.
ইন্সমাউথের অভিজ্ঞতার পর আমি আমার পরিকল্পনা বদলাতে বাধ্য হই। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভূগোল… এসব নিয়ে আর মাথা ঘামানোর ইচ্ছে ছিল না আমার। মিসক্যাটনিক ইউনিভার্সিটি মিউজিয়ামে যেসব রহস্যময় গয়নাগাটি রাখা ছিল, সেগুলোকে তো আমি বিষবৎ এড়িয়ে যাই! তার বদলে, আর্কহ্যামে থাকাকালীন আমি একটু পড়াশোনা করে, আর স্থানীয় পণ্ডিতদের সাহায্য নিয়ে নিজের পরিবারের পুরোনো ইতিহাস জানার চেষ্টা করি। ওখানকার হিস্টরিক্যাল সোসাইটির কিউরেটর ছিলেন মিস্টার ই. ল্যাপহ্যাম পিবডি। আমি ওঁকে জানাই, আমি আর্কহ্যামের এলিজা ওর্নের নাতি, যাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৬৭ সালে, এবং মাত্র সতেরো বছর বয়সে যাঁর সঙ্গে ওহায়োর জেমস উইলিয়ামসনের বিয়ে হয়েছিল। এই কথাটা শুনেই পিবডি দারুণ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
কথায় কথায় জানা গেল, আমার এক মামা নাকি এভাবেই পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে আর্কহ্যামে এসেছিলেন। তিনিই খোঁজ নিয়ে জানেন যে, আমার দিদিমার বাবা বেঞ্জামিন অর্নে গৃহযুদ্ধের ঠিক পরেই বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বধূটির বংশপরিচয় খুঁজতে গিয়ে ব্যাপারটা জটিল হয়। কাগজে-কলমে মেয়েটি নিউ হ্যাঁম্পশায়ারের মার্শ পরিবারের এক অনাথ ছিল। পরিবারের সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ ছিল না। বস্টনের এক ব্যাংকে তার নামে একটা মোটা টাকা কেউ গচ্ছিত রেখেছিল। তা-ই দিয়েই ফ্রান্সে তার শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা হয়। এক ফরাসি গভর্নেস তার দেখাশোনা করতেন। নিউ হ্যাঁম্পশায়ার, এমনকী এসেক্স কাউন্টির মার্শদের মধ্যেও মেয়েটির বাবা এনখ বা মা লিডিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই আদালত একসময় সেই গভর্নেসকেই মেয়েটির অভিভাবক করে দিতে বাধ্য হয়। গভর্নেস মহিলা কারও কাছে পরিবারের ইতিহাস নিয়ে মুখ খোলেননি। তবে যাঁরা মেয়েটিকে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্য ছিল, মেয়েটির চোখ দেখেই বোঝা যায় যে সে মার্শ পরিবারের একজন। আমার দিদিমার জন্ম দিতে গিয়েই মেয়েটি মারা যায়।
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার ফলে মার্শ নামটা আমার কাছে বিভীষিকা হয়ে উঠেছিল। সেই পরিবারের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে জেনে আমি আর এই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে সাহস পাইনি। তার ওপর পিবডি একেবারে জোর দিয়ে আপনার চোখজোড়া দেখলেও কিন্তু মার্শদের কথা মনে হয়! বলায় আমি আরও চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। শেষ অবধি অর্নে পরিবারের ঠিকুজিকুষ্ঠি নোট করেই আমি আর্কহ্যাম ছাড়ি।
