চেজুনকুক গ্রামটি মেইন-এর সবচেয়ে দুর্গম জঙ্গল অধ্যুষিত জায়গা। সারাদিন গাড়ি চালিয়ে, প্রকৃতির সৌন্দর্য আস্বাদ করতে করতে শেষ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছোনো গেল। গিয়ে দেখি, ডার্বিকে একটা খামারের ঘরে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আমাকে দেখেই সে তড়বড় করে একগাদা কথা বলে গেল, যার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারলাম না।
ড্যান– তুমি ভাবতে পারবে না–উফফ! ওটা সোগথের জায়গা! পাক্কা ছ-হাজার সিঁড়ি নীচে অন্ধকার, নিবিড় নিকষ অন্ধকার!! সেখানে থাকে–উহ্! কী বীভৎস! আমি, আমি কোনও দিন আমাকে এখানে আনতে দিইনি, কিন্তু ও-ও আমাকে সেই এনেই ছাড়ল। উফফ, কী হারামি মেয়েছেলে! বিশ্বাস করবে না, সেই পাথরের মূর্তিটা জীবন্ত হয়ে উঠল। এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। কারা যেন সব অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করছিল। কী একটা নাম বারবার বলছিল, কামগ, কামগ। ওটা নাকি এপ্রাহিমের গুপ্তনাম। কয়েক মিনিট আগে আমি আমার বাড়ির লাইব্রেরিতে বসে ছিলাম, আর পরমুহূর্তেই কিনা এক পাতালের অন্ধকারে প্রবেশ করলাম। আমি জানি, ওই মেয়েছেলেটা আমার নশ্বর দেহটাকে নিজেই ওখানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। কী ভয়ানক জায়গা, সে তুমি কল্পনাতেও আনতে পারবে না ড্যান– ওহ্! মনে হল যেন নরকের সমস্ত দ্বার আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। অলৌকিক এবং অসম্ভব সব মিলেমিশে এক হয়ে গেছে ওই অন্ধকার গর্তের গভীরে। চোখের সামনে একটা সোগথকে নিজের অবয়ব বদলাতে দেখলাম। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না কোনওমতে… দেখে নিয়ে, আর যদি আমার সঙ্গে এরকম বদমাইশি করে তাহলে আমি নিজে হাতে ওই শয়তান মাগিকে খুন করব। কিন্তু ড্যান আমি এখনও বুঝছি না যে, ওটা কী ছিল? অ্যাসেনাথ নাকি এপ্রাহিম নাকি নাকি… উফ, আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে ড্যান।
কোনওরকমে এডওয়ার্ডকে শান্ত করলাম। অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো গেল। পরের দিন সকালে একপ্রস্থ ভদ্র জামাকাপড় পরিয়ে ওকে নিয়ে ফিরে চললাম আর্কহ্যামে। কাল সারাদিন প্রলাপ বকে এডওয়ার্ডের মনের ভার কিছুটা লাঘব হয়েছে তাই সে আপাতত চুপচাপ বসে রইল আমার পাশে। গ্রামের গাছপালা, জঙ্গলের আলিঙ্গন পেরিয়ে যখন শহরের মধ্যে আমাদের গাড়ি ঢুকে পড়ল, এডওয়ার্ডের মুখখানা হঠাৎ কুঁচকে যেতে দেখলাম। যেন শহরের সান্নিধ্য ও আর সহ্য করতে পারছে না।
আমি অনুমান করলাম, স্ত্রী অ্যাসেনাথের সম্মোহনের প্রভাব ওর ওপর বেশ ভালোরকমই পড়েছে। সেটা কাটিয়ে উঠতে ও প্রাণান্তকর পরিশ্রম করলেও, ওই মহিলা যে বেশ উচ্চপর্যায়ের জাদুকর তা স্বীকার করতেই হয়। এডওয়ার্ড আমাকে বলেছিল, সে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছুক নয়। আমিও মনে মনে সেটাই চাইছিলাম। ওকে আমাদের বাড়িতে ক-দিন নিয়ে রাখব। তার মধ্যে আশা করি, আমি ওদের ডিভোর্সের কাগজপত্র সব তৈরি করে নেব।
