এর মধ্যে একটা আশ্চর্য খবর শুনলাম, ওল্ড ক্রাউনিংশিল্ডের ডার্বিদের বাড়িতে নাকি রাতের বেলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। মেয়েদের গলার কান্না লোকজন বলল নাকি অ্যাসেনাথের গলা। কান্নার শব্দটা নাকি হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায়– আবার নাকি আচমকা থেমেও যায়। যেন কেউ ক্রন্দনরতার মুখ চেপে তার কান্নাটা জোর করে থামিয়ে দেয়। অনেকে নাকি পুলিশে খবর দেওয়ার তোড়জোড়ও করছিল, কিন্তু তার আগেই অ্যাসেনাথ হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এমনভাবে বাজার-দোকান করতে শুরু করল যেন কিছুই হয়নি। লোকজনের সঙ্গেও কথাবার্তা বলতে লাগল স্বাভাবিকভাবে। শোনা গেল, বস্টন থেকে তার বাড়িতে নাকি কোনও এক আত্মীয় এসেছে, তার ফিটের ব্যামো আছে। মাঝেমধ্যেই সেই মহিলার খিচুনি হয় আর তাই কান্নাকাটির শব্দ শোনা যেত।
অ্যাসেনাথের কথার ওপর কথা চলে না। সেই আত্মীয়কে অবশ্য কেউ চোখে দেখল না –তবে কে নাকি বলল, ক্রাউনিংশিল্ডের বাড়ি থেকে ভেসে-আসা বামাকন্ঠী কান্নার আওয়াজের পাশাপাশি মাঝে মাঝে নাকি পুরুষের গলার কান্নাও শোনা যেত।
রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল।
.
অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ একদিন আমার বাড়ির দরজায় ঘণ্টী শোনা গেল সেই পরিচিত তিন-দুই আওয়াজ। আমি লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে দিলাম। চৌকাঠের ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেই পুরোনো এডওয়ার্ড সেই অভিশপ্ত রাত্রির পর যাকে আমি আর দেখতে পাইনি। এডওয়ার্ডের মুখে খেলা করছে যুগপৎ ভয় ও সাফল্যের আনন্দ৷ ওকে তাড়াতাড়ি ঘরে ডেকে এনে বসালাম।
একটু হুইস্কি মিলবে ড্যান? ঘরে ঢুকে প্রথমেই বলল এডওয়ার্ড। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে তার গ্লাস পূর্ণ করে দিলাম আর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যখন সে নিজের থেকে কথা শুরু করবে।
অ্যাসেনাথ বিদেয় হয়েছে ড্যান। কাল রাত্রে চাকরবাকরগুলো বেরিয়ে যাওয়ার পর হেব্বি ঝগড়া হয়েছে আমাদের মধ্যে। আমি ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছি যেন আমাকে আর এইভাবে উত্ত্যক্ত না করে। ওর সঙ্গে থাকা আর সম্ভব নয়। আমারও কিছু ক্ষমতা আছে, ড্যান- তোমাকে এত কথা যদিও আগে বলিনি আমি। ওই ক্ষমতা আমি অনেক চর্চায় আয়ত্ত করেছিলাম। সেই দিয়ে ওর জাদুকে কেটে আমি ওকে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করলাম। আমার প্রতিরোধে রাগে ওর মুখ-চোখ লাল হয়ে গেল। কী বিড়বিড় করতে করতে নিজেই সব গুছিয়ে নিল। তারপর তড়বড় করে বেরিয়ে গেল সেই ভরসন্ধেবেলাতেই ট্রেন ধরে বস্টন থেকে নিউ ইয়র্কের দিকে রওনা দেবে বলে। লোকে অবশ্য ঠারেঠোরে অনেক কিছু রটাবে, কিন্তু আমি নাচার। তোমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, বলে দেবে, একটা রিসার্চের কাজে অ্যাসেনাথ বাইরে গেছে।
