দাদু একসময় বলেছিলেন, বিয়ের সময় বেঞ্জামিন অর্নে যৌতুক হিসেবে যেসব গয়নাগাটি পেয়েছিলেন, সেগুলো নাকি পারিবারিক ভল্টে রাখা আছে। তাদের ডিজাইন নাকি এমনই কুৎসিত, যে ওগুলো লোকের সামনে বের করা যায় না। আগে এই কথাটাকে গুরুত্ব দিইনি, কারণ গয়নার ডিজাইন নিয়ে আমার কস্মিনকালেও মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এইবার আমি ছোট মামাকে একরকম চাপ দিয়ে অর্নে পরিবারের ভল্ট খোলাই।
কাপড়ের আস্তরণ সরিয়ে গয়নাগুলো বের করার সময় ওয়াল্টার গজগজ করছিলেন। মণিকার, এমনকী পুরাতত্ত্ববিদরাও নাকি গয়নাগুলোর উৎস নিয়ে কিছু বলতে পারেননি। এদিকে নতুন বউয়ের অভিভাবক, আদতে গভর্নেস এক ফরাসি মহিলা নাকি ওগুলোকে নিউ ইংল্যান্ড এলাকায় পরতে বারণই করেছিলেন! এইসব গয়না লোকে কেন বানায়, বোঝা দায়– এটাই ছিল তাঁর বক্তব্য। তবে আমার দিকে মন ছিল না। কাপড়ের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা গয়নাগুলোর নকশা দেখতে দেখতে আমার মুখ বেঁকে যাচ্ছিল ভয়ে। সেটা দেখে ওয়াল্টার উদবিগ্ন হয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু আমি ওঁকে কাজটা চালিয়ে যেতে বলি। অবশেষে বেরিয়ে আসে একটা টায়রা। আর সেটার গায়ের নিপুণ, জটিল, উঁচু-হয়ে-থাকা নকশাগুলো দেখে আমার ঠিক সেই অবস্থাই হয়, যা হয়েছিল এক বছর আগে রোলি রোডের কাছে রেললাইনের খাতে শোয়া অবস্থায়।
আমি অজ্ঞান হয়ে যাই!
.
তারপর? তারপর আমার দিনরাত্রি মানে শুধু ভাবনা। সবসময় আমার মনে পড়ত জাডকের বলা একটা কথা। আর্কহ্যামের এক বাসিন্দাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, তাঁর সঙ্গে ওবেদ মার্শের এক মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই কথাটাকে কেন্দ্রে রেখে আমার মন একটা ভয়ানক জাল বোনে। তাতে সুতো হয় আমার দিদিমা, আমার মামা আর মামাতো ভাইয়ের পরিণতি, আর… অর্নে ভল্ট থেকে পাওয়া ওই যৌতুক!
তা-ও আমি এগুলোকে সমাপতন ভেবে ঠেকিয়ে রেখেছিলাম প্রায় দু-বছর ধরে। ইতিমধ্যে বাবা আমাকে একটা ফার্মে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে যথাসাধ্য মনোযোগ দিয়ে কাজকর্মও করছিলাম। কিন্তু ১৯৩০-৩১ সালের শীত থেকে আমি বিশেষ একটা স্বপ্ন দেখা শুরু করি। শুরুতে ওগুলো ছিল হালকা, অনেকটা ভোরের স্বপ্নের মতো। কিন্তু ক্রমে সেগুলো ঘন আর জটিল হতে থাকে।
কী দেখতাম আমি স্বপ্নে?