পোর্টল্যান্ড পেরিয়ে আসার পর এডওয়ার্ডের বিড়বিড়ানি বেড়ে গেল। গড়গড় করে অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল সে। আমি ড্রাইভ করতে করতে চুপচাপ শুনতে লাগলাম আর বিস্মিত হলাম অ্যাসেনাথের ব্যাপারে কিছু কথা জেনে। মেয়েটি নাকি এডওয়ার্ডের ওপর এই আত্মাবিনিময়ের সম্মোহনপদ্ধতি অনেকদিন ধরেই চালাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই সে এডওয়ার্ডের দেহধারী হয়ে চলে যায় কোন দূর দূর জায়গায়। অ্যাসেনাথ যখন এডওয়ার্ডের শরীরের মাধ্যমে বাইরে যায়, তখন সে নাকি এডওয়ার্ডের চেতনা বা আত্মাকে অসহায়ভাবে তার নিজের শরীরে বন্দি করে রেখে যায় নিজের বাড়িতে। তবে অ্যাসেনাথ নাকি বেশিক্ষণ তার দেহ ধারণ করে থাকতে পারে না। সম্ভবত সে কারণে অধিকাংশ সময়েই এডওয়ার্ড সংবিৎ ফিরে পাওয়ার পর নিজেকে আবিষ্কার করে বাড়ি থেকে বহু দূরে, ভয়াল, ভয়ংকর সব দুর্গম প্রদেশে কোন এক অজানা স্থানে, একাকী। সেসব জায়গা থেকে কয়েকবার নাকি সে বহু কষ্টে ফেরত এসেছে। কিন্তু এবারেরটা যেন সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আশঙ্কার কথা হল, অ্যাসেনাথের সম্মোহন এবং শরীর বদলানোর ক্ষমতা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। আগে যতটা সময় সে এডওয়ার্ডের দেহের ওপর কবজা করতে পারত, এখন আরও বেশিক্ষণ পারে। অ্যাসেনাথ নাকি প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে একজন পুরুষ হওয়ার অন্তত এমন একজন পুরুষের শরীর ধারণ করার, যার মস্তিষ্ক ক্ষুরধার, কিন্তু আত্মবিশ্বাস তলানিতে। একদিন সে পুরোপুরি এডওয়ার্ডের শরীর নিয়ে কেটে পড়বে, আর এডওয়ার্ডকে রেখে যাবে অমানুষিক এক নারীদেহের মধ্যে বন্দি করে।
এডওয়ার্ড জানতে পেরেছে এক ভয়াবহ সত্য এপ্রাহিমের সুপ্ত বাসনা। এপ্রাহিম বরাবর চেয়ে এসেছে, যাতে সে অমর হয়, নশ্বর দেহকে ছাড়িয়ে সে তার চেতনাকে স্থানান্তরিত করতে পারে একের পর এক দেহে। অ্যাসেনাথ সফল হবেই- ইতিমধ্যেই একটা সফল পরীক্ষার ফলাফল সে নিজের চোখে দেখেছে…
এডওয়ার্ড ডার্বিকে আমি এবার পূর্ণদৃষ্টিতে দেখলাম। তার চেহারা বেশ খোলতাই হয়েছে এ ক-দিনে। পেশিবহুল মেদহীন শরীরটা পুরোনো থলথলে ডার্বির থেকে যথেষ্ট আলাদা। দেখলে বোঝাই যায়, ডার্বি এখন আর ঘরের কোনায় একাকী বসে চিন্তার ঊর্ণনাভ জাল বুনে সময় কাটায় না। সে কায়িক শ্রম করে বলা ভালো, করতে বাধ্য হয়। স্ত্রী নামক মালকিনের হুকুমে এবং সম্মোহনের বশে এডওয়ার্ড ছুটে বেড়ায় দিগ্বিদিকে, নিরন্তর, ক্লান্তিহীনভাবে। তবে শরীরের উন্নতি হলেও, তার মনের অবস্থা মোটেই সুবিধের নয়। স্ত্রী র সম্মোহন, এপ্রাহিমের কালাজাদু, অদ্ভুত সব রহস্য, সব মিলিয়ে তার মনে রীতিমতো জট পড়ে গিয়েছে।
