শহর ছাড়িয়ে আবার অন্ধকার রাস্তায় না-পড়া পর্যন্ত মূর্তিটা কোনও কথা বলল না। তারপর যখন সে কথা বলা শুরু করল, তখন সেই গলা শুনেও আমার পিলে চমকে গেল। সম্পূর্ণ আলাদা কণ্ঠস্বর গভীর, দৃঢ় অথচ প্রত্যয়ী। একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্বপূর্ণ আভিজাত্য আছে সেই কণ্ঠস্বরে, যা কমবয়সি এডওয়ার্ডের কথাবার্তায় কখনও ধরা পড়েনি। উচ্চারণভঙ্গিমা, বলার ধরন পুরোপুরি আলাদা হলেও, কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল আমার। কিছু যেন মিলছে না, কিন্তু সেটা যে কী, তা তখন মাথায় এল না।
কণ্ঠস্বর বলে চলল, কিছুক্ষণ আগের আমার নাৰ্ভ ব্রেকডাউনটা তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাবে আপটন। তুমি তো জানো আমার স্নায়ু দুর্বল– আর এ ব্যাপারটা প্রায়ই হয়ে থাকে, তাই অস্বাভাবিক কিছু না। তবে আমাকে বাড়ি পৌঁছোতে সাহায্য করার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
আর-একটা কথা, আমি আমার স্ত্রী অথবা অন্য ব্যাপারে যা কিছু উলটোপালটা বলেছি, ভুলে যাও। জানোই তো আমার পড়াশোনার বিষয়টা একটু অন্যরকম। এসব নিয়ে সারাক্ষণ নাড়াঘাঁটা করলে মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাই আপাতত আমি ক-দিন বিশ্রাম নিতে মনস্থ করেছি। হয়তো মাসখানেক আমাকে তুমি দেখতে পাবে না। তাই বলে আবার অ্যাসেনাথকে দোষারোপ করতে যেয়ো না।
আপটন, আমার এবারের যাত্রার জায়গাটা একটু অদ্ভুত ঠিকই, তবে খুব অস্বাভাবিক কিছু না। উত্তরের বনে বেশ কিছু পুরোনো রেড ইন্ডিয়ান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ লুকিয়ে রয়েছে আগাছার আড়ালে। এসবের মধ্যেই তো জমে থাকে ছায়াঘেরা কিংবদন্তি, নানারকম লোককথা। অ্যাসেনাথ আর আমি এটার অনেকদিন ধরেই খোঁজ করছিলাম। কিন্তু জিনিসটা নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে আমি এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম, যে চারপাশের পৃথিবীর অস্তিত্ব প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। যা-ই হোক, আমার গাড়িটাকে ওখান থেকে আনার জন্য আবার কাউকে পাঠাতে হবে মুশকিল আর কী।
আমার সহযাত্রীর বক্তব্যের মাঝে আমি আদৌ কিছু বলতে পেরেছিলাম কি না, এখন মনে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, চাক্ষুষ করা ঘটনার সম্পূর্ণ উলটো ব্যাখ্যা শুনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম ভালোমতন। ওই চেহারা আর ভিন্ন কণ্ঠস্বরের আওয়াজে আমি আতঙ্কে এতটাই সিঁটিয়ে ছিলাম যে, বারবার মনে হচ্ছিল, এটাই হয়তো আমার শেষযাত্রা! ভয়ে দিশেহারা হয়ে চিন্তাভাবনার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। ডার্বি গাড়িটা ঝড়ের বেগে পোর্টসমাউথ পার করে নিয়ে চলল– আর আমি ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে এলিয়ে বসে রইলাম ওর পাশের সিটে।
গাড়িটা যখন আকামের প্রবেশমুখে চলে এল, আমি সভয়ে দেখলাম, সামনে রয়েছে সেই অভিশপ্ত মোড়– যার বাঁয়ে ঘুরলে একটা অন্ধকার রাস্তা সোজা চলে গেছে রহস্যময় ইন্সমাউথের দিকে। আমার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল আমার সহযাত্রী যদি গাড়িটা ওই রাস্তায় নিয়ে তোলে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমি কাল আর দিনের আলো দেখতে পাব না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলতে হবে, ইন্সমাউথের রাস্তা না ধরে, ডার্বি তীব্রবেগে গাড়িটা শহরের মধ্যে দিয়েই ছুটিয়ে নিয়ে চলল আমাদের গন্তব্যের দিকে। মধ্যযামের সামান্য আগে ওল্ড ক্রাউনিংশিল্ডের সামনে গাড়ি যখন থামল, তখনও ঘরে আলো জ্বলছে। ডার্বি প্রচুর কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদে আমাকে ভরিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে বাড়ির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমিও স্টিয়ারিং চেপে গুটিগুটি ঘরে ফিরে এলাম। সত্যি, একটা দিন কাটল বটে! এই প্রথম ডার্বির আগাম অনুপস্থিতির খবরে আমার কোনও দুঃখ বা উদ্বেগ হল না, উলটে যেন বেশ খানিকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলাম।
.
০৫.
পরের দু-মাস এডওয়ার্ডের ব্যাপারে কেবল কানাঘুষো শুনেই কেটে গেল। লোকে নাকি ওকে বেশির ভাগ সময়েই এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াতে দেখেছে। চির-অলস এডওয়ার্ডের শরীরে এখন উদ্দীপনার অবধি নেই। অ্যাসেনাথ নাকি মোটামুটি পর্দানশিন হয়ে পড়েছে– খুব একটা বেরোতে দেখাই যায় না। এর মধ্যে এডওয়ার্ড একদিনই আমার বাড়ি এসেছিল, কয়েকটা বই ফেরত দিতে। অ্যাসেনাথের গাড়িটা দেখে বুঝলাম, সেটিকে মেইন-এর জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমার বাড়িতে এলেও, সে বেশিক্ষণ ছিল না। খুব লৌকিকতা করে দু-চারটে মধুর বচন শুনিয়ে দ্রুত বিদায় নিল। যাবার সময় কায়দা করে বিদায়সম্ভাষণটুকুও জানাতে ভুলল না। এসবই ঠিক ছিল, কিন্তু একটা খটকা কিছুতেই গেল না।
প্রতিবার আমার বাড়ির দরজায় এসে সে যেভাবে তিন-দুই কোডে ডোর বেল বাজাত, সেটা এবার বাজল না।
কেমন যেন একটা নিঃসীম আতঙ্কে আমার মন পূর্ণ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম, যাক, তাড়াতাড়ি বিদেয় হয়ে বাঁচাই গেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, ডার্বি সপ্তাহ দুয়েকের জন্য কোথায় একটা গেল। শুনলাম, আর্কহ্যামের বসবাসরত এক প্রাক্তন তান্ত্রিকের১৮৬ সঙ্গে নাকি তার বেশ গাঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তার ইতিহাস মোটেই সাধারণ নয়। শয়তানের বাড়ি একটি। ইংল্যান্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে সেই তান্ত্রিক এখন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে বাস করে। যা-ই হোক, সে দিনের মেইন থেকে ফেরার সময়কার ঘটনাটা তখনও আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। বারবার ভেবেও জিনিসটার ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে রীতিমতো অস্বস্তি হতে শুরু হল– আর তার সঙ্গে ছিল এক চোরা আতঙ্ক।
