এডওয়ার্ডের অসংলগ্ন কথাবার্তার মধ্যে জানতে পারছিলাম নিষিদ্ধ অকাল্ট চর্চার এক একজন গুপ্ত দেবদেবীর নাম। প্রাচীন লোককথা ও পুরাণের কাহিনি বিড়বিড় করে যাচ্ছিল এডওয়ার্ড হয়তো নিজেকে প্রস্তুত করছিল চূড়ান্ত কথাটা বলবার জন্য। সাহস জোগাচ্ছিল নিজেকেই।
ড্যান– তোমার মনে আছে এপ্রাহিমের সেই মুখটা? চোখে বন্য দৃষ্টি, মুখে এলোমেলো কাঁচা দাড়ি। একবার, একবার সে আমার দিকে তাকিয়েছিল–উফ, সেই দৃষ্টি ভোলবার নয়। অ্যাসেনাথ, এখন অ্যাসেনাথ আমার দিকে ওভাবে তাকায়। ঠিক সেই বন্য দৃষ্টি। আমি জানি, আমি জানতে পেরেছি। নেক্রোনমিকনের একটা পাতায় এই ভয়াবহ সংকেত লিপিবদ্ধ রয়েছে। তোমাকে পাতার নম্বরটা বলে দিলে তুমি নিজেই দেখে নিতে পারবে ড্যান। আর তখনই বুঝবে, কী অশুভ জিনিস আমাকে গ্রাস করেছে। দেহ থেকে দেহান্তর –অর্থাৎ, মৃত্যুহীন চেতনা। শরীরের মরণ হলেও যে তাতে কীভাবে নিজের চেতনাকে জিইয়ে রাখা যায়, সেই সূত্র ও জানত।
ড্যান, তুমি অ্যাসেনাথের হাতের লেখা দেখেছ? আমি জানি, আমি ওকে তাড়াহুড়োতে লিখতে দেখেছি। কীরকম অদ্ভুত একটা টান উলটোদিকে আঁচড় দিয়ে দিয়ে লেখা। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কিন্তু পরে যখন আমি এপ্রাহিমের পাণ্ডুলিপি দেখি, পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যায় আমার কাছে। সেই এক ছাঁচে লেখা, এক আঁচড়ের টান।
…অ্যাসেনাথ–আমার সন্দেহ হয়, সত্যিই এই নামে কারও অস্তিত্ব রয়েছে কি না?? আমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, ড্যান। যেমন ধরো, এপ্রাহিমের পাকস্থলীতে বিষ পাওয়া গিয়েছিল কেন? ইন্সমাউথে ওয়াইটদের ওই বাড়ির চিলেকোঠায় বিশেষভাবে তৈরি প্যাডেড রুমে তালা মারা ছিল কেন? কাকে সেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল? কেন এপ্রাহিম বারবার নিজেকে অভিসম্পাত দিত তার একটা ছেলে নেই বলে? ওই নরকের জীবটা অভিশপ্ত বাড়িতে বসে কী এমন ভয়ানক ক্রিয়াকলাপ করেছিল, যার ফলে হয়তো সে অ্যাসেনাথের শরীর সারাজীবনের জন্য দখল করে নিতে পেরেছে? আমি জানি, সে প্রাণপণ চেষ্টায় আছে আমার শরীরটা দখল নেওয়ার কারণ তার একমাত্র বাসনা ছিল উন্নতমস্তিষ্ক কিন্তু দুর্বলহৃদয় এক পুরুষের। বলতে পারো, কী কারণে অ্যাসেনাথ নামের ওই জীবটা হুবহু এপ্রাহিমের ভঙ্গিতে লেখে? কী কারণে..।
আচমকা এডওয়ার্ড চুপ করে গেল। যেন কেউ সুইচ টিপে কলের গান বন্ধ করে দিল– এমনিভাবে। আমাদের বাড়িতেও কয়েকদিন আগে এডওয়ার্ড যখন আসত, গল্প করত– তখনও মাঝে মাঝে এরকম আচমকা চুপ হয়ে গেছে সে। আমি ভাবতাম এ ওর আত্মবিশ্বাসের অভাব। মাঝেমধ্যে মনে হত যে, অ্যাসেনাথ হয়তো দূর থেকে সম্মোহন করে ওকে চুপ করিয়ে রাখছে। কিন্তু এবারে যা দেখলাম, তাতে বিস্ময়ে, ভয় বারুদ্ধ হয়ে গেল।
