চরম বিতৃষ্ণায় এডওয়ার্ডের মুখটা কুঁচকে ছোট হয়ে গেল। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আমার সামনে অনেকটা ঝুঁকে এসে প্রায় ফিশফিশিয়ে বলল, তুমি জানো না, ড্যান, আমি জানি। আমি জানি, অ্যাসেনাথের শরীর পাকাপাকিভাবে দখল নিয়েছে ওই শয়তান এপ্রাহিম। এপ্রাহিম বেঁচে থাকতে চেয়েছিল আজন্মকাল ওর বাসনা ছিল অমর হবার। তাই যখন ও বুঝল যে তার নশ্বর দেহের মরণ নিকটেই, তখন সে খুঁজে নিল এমন এক শরীর, যা আমারই মতো, অর্থাৎ তুখোড় মস্তিষ্কসম্পন্ন অথচ ইচ্ছাশক্তি দুর্বল। অ্যাসেনাথের শরীরে বাসা বেঁধে সে অ্যাসেনাথের আত্মাকে স্থানান্তরিত করল তার প্রাচীন জরাগ্রস্ত দেহে৷ বিষ খাইয়ে মারল তাকে অবশ্য তার আগে বন্দি বানিয়ে তাকে রেখে দিয়েছিল ইন্সমাউথের বাড়ির চিলেকোঠার ছাদের ঘরে। তাই সেখান থেকে দিনের পর দিন ভেসে আসত অসহায় এপ্রাহিমরূপী অ্যাসেনাথের বিলাপ ককিয়ে ককিয়ে।
ডার্বির গলা ধরে এল, ড্যান আমি দেখেছি এপ্রাহিমকে। অ্যাসেনাথের ওই বড় বড় তীব্র চোখের দৃষ্টিতে দেখেছি, ওর হাতের লেখার মধ্যে দেখেছি। ওকে এমন সব কথাবার্তা আমি বলতে শুনেছি, যা কেবল বিটকেল বুড়োরাই বলতে পারে। আমি বলছি, ড্যান অ্যাসেনাথের আর অস্তিত্ব নেই। আছে ওই শয়তান, নরকের কীটটা।
এতটা একটানা বলার পর এডওয়ার্ড কিছুটা শান্ত হল। গলার স্বর আবার আগের অবস্থায় ফিরে এল তার। বুঝলাম, ছেলেটার ওপর বিশ্রীরকম ধকল গেছে। যদিও তাকে একবার মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা আমার মনে উঁকি দিয়েছিল, কিন্তু আমি সেরকম কিছু করতে উদ্যোগী হলাম না। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, ক-দিন নিঃসঙ্গ, নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম নিলেই ডার্বির এই অবস্থার উন্নতি ঘটবে। তবে এই ধাক্কায় হয়তো তার এইসব কালাজাদুচর্চা একটু হলেও কমতে পারে।
আমি তোমাকে পরে আরও কথা বলব, তবে আমার এখন একটু বিশ্রাম চাই, শ্রান্ত গলায় বলল ডার্বি, ড্যান, এগুলো অতি পুরাতন কিন্তু বীভৎস ধরনের গুপ্তবিদ্যা। এর সাধকও গুটিকয়েক– তারাও বিশ্বের কোনও কোনায় হয়তো ছড়িয়ে রয়েছে। এ পৃথিবী রহস্যময়ী, তার সব রহস্য কেউ জানে না, কারও জানতে পারার কথাও নয়। আর এসব গূঢ় রহস্যের কিয়দংশও পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। আমি নিজে এই ভয়ানক বিদ্যাকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। আমি যদি মিসকাটনিকের লাইব্রেরিয়ান হতাম, তাহলে আমি আজই ওই অভিশপ্ত নেক্রোনমিকন আর বাকি ওই ধরনের যত বই আছে, সব পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলতাম।
আমি বুঝলাম, এডওয়ার্ডের আজ আর বাড়ি ফেরা হবে না।
