এডওয়ার্ডের যখন চৌত্রিশ বছর বয়স, তখন তার মা মারা গেলেন। তার পর পরই সে বেচারাও কী এক বিশ্রী রোগে বিছানা নিল। বেশ কয়েকদিন যমে-মানুষে হওয়ার পর, তার বাবা তাকে টেনে নিয়ে গেলেন ইউরোপে– ভালো চিকিৎসা করানোর জন্য। ডার্বির কপাল ভালো বলতে হবে, সে সুস্থ হয়ে ফিরে এল। কিন্তু এই রোগে ভোগার পর থেকেই
ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেল। ওকে দেখে স্বাভাবিক রোগে ভোগা মনমরা মানুষ লাগত না। খুব আশ্চর্যরকমভাবে উল্লসিত ছিল সে, যেন তার এক বন্ধনমুক্তি ঘটেছে। যে ছেলেটা আগে মুখচোরা হয়ে বই মুখে করে পড়ে থাকতেই ভালোবাসত সে রাতারাতি হয়ে পড়ল চরম মিশুকে। কেবল তা-ই নয়, সে মিসকাটনিকের নতুন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যেচে মিশতে লাগল, তাদের দলে ভিড়ে করতে লাগল গোপন সব ক্রিয়াকলাপ।
শুনেছিলাম, কোনও একদিন সে এবং একদল ছেলেমেয়ে মিলে চর্চা করেছিল এমন একটা কিছুর, মিসকাটনিকের ইতিহাসে যা কোনও দিন শোনা যায়নি।
এক ভয়াল-ভয়ংকর গুপ্তবিদ্যা সাধনার কথা কানাঘুষোতে জেনে স্তম্ভিত হয়েছিলাম আমি।
.
০২.
এডওয়ার্ডের যখন আটত্রিশ বছর বয়স, সে সময়েই অ্যাসেনাথ ওয়াইটের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। অ্যাসেনাথ তখন তেইশ বছরের যুবতি, মিসকাটনিকে মধ্যযুগীয় অধ্যাত্মবাদ নিয়ে পড়াশোনা করতে এসেছিল সে। আমার এক বন্ধুর মেয়ের থেকে তার ব্যাপারে আমি কিছুটা হলেও শুনেছিলাম। অ্যাসেনাথও যে খুব একটা মিশুকে প্রকৃতির ছিল, তা নয়– তবে তার সঙ্গে বাকি ছাত্রছাত্রীদের দূরত্ব বজায় রাখার কারণ ছিল অন্য।
ছোটখাটো চেহারার সুন্দরী অ্যাসেনাথের চোখগুলো ছিল বেশ ভীতিপ্রদ। কোটর থেকে বেরিয়ে-আসা চোখে যেন সবসময় খেলা করে যেত কী এক অবজ্ঞা, অবহেলা। অন্য ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় সে যে অনেক বেশি বিদুষী আর ক্ষমতাসম্পন্না, সেই অভিব্যক্তি যেন ফুটে বেরুত তার চোখ দিয়ে। সে ছিল ইন্সমাউথের কুখ্যাত ওয়াইটদের৮২ বংশধর। এমনিতেই অভিশপ্ত, পরিত্যক্ত ইন্সমাউথের নামেই লোকে আতঙ্কিত হত, তারপর অ্যাসেনাথের চলাফেরাতে এমন একটা তমসাচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব ছিল, যে ওকে খুব স্বাভাবিকভাবেই লোকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করত।
এপ্রাহিম ওয়াইট এই বংশের সবচেয়ে কুখ্যাত নাম। শুধু নামের দিক দিয়ে নয়– কাজের দিক দিয়েও এপ্রাহিম এক মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল। তার স্ত্রীর মুখ কেউ কোনও দিন দেখেনি, কারণ ভদ্রমহিলা সারাদিন মুখে একহাত ঘোমটা টেনে নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। ইন্সমাউথ শহরে ওয়াশিংটন স্ট্রিটের ধারে যে আধভাঙা পোড়ো দুর্গের মতো বাড়িতে এপ্রাহিম ওয়াইট বাস করত, তার চিলেকোঠার জানলাটা কোনও দিন কেউ খোলা দেখেনি– আজন্ম সেটায় একটা তক্তা মারা থাকত। যারা ওই অভিশপ্ত শহরে পা রেখেছে, তাদের থেকে শুনেছি, রাতের