অ্যাসেনাথ দিন দিন কেমন যে বুড়িয়ে যাচ্ছিল। ডার্বি আর অ্যাসেনাথকে পাশাপাশি দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না, যে মেয়েটি ওর থেকে বয়সে এত ছোট। বরং অ্যাসেনাথকেই ডার্বির চেয়ে বড় মনে হত। তা ছাড়া আমার গিন্নি আর ছেলে মিলে এটা লক্ষ করেছিল যে, অ্যাসেনাথের মুখের গাম্ভীর্য যেন অনাবশ্যকরকমভাবে বেড়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে আমরা ওদের ফোন করাই বন্ধ করে দিলাম। হয়তো ওরা একাই থাকতে চাইছিল, তাই আমরা ওদের আর বিরক্ত করিনি।
বছরখানেক পর থেকেই এডওয়ার্ডের ব্যাপারে নানা কানাঘুষো শোনা যেতে লাগল। সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, এডওয়ার্ড আগে নিজে কোনও দিন ড্রাইভ করেনি। গাড়ি চালাতে সে রীতিমতো ভয় পেত। শোনা গেল, সে এখন নাকি পুরো পাকা ড্রাইভারের মতো গাড়ি চালাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ট্রাফিক সিগনাল বাঁচিয়ে অ্যাসেনাথের গাড়িখানা সে হু হু করে ছুটিয়ে দেয় পুরোনো ক্রাউনিংশিল্ড ড্রাইভওয়ে দিয়ে। অবশ্য সে বেশির ভাগ সময়ে ওই রাস্তাটাই বেছে নেয়, যেটা আর্কহ্যাম থেকে ইন্সমাউথের দিকে চলে গেছে।
ডার্বিকে ড্রাইভিং সিটে যারা দেখেছে, তারা সবাই একটা আশ্চর্য দাবি জানিয়েছিল– ড্রাইভারের সিটে এডওয়ার্ডকে নাকি অনেকটা অ্যাসেনাথের মতো দেখতে লাগছিল। সেই মুখ, সেই চোখ। আমি ব্যাপারটা শুনলেও উড়িয়ে দিয়েছিলাম পুরোপুরি। পরে শুনেছিলাম যে, ডার্বি-দম্পতি কলেজ ছেড়ে দিয়েছে কারণ তারা নাকি এমন কিছু বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিল, যা জানতে পেরে পিলে চমকে গিয়েছিল প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর।
বিয়ের বছর তিনেকের মাথায় এডওয়ার্ড আমার কাছে ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করল এই বলে যে, তার অ্যাসেনাথের সঙ্গে রীতিমতো সমস্যা হচ্ছে। সারাক্ষণ কিছু একটা ভয় এবং বিরক্তি তাকে গ্রাস করে রাখে। আমাকে সে কয়েকবার বলেছিল বটে যে, অ্যাসেনাথের ব্যাপারস্যাপার তার মোটেই সুবিধের মনে হচ্ছে না। ওর কিছু আচরণ তো একেবারেই সৃষ্টিছাড়া। আমি সাক্ষাতে কয়েকবার ওকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করে দেখেছি, তবে বিশেষ উত্তর পাইনি।
এর কয়েকদিন পর এডওয়ার্ডের বাবা মারা গেলেন। এডওয়ার্ডের মধ্যে সে জন্য কিছুমাত্র অনুতাপ দেখা গেল না। হতে পারে, বিয়ের পর থেকে তার সঙ্গে মি. ডার্বির একরকম সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে, কিন্তু তা সত্ত্বেও মি. ডার্বির মৃত্যুর পর এডওয়ার্ডের গাড়ি চালিয়ে হুল্লোড় যে আরও বেড়ে যাবে, সেটা অনেকেই আশা করেননি। নিজের পরিবারের প্রতি এমন ঔদাসীন্য লোকজন মোটেই ভালোভাবে নেয়নি।