এডওয়ার্ড বিড়বিড় করতে লাগল, খুব শিগগিরি ওই বাড়ি ছেড়ে আমি আমার নিজের বাড়িতে গিয়ে উঠব। এই হতচ্ছাড়া চাকরগুলোকে তাড়িয়ে পুরোনো লোকজনকে আনব। ড্যান, তুমি আমাকে সাহায্য করবে না? বলো? যদি কেউ অ্যাসেনাথের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, তাকে তুমি সামলে নেবে তো? জানোই তো, এত লোকজন আমাদের ব্যাপারে জানে আমাদের বিচ্ছেদটা বেশি জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।
সে রাতটা আমার বাড়ির গেস্টরুমে কাটিয়ে, পরের দিন সকালে ডার্বিকে বেশ চাঙ্গা লাগল। ব্রেকফাস্টের টেবিলে দু-জনে আলোচনা করলাম, কীভাবে পুরোনো ডার্বি ম্যানসনকে সারিয়ে তুলে তাতে দ্রুত থাকার ব্যবস্থা করা যায়। বুঝলাম, ডার্বি আর তিলমাত্র সময় নষ্ট করতে রাজি নয়।
পরের দিন থেকে ডার্বির ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠে গেল। তবে মাঝে মাঝেই সে আমাদের বাড়িতে এসে আড্ডা দিয়ে যেত আমার সঙ্গে, সেই পুরোনো এডওয়ার্ডের মতোই। আমরা ওইসব গুহ্যবিদ্যার মন্ত্র নিয়ে আলোচনাই করতাম না– বিভিন্ন দরকারি কাজের ব্যাপারে কথা হত। ঠিক হল, সব মিটে গেলে সামনের গরমের ছুটিতে কয়েক দিনের জন্য বেড়িয়ে আসা যাবে আমার ডার্বি জুনিয়রকে সঙ্গে নিয়ে।
অ্যাসেনাথের ব্যাপারে আমরা আর উচ্চবাচ্য করিনি। কিন্তু হলে কী হবে, গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সেটাও নয় সহ্য হত, কিন্তু ডার্বির একটা ব্যাপার আমার পছন্দ হল না। ক-দিন আগে মিসকাটনিকের এক সমাবর্তনে গিয়েছিলাম। সেখানে আর্কহ্যামের ব্যাঙ্ক ম্যানেজার একটু বেশিই পান করে আমার সামনে একটি অদ্ভুত তথ্য উগরে দেন।
মোজেস, অ্যাবিগেল সার্জেন্ট আর ইউনিস ব্যাবসনের নামে নাকি প্রতি মাসেই একটা মোটা অঙ্কের চেক ডার্বি পাঠিয়ে থাকে ইন্সমাউথের ঠিকানায়। ওল্ড ক্রাউনিংফিল্ডের অভিশপ্ত বাড়ির বিতাড়িত চাকরাকরদের প্রতি ডার্বির কীসের টান, সেটা বুঝতে পারলাম না। ডার্বি আমাকে ব্যাপারটা জানায়ওনি। আরও একটা খটকা রয়ে গেল। ওল্ড ক্রাউনিংশিল্ডের অনেক রহস্যের সঙ্গে যুক্ত হল আরও একটি রহস্য।
আমি চাইছিলাম, গরমের ছুটিটা দ্রুত আসুক, যাতে এডওয়ার্ডকে এই শহরের বিষাক্ত পরিবেশ থেকে কয়েক দিনের জন্য বের করে নিতে পারি। কিন্তু যতটা সহজে সে আরোগ্য পাবে ভেবেছিলাম, ব্যাপারটা ততটা সহজ হচ্ছিল না। এডওয়ার্ডের পৈতৃক ম্যানসনের মেরামতি ডিসেম্বরের মধ্যে হয়ে গেলেও, সে ঠিক সুস্থির হতে পারল না। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, ওল্ড ক্রাউনিংফিডল্ডের বাড়িটাকে গুঁড়িয়ে দেবার দিনক্ষণ পেছোতে লাগল সে। যেন কী একটা অস্থিরতা গ্রাস করেছে এডওয়ার্ডকে। তার ছটফটানি দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। যদিও সে ওই বাড়িটায় থাকত না বা ওখানে আর থাকার তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না, তবুও বাড়িটা যেন কী এক অমোঘ আকর্ষণে এডওয়ার্ডকে রোজ টানতে থাকল।