বস্টন হয়ে টলেডো, তারপর মাউমি–এই ছিল আমার পরবর্তী যাত্রাপথ। বিশ্রাম নিয়ে শরীর আর মন সারিয়ে নিই আমি। সেপ্টেম্বর থেকে জুন অবধি সময়টা কাটে পড়াশোনায়। এই সময়ের মধ্যে ইন্সমাউথ আমার মন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। শুধু মাঝেমধ্যে যখন সরকারি লোকজন কিছু প্রশ্ন নিয়ে আমার কাছে উদয় হত, তখনই ওই শহর, ওই সমুদ্র আর ওই বিভীষিকারা আমার কাছে ফিরে আসত। পরের জুলাইয়ে, মানে আমার অ্যাডভেঞ্চারের বর্ষপূর্তির সময়ে আমাকে ক্লিভল্যান্ডে যেতে হয় আমার মা-র পরিবারের কিছু আইনি ব্যাপারের জন্য। তখন, নিতান্তই দায়ে ঠেকে, আমাকে উইলিয়ামসন পরিবারের ইতিহাস নিয়ে আবার নাড়াচাড়া করতে হয়।
ওই পরিবারটা আমার কখনওই ঠিক সুবিধের লাগেনি। মা আমাকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করতেন। বিশেষত আমার দিদিমার চেহারায় এমন কিছু একটা ছিল, যেটা দেখলেই আমার খুব অস্বস্তি হত। আমার যখন আট বছর বয়স, তখন দিদিমা হারিয়ে যান। লোকে বলত, তাঁর বড় ছেলে ডগলাস, মানে আমার বড় মামা আত্মহত্যা করায় সেই শোকেই নাকি উনিও বিবাগী হয়ে গিয়েছিলেন। ডগলাসই ছিলেন আমার সেই মামা, যিনি নিউ ইংল্যান্ড হিস্টরিক্যাল সোসাইটিতে বেশ কিছু দিন কিছু একটা বিষয় নিয়ে গবেষণার পর আত্মহত্যা করেন।
আমার মনে পড়ল, ওই মামাটিকেও আমি বিশেষ পছন্দ করতাম না। না, ওঁর স্বভাবটা খুব ভালো ছিল। কিন্তু ডগলাসকেও দেখতে ছিল আমার দিদিমার মতোই। ওঁদের দু জনেরই একদৃষ্টিতে তাকানোর ধরনটা দেখলে আমার গা শিরশির করত। আমার মা আর ছোট মামা ওয়াল্টার কিন্তু তাঁদের বাবার মতো দেখতে ছিলেন। তবে ওয়াল্টারের ছেলে, আমার মামাতো ভাই লরেন্স আবার দিদিমার চেহারা পেয়েছিল। লরেন্স এখন বদ্ধ উন্মাদ। ওয়াল্টার মামার সঙ্গে আমার শেষ যা কথা হয়েছিল, তাতে জেনেছিলাম, লরেন্সের শরীরও নাকি খুব খারাপ হয়ে গেছে। কতটা খারাপ, সেটা উনি বলেননি, তবে ওকে নাকি আর লোকের সামনে আনা যায় না। এই শোকে ওয়াল্টারের স্ত্রী-ও বছর দুই আগে মারা গিয়েছিলেন। ফলে ক্লিভল্যান্ডের উইলিয়ামসন নিবাসের বর্তমান বাসিন্দা শুধু আমার বৃদ্ধ দাদু, আমার ছোট মামা, আর অনেক অনেক স্মৃতি।
পুরোনো কাগজ থেকে আমার যা জানার তা পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুরোনো বিবর্ণ ফোটোগুলোতে আমার দিদিমা আর মামাকে দেখে অন্য একটা চিন্তা আমার মাথায় চাপল। বহু বছর আগে যা শুধুই অস্বস্তি ছিল, এক বছর আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেটা নিশ্চিত আতঙ্কের চেহারা নিল। অর্নে পরিবারের দলিলপত্র হাতড়ে বুঝলাম, আমার মনের মধ্যে আতঙ্কের মেঘটা এবার ঘূর্ণিঝড়ের আকার নিচ্ছে। জানতাম, আমার বংশপরিচয়ের রহস্যটা উন্মোচিত হলে সেটা আমি হয়তো হজম করতে পারব না। তবু এই জিনিসের শেষ না দেখে আমি থামতে পারছিলাম না।
