কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম হল না মোটেই। পরের সারা সপ্তাহ জুড়ে যখনই ডার্বি আমার সঙ্গে আড্ডা দিতে এল, অ্যাসেনাথ, অ্যাসেনাথ করে আমার কান পচিয়ে ছাড়ল। আমি আগেই বলেছি যে, এডওয়ার্ডকে দেখতে রাজপুত্রের মতো সুন্দর ছিল। তাকে দেখে কেউ আন্দাজ করতে পারত না যে, তার বয়স চল্লিশের দিকে বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে পড়েছে। উলটোদিকে অ্যাসেনাথকে তার বয়সের তুলনায় বেশ বয়স্কই লাগত। যা-ই হোক, এক শরতের সকালে এডওয়ার্ড আমাকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে গেল তার প্রেমিকার সঙ্গে আলাপ করাবে বলে। গিয়ে দেখলাম, ব্যাপার মন্দ না, প্রেমের রং দু-জনের মনেই ভালোভাবে লেগেছে। চোরা চোখের চাউনিতে অ্যাসেনাথ দেখলাম বেশ পটু– যখনই সুযোগ মিলেছে, সে এডওয়ার্ডের প্রতি বিলোল কটাক্ষ হানতে কুণ্ঠা বোধ করেনি।
এর ক-দিন পর মি. ডার্বি, মানে এডওয়ার্ডের বাবা একদিন আমার বাড়িতে হঠাৎ এসে হাজির। ওঁকে রীতিমতো সমীহ করতাম আমি, যথেষ্ট খাতির করেই বসালাম। এ কথা-সে কথার পর বুঝলাম, ভদ্রলোকে বেশ মুষড়ে পড়েছেন। উনি ছেলের বান্ধবীর কথা শুনতে পেয়ে ছেলেকে চাপ দিয়ে সব গুপ্তকথা জেনে নিয়েছেন। কিন্তু ছেলে এর মধ্যে নাকি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সে শুধু অ্যাসেনাথকে বিয়ের প্ল্যানই করেনি, অন্য বাসার খোঁজও করছে, যেখানে সে বিয়ের পর উঠে যেতে পারে। মি. ডার্বি আমাকে অনেক অনুনয় করলেন, আমি যেন একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাজ করি এবং কোনওভাবেই মতিচ্ছন্ন এডওয়ার্ডের বিয়ে ওই ডাইনিটার সঙ্গে হতে না দিই।
বলাই বাহুল্য, এই প্রস্তাবে আমি মোটেই রাজি হলাম না। এডওয়ার্ডের মধ্যে অনেকদিন পর একজন দায়িত্ববান মানুষ হওয়ার ক্ষমতা এবং ইচ্ছে জাগ্রত দেখে আমার ভালোই লাগছিল। আর ব্যাপারটা তো শুধু এডওয়ার্ডের দিক দিয়ে নয়, মেয়েটিরও এই সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। এডওয়ার্ডের এই পরিবর্তনটুকুকে আমি মনে মনে স্বাগত জানালাম। বাপের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজে কিছু করার শক্তি যে ছেলেটা জোগাড় করতে পেরেছে– এটা দেখেই আমার গর্ব হচ্ছিল, তাই সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে ছেলেটার জীবন বরবাদ করার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হল না।
মাসখানেক পরে একটা ঘরোয়া সমাবেশে ওদের বিয়েটা হয়ে গেল। বলাই বাহুল্য, আমি এবং আমার পরিবার বিয়েতে আমন্ত্রিত ছিলাম, এবং মিসকাটনিকের প্রচুর ছাত্রছাত্রীও বিয়েতে উপস্থিত হয়ে আনন্দ করেছিল। অ্যাসেনাথ আর ডার্বি মিলে হাই স্ট্রিটের মোড়ে ওল্ড ক্রাউনিংফিল্ড নামে একটা বড়সড়ো বাড়ি কিনে রেখেছিল। আপাতত স্থির হল যে, নবদম্পতি সপ্তাহখানেকের জন্য ইন্সমাউথে কাটিয়ে আর্কহ্যামে তাদের নতুন বসতবাড়িতে ফিরে আসবে। ইন্সমাউথের বাপের বাড়ি থেকে কিছু আসবাব, বই আর তিনখানা চাকরকেও আনার ছিল অ্যাসেনাথের।
