবং যুক্তিবোধ ফিরে এসেছে। বেশির ভাগ স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলেও, মানসিক সুস্থতাটুকু যে ফিরিয়ে আনা গেছে, সে ব্যাপারে ডাক্তাররা নিশ্চিত। যদিও তাকে এখন কয়েকদিন নজরদারিতে রাখা হবে, তবে ডার্বির অবস্থা বেশ আশাজনক। পুরোনো মতিচ্ছন্নতায় ফেরত যাবার সম্ভাবনা কম। হয়তো হপ্তাখানেক বাদেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