এডওয়ার্ডের ফোন আসাটা এরপর কয়েকদিন একটু বেড়ে গেল। ফোনে সে এমন এমন কথা বলতে লাগল, যা বিশ্বাস করা রীতিমতো কঠিন। মেইন-এর ঘন জঙ্গলে কিছু পুরোনো ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। তারই কিছু ভগ্ন কাঠামোর নীচে রয়েছে গভীর সুড়ঙ্গ। হাজার সিঁড়ি পেরিয়ে সেই গভীরতায় পৌঁছোনো যায় কেউই এই গুপ্ত সুড়ঙ্গের সন্ধান জানে না। কিন্তু এডওয়ার্ড জানতে পেরেছে। সে এ-ও জানতে পেরেছে যে, সেখানে এমন কিছু আছে, যা ঠিক প্রকাশ করা যায় না অন্য দেশ-কাল থেকে, অন্য মাত্রা থেকে আগত কিছু ভয়ংকরের ব্যাপারে জানতে পেরেছে সে।
মাঝে মাঝে এডওয়ার্ড আমার কাছে এসে ফিশফিশ করে বলত, এপ্রাইমের ব্যাপারে জানো ড্যান? আমার স্থির বিশ্বাস, সে বেঁচে আছে। কোথাও একটা আছে, কিন্তু বেঁচে রয়েছে। তার আত্মা এই আমার আশপাশেই কোথাও রয়েছে, শুধু দেহ ধারণ করতে পারছে না। বলেই সে শিউরে উঠে চারপাশে তাকাত। আমি ওর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে যেতাম।
কথা বলার মাঝেই এডওয়ার্ড হঠাৎ কেমন যেন চুপ করে যেত, যেন জোর করে কেউ তার মুখ চেপে ধরেছে। আমি অ্যাসেনাথের ব্যাপারে যা কিছু শুনেছিলাম, তাতে আমার কেমন জানি মনে হত, অ্যাসেনাথ হয়তো দূর থেকেই ডার্বিকে নিয়ন্ত্রণ করে– সে কী বলবে, কীভাবে চলবে– সব।
এরপর থেকে ডার্বির পক্ষে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা মুশকিল হয়ে পড়ল। সময় সুযোগ বুঝে সে আসত বটে, কিন্তু তেমন কথা হত না। আমি ঠিকই বুঝতাম যে, যখন অ্যাসেনাথ আমার থেকে কোনও ক্ষতির আশঙ্কা করত না, তখনই ডার্বিকে আসতে দিত।
কিন্তু আসল ব্যাপারটা টের পেলাম কয়েকদিন পরেই।
.
০৪.
এডওয়ার্ডের বিয়ের ঠিক তিন বছর পর, অগাস্টের এক সকালে আমার নামে একটা টেলিগ্রাম এল। দেখে আশ্চর্য হলাম– ওটা মেইন থেকে এসেছে। এডওয়ার্ডের থেকে গত দু-মাস সাক্ষাৎ বা ফোন কিছুই পাইনি। শুনেছিলাম যে, সে নাকি ব্যাবসার কাজে বাইরে গেছে– অ্যাসেনাথকে সঙ্গে নিয়ে। যদিও অতিরিক্ত কৌতূহলী লোকজন, যারা উঁকিঝুঁকি মেরে পরের হাঁড়ির খবর সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ, তারা জানিয়েছিল যে, ডার্বিদের বাড়ির ওপরতলায়, পর্দার আড়ালে কেউ নাকি রয়েছে। কিন্তু সে যে কে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়নি। চাকরবাকররাই নাকি বাজার-দোকান করছে।
টেলিগ্রামটা পড়ে চমকে গেলাম। চেজুনকুক-এর পুলিশ থানা থেকে খবর পাঠিয়েছেন খোদ হেড ইন্সপেক্টর। মেইন-এর জঙ্গল থেকে ছেঁড়া জামাকাপড়-পরা এক মূর্তিমান উন্মাদকে নাকি প্রলাপ-বকা অবস্থায় উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে-ফিরতে দেখা যায়। সে নাকি আমার নাম করে তাকে উদ্ধারের আরজি জানাচ্ছিল, তাই ইন্সপেক্টর বাধ্য হয়েই আমায় তার করে ব্যাপারটা জানায়।
