এই ভয়াল, থমথমে শহরের ওপরে আলো ফেলতে ফেলতে চাঁদ ক্রমে নীচে নেমে যাচ্ছিল। অবশ্য জ্যোৎস্নার কী-ই বা প্রয়োজন ওই কীটদের? তারা ব্যস্ত রইল নিজেদের কাজে। কুরে কুরে খেতে লাগল মৃত শরীরের মাংস। আমি সেই কীটময় স্রোতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তাকাতে তাকাতে আমার দৃষ্টি চলে গিয়েছিল দূরে। ঠিক সেখানে, যেখানে একটু আগে শকুনটাকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছি। আর সেদিকে তাকাতেই যেন শিউরে উঠলাম। আমার শরীরের মধ্যে কী এক অলৌকিক সংকেত ঝিলিক দিয়ে উঠল। যদিও আমার চোখ তখনও নতুন কিছুই দেখেনি। তবু…
ক্রমে বুঝতে পারলাম, ভুল কিছু ভাবিনি। অকারণে বুকের মধ্যে অনুভব করিনি আতঙ্কের চোরাস্রোত। ভাটার টানে জলস্তর নামতে নামতে দূরের প্রবালপ্রাচীরটা ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছিল। এতক্ষণ যার চুড়োটুকুই আমার চোখের সামনে ছিল। আস্তে আস্তে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল সবটা। বুঝলাম, ওটা আসলে শয়তানের ভয়ংকর মুকুট! হ্যাঁ, শয়তান। তার প্রকাণ্ড কপালটা এবার জলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চাঁদের ম্লান হয়ে-আসা আলোয় একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারছিলাম, আরও নীচে, মাইলের পর মাইল গভীরে ওই দানবের খুরের মতো পা ছুঁয়ে আছে সমুদ্রের তলদেশ।
আমি চিৎকার করে উঠলাম। চারপাশের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিল আমার সেই ভয়ার্ত আর্তনাদ। আমি বুঝতে পারছিলাম, জলের স্তর আর-একটু নেমে গেলেই সেই অতিকায় শয়তানের চোখ দুটো জেগে উঠবে। বিশ্বাসঘাতক চাঁদ তার চোখের সামনে স্পষ্ট করে তুলবে আমাকে!
আমার আর উপায় ছিল না। সেই অমানুষিক দৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে নিঃসংকোচে আমি লাফ দিয়ে পড়লাম সেই দুর্গন্ধময় শ্যাওলা-মাখা জলের গভীরে, যেখানে স্থূলকায় সমুদ্রকীটরা পৃথিবীর মৃতদের শরীর ঘিরে বনভোজনে মত্ত।
[প্রথম প্রকাশ: গল্পটি ১৯২৩ সালের মে মাসে, দ্য ন্যাশনাল অ্যামেচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর: বিশ্বদীপ দে]
কে?
কে? (THE THING ON THE DOORSTEP)
[লাভক্র্যাফটের একটি প্রিয় বিষয় ছিল গল্পের চরিত্রের মন অন্য কোনও চরিত্রের সঙ্গে বদলে দেওয়া। বিয়ন্ড দ্য ওয়াল অব স্লিপ ও দ্য কেস অব চার্লস ডেক্সটার ওয়ার্ড-এর মতোই এই গল্পেও লেখক সেরকমই একটি ঘটনার ছবি এঁকেছেন। মূল চরিত্র এডওয়ার্ড ডার্বিকে লাভক্র্যাফট যেন তাঁর প্রিয় লেখক পো-এর আদলেই গড়ে তুলেছেন। চার্লস ডেক্সটার ওয়ার্ডের মতো এই গল্পেও মন পালটানোর পিছনে আছে কথুলুর সমগোত্রীয় নিষিদ্ধ দেবতার আরাধনা।]
০১.
বিশ্বাস করুন, আমি খুনি নই!!
