তার শেখার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। যে সময়ের কথা বলছি, তখন কিছু বিদঘুটে শিল্পের ওপর হঠাৎ করেই আমার আগ্রহ জন্মেছিল। এডওয়ার্ডের সঙ্গে ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করতাম। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, তার সঙ্গে কেমন যেন একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল খুব সহজেই। আমরা যে শহরে বাস করতাম, তার মতো অভিশপ্ত, পিশাচতাড়িত, দুঃস্বপ্নের শহর হয়তো-বা আর দুটি ছিল না। রহস্যময় কিংবদন্তির ছায়ায় ঘেরা এই আর্কহ্যামের ভেঙে পড়া ছাদ আর মোটা মোটা থামের ঘরবাড়িগুলি যেন ইতিহাসকে থামিয়ে রেখেছে থামিয়ে রেখেছে এক প্রাচীন সময়কে। এই অদ্ভুত শহরের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদেও হয়তো আমার বন্ধুত্বটা এতটা গাঢ় হতে পেরেছিল।
স্কুলের পড়াশোনা শেষে আমি স্থাপত্যের ওপর বিশেষভাবে আকর্ষণ অনুভব করি এবং তা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, এডওয়ার্ডের সঙ্গে মেলামেশার সময় হয়ে উঠত না বিশেষ। তাতে অবশ্য আমাদের পুরোনো বন্ধুত্বে কোনও ছেদ পড়েনি। ইতিমধ্যেই যুবক ডার্বির কাব্যপ্রতিভা দুরন্ত ছন্দে গতিমান হয়ে উঠেছিল। আঠারো বছর বয়সে তার লেখা দুঃস্বপ্নের কবিতাগুচ্ছ রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল পাঠকসমাজে। আপনারা জাস্টিন জিওফ্রেকে চেনেন? খ্যাপা এক কবি, যিনি মানব ও প্রস্তরখণ্ড লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন তাঁর খুব কাছের লোক হয়ে উঠেছিল এই এডওয়ার্ড। তবে কথিত আছে, সেই জিওফ্রে নাকি হাঙ্গেরির কোনও এক অভিশপ্ত গ্রাম থেকে ফিরে আসার পর ১৯২৬ সালে এক পাগলাগারদে ভরতি হন। আর সেখানেই উন্মত্তের মতো চিৎকার করতে করতে একদিন তাঁর দুঃখজনক অকালপ্রয়াণ ঘটে।
দায়িত্ব নিয়ে কোনও কাজ করার ব্যাপারে ডার্বির কোনও সাড়া পাওয়া যেত না। পড়াশোনা ছাড়া অন্যান্য কাজে তার আত্মবিশ্বাস ছিল বড়ই কম। তার বাপ-মা-র অতিরক্ষণশীল আদরের অত্যাচার থেকে বেচারা তখনও মুক্তি পায়নি। তাই অচিরেই বোঝা গিয়েছিল, চাকরি বা ব্যাবসার মতো কায়িক শ্রম তার দ্বারা কোনওমতেই হওয়ার নয়। তবে তাদের সম্পত্তির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, এই সামান্য অক্ষমতাটুকুর জন্য তাকে মোটেই বেগ পেতে হয়নি৷ নীল চোখ, ফরসা সুন্দর মুখের অধিকারী ছেলেটির চেহারাতে একটা আদুরে থলথলে ভাব ছিল, যেটা ওর নিরীহ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে গিয়েছিল। সুন্দর উচ্চতার, সোনালি চুলের ডার্বি খুব স্বাভাবিকভাবেই জনসমাজে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াতে পারত, যদি না তার অন্তর্মুখীনতা আর গভীর পুস্তকপ্রেম তাকে বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখত।