দেখতাম, জলের নীচে প্রকাণ্ড সব ধ্বংসস্তূপ আর শহর। সেই শহরের আনাচকানাচে বিচিত্র চেহারার মাছেদের সঙ্গে আমি সাঁতরে বেড়াচ্ছি। ক্রমে সেই স্বপ্নে অন্য চেহারাও দেখা দিতে শুরু করে। ঘুম ভাঙার পর সেই চেহারাগুলোর কথা ভেবে আমি ভয়ে শিউরে উঠতাম। অথচ স্বপ্নে আমি ওদের ভয় পেতাম না। মনে হত, ওদের মতো বিচিত্র গয়না বা শিরস্ত্রাণ পরে অতল জলে ঘুরে বেড়ানোই আমার ভবিতব্য।
আমার চেহারা খারাপ হতে শুরু করল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, চুম্বকের টানে লোহার মতো আমিও ওই স্বপ্নগুলোর টানে জাগর দুনিয়া ছেড়ে কল্পনার অতলে ডুবে যাচ্ছি। কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। ঘরবন্দি এক পঙ্গুর মতো জীবন শুরু হল আমার। তবে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতাম প্রায়ই। না, স্বেচ্ছায় নয়। আমার একটা অদ্ভুত রোগ হয়েছিল, যে জন্য আমি চোখের পাতা বন্ধ করতে পারতাম না। বাবা আমাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, আমিও নাকি দেখতে আমার দিদিমা বা ডগলাসের মতো হয়ে যাচ্ছি।
একরাতে আমি দিদিমাকে স্বপ্নে দেখলাম।
সমুদ্রের তলায় এক বিশাল প্রাসাদে ছিলেন মহিলা। তার বাগান তৈরি হয়েছে ছত্রাক জড়ানো প্রবাল দিয়ে। একটা সবুজেটে আভায় আলোকিত হয়েছে প্রাসাদের দেওয়াল, ছাদ, প্রতিটি ঘর। সেখানেই তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন।
দিদিমা বললেন, ডগলাস নাকি খোঁজখবর নিয়ে এই জায়গাটার সন্ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আসতে পারেননি এখানে। সাহস পাননি বলাই ভালো, কারণ নিতান্ত কাপুরুষের মতো আত্মহত্যা করেছিলেন ডগলাস। কিন্তু আমি পারব ওখানে আসতে। ওটাই নাকি আমার আসল জগৎ, যেখানে আমি অমর হয়ে থাকব।
দিদিমা আমাকে তাঁর পূর্বপুরুষদের কথাও বললেন। তিনি বললেন, ওই প্রাসাদ যেখানে আছে, সেই শহরের নাম রলিয়েহ। কোনও এক আদিম যুগে আরও শক্তিধর প্রাচীন দেবতাদের জাদু রলিয়েহ শহরকে জলের নীচে আটকে রেখেছে। কিন্তু একদিন ওঁরা ওপরে উঠবেন। সেদিন থেকে পৃথিবীতে আসবে এক নতুন যুগ। ইন্সমাউথ দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা একদিন শেষ হবেই।
আমার হঠকারিতায় ইন্সমাউথ শহরে ওঁদের বসতিটা নষ্ট হয়ে গেলেও তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। আসল ইন্সমাউথ আছে অনেক নীচে। তবে হ্যাঁ, আমার ওপর ওঁদের রাগ, অভিমান, দুঃখ– এসব আছে। আমাকে রলিয়েহ গিয়ে আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। যার সামনে আমাকে দাঁড়াতে হবে, তার চেহারাটা দেখে দারুণ ভয়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আয়নায় তাকিয়ে বুঝলাম, আমার মধ্যে ইন্সমাউথ লুক এসে গেছে!
না। আমি এখনও আত্মহত্যা করিনি। আর এই কথাগুলো আপনাদের জন্য লিখতে গিয়ে বুঝলাম, ওসব করার কোনও দরকারও নেই। আমার প্রথম কাজ হবে ক্যান্টনের সেই পাগলাগারদ থেকে লরেন্সকে উদ্ধার করা। তারপর আমরা দু-জনে যাব ইন্সমাউথ। মাটির ওপরে ওই মৃত শহর নয়, বরং ডেভিলস রিফ-এর ওপাশে জলের নীচে থাকা ইন্সমাউথ। তারপর… যা হওয়ার তা-ই হবে। হয়তো কোরালের সারির মাঝে অন্ধকার সরণী ধরে সাঁতার কেটে ইয়াহানথেলির পাথুরে প্রাসাদে আর সেই অতলের দেবতাদের রাজত্বে অমর হব। আবার অন্য কিছুও হতে পারে।