আমার বিশ্বাস, নিউ ইয়র্কে গিয়ে কোনও এক গোপন তান্ত্রিক দলের সঙ্গে যোগ দেবে সে। তারপর আরও পশ্চিমের দিকে চলে যাবে। হয়তো সেখান থেকেই ডিভোর্স দেবে আমায়। যাক গে, আপদ বিদেয়! উফ, ড্যান– জানো না কী দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে আমার এ ক-দিন। আমার দেহ চুরি করে, আমাকেই নিজের দেহে বন্দি বানিয়ে রাখত ওই মাগিটা। আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম– সঠিক সময়ের অপেক্ষায়। ওকে বুঝতেই দিইনি আমার মনে কী চলছে– কতটা ঘৃণা জমে রয়েছে সেখানে। ও আমাকে খুব অসহায় ভেবে নিয়েছিল কিন্তু আমারও দু-চারটে বিদ্যা যে জানা আছে, সেটা বুঝতে পারেনি ডাইনিটা।
সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে দেখে নিয়ে ডার্বি আবার শুরু করল, ওর পেয়ারের চাকরগুলো সকালে কাজে এসে ডাইনিটাকে না দেখে আমাকে রীতিমতো জেরা করতে শুরু করে দিয়েছিল। টাকা মিটিয়ে দিয়ে ব্যাটাদের বিদেয় করলাম। অ্যাসেনাথের বাপের বাড়ির উন্মাদের দল– সব কটাকে তাড়িয়েছি। হতচ্ছাড়াগুলো কেমন হাসতে হাসতে চলে গেল। –যেন খুব একটা কৌতুকের ব্যাপার!!! আমি দ্রুত বাবার পুরোনো চাকরবাকরদের ডেকে নিয়ে একত্র করলাম। এবার ওই হানাবাড়ি ছেড়ে নিজের পৈতৃক বাড়িতেই ফিরে যাব।
তুমি আমাকে হয়তো উন্মাদ ভাবছ, ড্যান। তবে বিশ্বাস করো, আমি যা বলছি, তার বর্ণে বর্ণে সত্যি। আর্কহ্যামের প্রাচীন ইতিহাস যদি তুমি পড়তে, এখানে ঘটে-যাওয়া রহস্যময় ঘটনা সম্পর্কে যদি তোমার ধারণা থাকত, তাহলে হয়তো তোমার বিশ্বাসে জোর আসত৷ যা-ই হোক, সে দিন রাতের ঘটনা হয়তো তুমি বিস্মৃত হওনি৷ অ্যাসেনাথের ভয়ানক কার্যকলাপের ব্যাপারে বলার সময়েই ওর আত্মা এসে আমার চেতনাকে দখল করে নেয়, আর আমি নিজেকে আবিষ্কার করি আমার বাড়ির লাইব্রেরিতে। ওই জাদুকরির দেহের মধ্যে বন্দি অবস্থায়। আমাকে পাহারা দিচ্ছিল অ্যাসেনাথের ওইসব চাকরবাকরের দল, যাতে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনও কাণ্ড না ঘটাতে পারি।
ওটা কি মানুষের শরীর, ড্যান? উফ– কী ক্লেদাক্ত ঘিনঘিনে সেই শরীর। আর ড্যান, সে রাতে তুমি নিশ্চয়ই ওই ডাইনিটার সঙ্গে পাশাপাশি গাড়িতে চড়ে এসেছ। নিশ্চই পার্থক্যটা বুঝতে পেরেছ…
নিজের অজান্তেই কেমন যেন কেঁপে উঠলাম সেই রাতের কথাটা মনে করে। ব্যাপারটা মনের ভুল ভেবেই এত দিন নিজেকে প্রবোধ দিয়ে এসেছি আমি কিন্তু এ কী বলছে ডার্বি! আমার বিস্ময় আর আতঙ্কের বুঝি তখনও কিছু বাকি ছিল। এডওয়ার্ড বলে চলল স্থলিত স্বরে, নিজেকে বাঁচাতেই হত, ড্যান। আমি শুনে ফেলেছিলাম যে, আমার শরীরটা পাকাপাকিভাবে দখল করে নেওয়ার ফন্দি কষেছে অ্যাসেনাথ। হালউইনের পরের দিনই, চেসুনকুক১৮৭ থেকে খানিক দূরে তান্ত্রিকদের এক গোপন সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। আর সেই সমাবেশেই.. আমার শরীর চিরজীবনের জন্য হয়ে যেত অ্যাসেনাথের, আর তার শরীরে জোর করে প্রবেশ করানো হত আমাকে। তারপর কিছু একটা করে, অ্যাসেনাথরূপী এডওয়ার্ডকে হয়তো বিষ খাইয়েই যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিত ওই ডাইনিটা –বা সেই শয়তানটা।