ডার্বির বাবা-মা তাকে প্রতি গ্রীষ্মে একবার করে ইউরোপ ঘুরতে নিয়ে যেতেন। ডার্বি তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে খুব দ্রুত ইউরোপের সংস্কৃতি এবং সামাজিক রীতিনীতি আয়ত্ত করে নিয়েছিল। সে সময় তার সঙ্গে আমার প্রচুর আজ্ঞা হত। আমি তখন সবে সবে হার্ভার্ড থেকে পাশ করে বস্টনে এক নামি আর্কিটেক্টের অফিসে কাজ করে হাত পাকিয়েছি। বিয়ে করে সংসার পেতে আমি আর্কহ্যামে ফিরে এসেছি প্র্যাকটিস করতে৷ বাবার শরীরটা ভালো না-থাকায় উনি ফ্লোরিডা চলে গিয়েছিলেন তাই আমি সপরিবার সলটনস্টল স্ট্রিটে একটা বাড়িতে উঠলাম। এডওয়ার্ড এই সময়টা প্রায় প্রতিদিন দেখা করতে আসত। আমার বাড়িতে এসে এডওয়ার্ড একটা স্পেশাল কোডে ডোর বেল বাজাত বা দরজাটা নক করত। প্রতিদিন খাওয়াদাওয়ার পর আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন ও এসে দরজায় পরপর জোরে জোরে তিনটে আর তারপর থেমে থেমে দুটো নক করবে। মাঝে মাঝে আমি ওর বাড়িতে গিয়েও ওর ক্রমবর্ধমান দুর্লভ বইয়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি দেখতাম আর ঈর্ষান্বিত হতাম।
ডার্বি মিসকাটনিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোথাও পড়েনি। আসলে ওর বাবা-মা ওকে বাড়ি থেকে বেশি দূরে একা একা যেতেই দেয়নি। যা-ই হোক, মিসকাটনিকে ইংরেজি এবং ফরাসি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করলেও ওর মার্কস প্রায় সবেতেই ভীষণ ভালো ছিল। কেবল গণিত আর বিজ্ঞানে ও তেমন সুবিধে করতে পারেনি। কিন্তু ওর সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ছিল প্রাচীন গুপ্তবিদ্যা। সেসব বিদ্যা আয়ত্ত করা কেবল দুরূহ নয়, তার অধীত জ্ঞানও বড় ভয়ানক। সেসব নিয়ে পড়ার জন্য সে বার বার ছুটে যেত মিসকাটনিক লাইব্রেরিতে।
লাইব্রেরিতে বসে ডার্বি গোগ্রাসে গিলত অদ্ভুত সব নিষিদ্ধ বইয়ের জ্ঞান যেসব বইয়ের নাম মনে আনলেও আতঙ্কে শিহরিত হতে হয়, সে পরম পরিতোষে সেগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিত। কী ছিল না সেসব বইয়ের মধ্যে হাড়-হিম-করা বুক অব ইবন যেমন ছিল, তেমনই ছিল ভন জুন্থের অভিশপ্ত গুহ্যবিদ্যা এবং উন্মাদ আরব জাদুকর আবদুল আলহাজেডের লেখা নেক্রোনমিকন। এই শেষোক্ত বইটি সম্পর্কে যত কম বলা যায়, ততই ভালো লোকমুখে শোনা যায়, স্বয়ং শয়তান জাগানোর এবং তাকে বশীভূত করার গুপ্তমন্ত্র নাকি লেখা আছে ওই বইতে। এডওয়ার্ড যদিও এসব কাউকে কোনও দিন বলেনি, তবু আমি জানতে পেরেছিলাম। বই-পাগল এই ছেলেটা আমার মনে এতটাই ভালোবাসার উদ্রেক করেছিল, যে আমি ওর নামে আমার ছেলের নামও রেখেছিলাম এডওয়ার্ড ডার্বি আপটন।
পঁচিশ পেরোতে-না-পেরোতেই এডওয়ার্ড রীতিমতো বিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষ করে গুপ্তবিদ্যাতে। কিন্তু তার অন্তর্মুখীনতা এবং বাইরের জগৎ সম্পর্কে চরম উদাসীনতা তার জ্ঞানকে কেবল বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। লোকজনের সঙ্গে ডার্বি যে ইচ্ছে করে মিশত না তা ঠিক নয়, বহু দিনের অনভ্যাস, বাবা-মা-র অতিরিক্ত আঁচল-চাপা-দেওয়া স্বভাব– এসবের জন্য অপরিচিত কোনও জনসমাবেশে গেলেই সে বেচারা কেমন কুণ্ঠিত হয়ে খোলসের মধ্যে ঢুকে যেত।