অন্ধকারে ওই চিলেকোঠা থেকে ভেসে আসত অপার্থিব সব শব্দ। এপ্রাহিম তার যুবক বয়সে নাকি জিনিয়াস ধরনের তান্ত্রিক ছিল। জনশ্রুতি আছে, সে নাকি তার নিজের ইচ্ছেমতো সমুদ্রে তুফান আনতে পারত, সৃষ্টি করতে পারত মহাদুর্যোগ। আমি আমার জীবদ্দশায় তাকে এক-দু-বারই দেখেছিলাম। তখন আমি মিসকাটনিকে কী একটা কাজে গিয়েছিলাম, আর এপ্রাহিম এসেছিল লাইব্রেরিতে নিষিদ্ধ সব অকাল্টের বই নিয়ে আলোচনা করতে। নেকড়ের মতো ধূর্ত মুখে ধূসর দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা এপ্রাহিমকে দেখে আমি চমকে পালিয়ে এসেছিলাম।
তবে এপ্রাহিমের অস্বাভাবিক মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই, ওর মেয়ে অ্যাসেনাথ মিসকাটনিকে পড়তে আসে। বাপ আর মেয়ের মধ্যে কেবল যে মুখের মিল ছিল তা নয়– মেয়ে যে বাপের একনিষ্ঠ ছাত্রীও ছিল, সেটা বুঝতে ভুল করেনি মিসকাটনিকের ক্লাসমেটরা। অ্যাসেনাথের নানাবিধ অদ্ভুত ক্ষমতা ওর ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছিল। এমনকী তার রাস্তা এড়িয়ে চলত পশুপাখিরাও। আমার বন্ধুর যে মেয়েটি অ্যাসেনাথের সঙ্গে পড়াশোনা করত, তার মুখ থেকেই আমি বেশির ভাগ খবর জোগাড় করতাম। অনেক কথার মধ্যে অ্যাসেনাথের একটা বিশেষ ব্যাপার আমাকে আকৃষ্ট করেছিল, এবং তা হল, মেয়েটি নাকি চূড়ান্তরকম ভালো সম্মোহন জানত। নিজের চেতনাকে অন্যের শরীরে স্থাপন করে অন্যের চেতনাকে নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে পারত। এর ফলে সম্মোহিত মানুষটি সভয়ে দেখতে পেত, ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে তার নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আর সেই শরীরধারীর দুটো চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর সে চোখ যেন জ্বলছে এক অনন্ত জিঘাংসায়। শরীরবিহীন চেতনার ওপর অ্যাসেনাথের জ্ঞান ছিল অবাক করার মতো।
অ্যাসেনাথ তার বন্ধুমহলে ক্ষোভ প্রকাশ করত যে, একজন পুরুষ হলে সে এই তন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করতে পারত আরও ভালোভাবে। একটা পুরুষ মস্তিষ্কের ক্ষমতা তার আয়ত্তে এলে, অ্যাসেনাথ হয়তো অলৌকিক ক্রিয়াকলাপে তার বাবাকেও ছাড়িয়ে যেত বহু দিন আগেই।
এডওয়ার্ডের সঙ্গে অ্যাসেনাথের আলাপ হয় একদল বুদ্ধিজীবীর সমাবেশে এবং আমার স্পষ্ট মনে আছে, পরের দিন একমাত্র অ্যাসেনাথের বিষয়ই ছিল তার কথাবার্তার একমাত্র সারমর্ম। অ্যাসেনাথের জ্ঞান, বাগ্মিতা এবং এডওয়ার্ডের পছন্দের বিষয়ে তার আগ্রহ, তাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল মেয়েটির প্রতি। তবে অ্যাসেনাথের ব্যাপারে আগে যা শুনেছিলাম, তাতে আমার এডওয়ার্ডের ওপর করুণাই হল। এত দিন পর ছোকরা কিনা এরকম এক জাদুগরনির পাল্লায় পড়ল!! আমি অবশ্য ওকে কিছু বলিনি– জানতাম, এসব ক্ষণিকের ভালো-লাগা দু-দিনেই হয়তো কেটে যাবে। তা ছাড়া এডওয়ার্ড নিজেও বলল, অ্যাসেনাথের ব্যাপারে সে তার বাবাকে কিছুই জানাবে না।