আমার পাশে বসে-থাকা এডওয়ার্ডের মুখটা হঠাৎ কুঁচকে বিকৃত হয়ে গেল। তার সারা শরীরে একটা প্রবল খিচুনি হতে লাগল, যেন শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, হাড়, পেশি সব নিজের জায়গা বদল করে আলাদাভাবে সজ্জিত হচ্ছে। আতঙ্কে আমার শরীর থেকে কুলকুল করে ঘাম ঝরতে লাগল। দেখতে পেলাম, আমি যাকে এডওয়ার্ড বলে চিনি বা চিনতাম, তার জায়গা নিয়েছে এক নতুন কেউ। এইমাত্র যেন কোনও ভিনগ্রহীর আক্রমণে আমার বন্ধুর শরীরটা বেদখল হয়ে কোনও অশুভ মহাজাগতিক শক্তির কুক্ষিগত হয়ে পড়ল। চেহারায়, মুখের আদলে আমূল পরিবর্তন এসে সম্পূর্ণ নতুন কেউ, আমার ঠিক পাশে এডওয়ার্ডের জায়গায় বসে রয়েছে। এই নতুন মূর্তির আকৃতি ও প্রকৃতি অদ্ভুত ভয়ংকর। ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করে আমার সারা অঙ্গ কাঁপতে লাগল– সেই সঙ্গে কাঁপতে লাগল আমার হাতে ধরে-থাকা গাড়ির স্টিয়ারিং। দুর্ঘটনা ঘটেই যেত, যদি না সেই নতুন অতিথি শক্ত হাতে আমার গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা চেপে ধরত।
আমরা জায়গা বদলাবদলি করে নিলাম। ভালোই করলাম, কারণ এই অবস্থায় গাড়ি চালানো আত্মহত্যার শামিল। সন্ধের অন্ধকার ততক্ষণে বেশ ঘনিয়ে এসেছে। পোর্টল্যান্ড পেরিয়ে আমরা অনেকটা দূর চলে এসেছি। রাস্তার আলো কমে যাওয়ায়, আগন্তুকের মুখটা ভালো করে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না আমার। কিন্তু তার চোখ দিয়ে যে জ্বলজ্বলে জ্যোতি বেরিয়ে আসছিল, সেটা ভুল হবার নয়। বুঝলাম এটা এডওয়ার্ডের সেই অদ্ভুত শক্তিশালী সত্তা, যার সঙ্গে আমার চেনাজানা এডওয়ার্ডের বিন্দুমাত্র মিল নেই। এডওয়ার্ড, যে গাড়ি চালাতেই জানে না, সে শক্ত হাতে আমার থেকে গাড়ির স্টিয়ারিং কেড়ে নেবে– এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। যা-ই হোক, পাশে বসা মূর্তিটা চুপচাপ ড্রাইভ করে যেতে লাগল, আর আমিও মনে মনে ভগবানকে ডাকতে লাগলাম।
শহরের নিকটবর্তী হতে-না-হতেই অন্ধকার ছিঁড়ে আলো এসে ধুয়ে দিয়ে গেল গাড়ির ভেতরটা। আর সেই আলোতে দেখতে পেলাম মূর্তিমানকে। চরম আতঙ্কে দেখলাম, ডার্বির ব্যাপারে লোকজনের কানাঘুষো কিছু মিথ্যে নয়। সত্যিই একে অনেকটা এপ্রাহিমের মতোই দেখতে। ব্যাপারটা যে কী ভয়ানক, সেটা বোঝাতে পারব না। এরকম চমকের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। হয়তো ডার্বির মুখ থেকে এতক্ষণ ধরে অর্থহীন প্রলাপ শোনার ফলেও আমার এই অবস্থা হতে পারে, কিন্তু আমি দিব্যি গেলে বলতে পারি, আমার পাশে বসে যে গাড়িটা চালাচ্ছে, সে এডওয়ার্ড পিকম্যান ডার্বি নয়, এবং কস্মিনকালেও ছিলও না। এ যেন পাতালের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে-আসা কোনও মূর্তিমান প্রেতাত্মা!