যদিও আমার প্রিয়তম বন্ধুর করোটির ভেতর ছ-ছ-টা গরম সিসের গুলি পুরে দিতে সেই মুহূর্তে আমার হাত কাঁপেনি, তবুও আমি পাঠককে অনুরোধ করব, আমার বয়ানটা যেন দয়া করে পড়েন। আমার ওপর অভিযোগের আঙুল ওঠার আগেই আমি নিজের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে যেতে চাই।
জানি, লোকে আমাকে পাগল ভাবছে। তবে সুধী পাঠক আমার পুরো ঘটনা পড়ার পর, সবরকম সম্ভাবনা নিক্তিতে বিচার করলে বুঝতে পারবেন, যে ভয়ংকরের মুখোমুখি আমি হয়েছিলাম, তার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এর চেয়ে শ্রেয় আর কিছু ছিল না।
হ্যাঁ– সেই আতঙ্ক নিজে এসেছিল আমার দুয়ারে আমার সঙ্গে দেখা করতে।
আমি নিজেই এখনও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছি– এখনও অনুধাবন করতে পারছি না, আমি এটা করলাম কীভাবে। যা জানতে পেরেছিলাম, তাতে হয়তো আমার বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। আমি তো আর জন্ম থেকে পাগল নই! লোকে এডওয়ার্ড আর অ্যাসেনাথ১৭৬ ডার্বির ব্যাপারে যে অদ্ভুত কথাগুলো বলছে, আমি বেশ বুঝতে পারছি, এই তুধোমুখো পুলিশগুলো অবধি সেটা উড়িয়ে দিতে পারছে না। এরা চেষ্টা করছে কয়েকটা মনগড়া, যুক্তিপূর্ণ গল্প খাড়া করে কেসটা ফাইল করার, কিন্তু তারাও মন থেকে জানে সত্যিটা কী অবিশ্বাস্য রকমের ভয়ানক।
আমি জানি, এডওয়ার্ডকে আমি হত্যা করিনি তাকে শাস্তি দিয়েছি। সেই সঙ্গে এই পৃথিবীকে উদ্ধার করেছি এক ভয়ানক অশুভশক্তির কবল থেকে। এটা আমি নিজের কর্তব্য বলে মনে করেছি। হে পাঠক, আপনারাও হয়তো এ ধরনের কিছু আপনার চারপাশে উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে নরকের অন্ধকার ছায়া তার করাল বাহু বিস্তৃত করতে চাইছে আমাদের এই সাধের দুনিয়ার দিকে। বুঝতে না পারলে কিছু করার নেই– কিন্তু টের পেলে, যে-কোনও মূল্যে তাকে রোধ করতে হয়।
নইলে অনেক অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
এডওয়ার্ড পিকম্যান ডার্বিকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমার থেকে বয়সে আট বছরের ছোট হলেও, এডওয়ার্ডের মানসিক বাড়বৃদ্ধি ছিল বিস্ময়কর। হয়তো সে জন্যই এই বয়সের তফাত আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনওরকম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার দুর্দান্ত মেধার স্ফুরণ ওই বয়স থেকেই ফুটে বেরুচ্ছিল তার লেখালেখির মধ্যে। গদ্য, কাব্য এবং গম্ভীর প্রবন্ধ রচনায় তার ব্যুৎপত্তি শিক্ষকদেরও চমকিত করেছিল। তার নিভৃতে পড়াশোনা করার ক্ষমতা এবং নিজের মধ্যে গুটিয়ে-থাকা স্বভাবটাই হয়তো তার এই প্রতিভার বিচ্ছুরণের কারণ। পরিবারের একমাত্র ছেলে সে, স্বাভাবিকভাবেই বাপ মায়ের নয়নের মণি। আদরের চোটে বেচারার শারীরিক বাড়বৃদ্ধি বড়ই ধীরস্থিরভাবে হয়েছিল তার মেধার মতো তার শরীর মোটেই চটপটে ছিল না। তা ছাড়া, সে যেখানেই যেত, পরিবারের নির্দেশে তার পেছনে কড়া নজর রাখত তাদের চাকর। সবার সঙ্গে খেলাধুলা করার অধিকারও ছিল না বেচারির। এই একাকিত্বই অবশ্য তাকে নিভৃতে চিন্তা করার অবকাশ দিয়েছিল আর সেই চিন্তার মধ্যে দিয়েই সে পেত মুক্তির স্বাদ।