মিসকাটনিকের কাছে থাকার অনুরোধ এডওয়ার্ডের বাবা ফেলতে পারেননি। ছেলে এমনিতেও সারাক্ষণ বই মুখে করে থাকে। আর তা ছাড়া, ওদিকটাতে প্রচুর বিজ্ঞ মানুষের বাস– ওদের সান্নিধ্যে এডওয়ার্ড পরিবার নিয়ে সুখেই থাকবে, সে আশাই করেছিলেন মি. ডার্বি।
মধুচন্দ্রিমা থেকে ফেরার পর এডওয়ার্ড যখন আমাকে প্রথম তার নতুন বাড়িতে ডাকল, তখন লক্ষ করলাম, ছোকরা বেশ কিছুটা বদলে গিয়েছে। ক্লিন শেজ্ঞ এডওয়ার্ডকে বেশ ভদ্রজনোচিত লাগছে ঠিকই, কিন্তু এই ক-দিনেই যেন বেশ বড় হয়ে গেছে সে। মুখে একটা স্পষ্ট চিন্তাক্লিষ্ট ভাব। আমার ব্যাপারটা কেমন জানি ভালো লাগল না। এডওয়ার্ড ক দিনেই যেন বুড়ো হয়ে গেছে। আমি অবশ্যই চেয়েছিলাম, যাতে সে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, নিজের ছেলেমানুষ বদনাম ঘুচিয়ে পৌরুষকে জাগিয়ে তোলে গড়ে তোলে একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। তবুও কেন জানি না, ডার্বির এই পরিবর্তনটা মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। তার ওপর এডওয়ার্ড ইন্সমাউথ থেকে একাই এসেছে, অ্যাসেনাথ আসেনি। তার নাকি কিছু কাজ পড়ে গেছে ওখানে। তবে গুচ্ছ বই দিয়ে এডওয়ার্ডকে সে এখানে পাঠিয়েছে। বইগুলোর নাম উচ্চারণ করলেও দেখলাম, সে বেশ শিউরে উঠছে, নিজের অজান্তেই।
এডওয়ার্ড এমনিতেই গুপ্তবিদ্যা নিয়ে রীতিমতো চর্চা করত, তার ওপর এখন অ্যাসেনাথ সহায়। গিন্নির সাহচর্যে আর তার জ্ঞানের প্রাচুর্যে সে বেশ তাড়াতাড়িই ব্যাপারগুলো শিখে নিতে লাগল। কিন্তু মাঝেমধ্যে অ্যাসেনাথের ক্রিয়াকলাপ বা তার গুপ্তবিদ্যার উপাচার ও উপাসনাপদ্ধতি এতটাই বীভৎস আর আতঙ্কজনক হয়ে উঠত যে, এডওয়ার্ড নাকি রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করত।
বাড়ির তিন চাকরের দু-জন ছিল এক অতিবৃদ্ধ দম্পতি। তারা সেই এপ্রাহিমের সময় থেকেই রয়েছে। মাঝে মাঝেই তারা এডওয়ার্ডকে এপ্রাহিম এবং তার ঘোমটা পরিহিতা স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর ব্যাপারে বিড়বিড় করে শোনাত। আর ছিল একটি মেয়ে কালো কষ্টিপাথরের মতো রং তার। শরীরে তার নানা অসংগতি ছিল, কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার তার গা গিয়ে সারাক্ষণ ভেসে আসত তীব্র আঁশটে গন্ধ।
.
০৩.
পরের দু-বছর ডার্বি পুরো ডুমুরের ফুল হয়ে গেল। মাসে দু-বার বা নিদেনপক্ষে একবারও তার দেখা পাওয়া ভার হয়ে দাঁড়াল। মাঝে মাঝে ফোন-টোন করলে জবাব দিত বটে, কিন্তু বুঝতাম কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়াতে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। যেসব গুপ্তবিদ্যাচর্চার ব্যাপারে বা অকাল্টের ব্যাপারে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চালিয়ে যেতাম, সেসব নিয়ে আজকাল সে আর টু-শব্দটি করে না। অ্যাসেনাথের ব্যাপারে তো কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল সে।
