দক্ষিণে আমি একটা নড়াচড়া দেখলাম। অতটা দূর থেকে জিনিসটা দেখা যাচ্ছে, এর একটাই অর্থ হয়। একটা বিশাল বড় দল আমার পিছু নিয়েছে। সেনাবাহিনীর কোনও ইউনিট নয়, বরং জন্তুদের একটা বিরাট দলের কথাই মনে হল তাদের উঠে-নেমে এগোনো দেখে আর গর্জন, ঘোঁত ঘোঁত– এসব শুনে। তাহলে কি ইন্সমাউথের সেইসব প্রাচীন বাসিন্দা, যাদের লুকিয়ে রাখা হয় লোকের নজর থেকে, তারাই আমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু এরা সব কি তাহলে মাটির নীচে, সুড়ঙ্গে, গর্তে… বা অন্য কোথাও লুকিয়ে ছিল? নাকি ডেভিলস রিফ থেকে হানা দিয়েছে এই বিরাট বাহিনী? কী চায় ওরা?
সবচেয়ে বড় কথা, তাহলে কি অন্য রাস্তাগুলোতেও নজরদারি শুরু হবে?
আমি ওই নিচু জায়গা দিয়ে নিঃশব্দে, সন্তর্পণে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ আঁশটে গন্ধের একটা ঢেউ আমার নাকে এসে লাগল। তাহলে কি হাওয়ার দিক বদলাল? নিশ্চয় তা-ই, কারণ গন্ধই শুধু নয়, ততক্ষণে শব্দরাও আমার কানে এসে পৌঁছোচ্ছে! বুঝতে পারলাম, রোলি রোড ধরে একটা দল এগোচ্ছে। যেহেতু ওই জায়গাটায় রোলি রোড রেললাইনটাকে প্রায় ছুঁয়ে তারপর আবার পশ্চিমে গেছে, তাই দলটা আমার সামনে দিয়েই যাবে! ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজের পাশাপাশি একটা অন্যরকম শব্দও আমার কানে আসছিল, যেন কোনও একটা প্রাণী থপথপ করে এগোচ্ছে। মনে হল, দূরে আমি যে বিরাট বাহিনীর অস্তিত্ব টের পেয়েছি, তাতেও যেন এমনই কেউ… বা কিছু আছে। কিন্তু নিচু ঝোপ আর বালিতে নিজেকে প্রায় গুঁজে দিয়ে সেই মুহূর্তে আমি শুধু একটাই কথা ভাবছিলাম।
ভাগ্যিস জন্তুজানোয়ার ইন্সমাউথের বাসিন্দাদের পছন্দ করে না। নইলে, যদি একটা কুকুর ওই দলে থাকত, তাহলে এতক্ষণে আমার খেল খতম হয়ে যেত। অবশ্য এই সাংঘাতিক গন্ধের মধ্যে কুকুরদের নাকও কাজ করত কি?
দলটা আমার সামনে একটা খোলা জায়গা দিয়েই পার হল। চাঁদের আলোয় লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার গা ঘিনঘিন করছিল। এই যদি ইন্সমাউথের বাসিন্দাদের অন্তিম চেহারা হয়, আর এই চেহারায় যদি এরা অমরত্বও পায়, কী অর্থ সেই জীবনের? ওদের শরীর থেকে বেরোনো গন্ধে আমার দম আটকে আসছিল। কণ্ঠস্বর নয়, বরং গলা আর নাক দিয়ে বের-করা নানা রকমের গর্জন আর ঘোঁত ঘোঁত দিয়ে ওরা ভাববিনিময় করছিল। মানুষের বদলে ওবেদ মার্শের দ্বারা আহূত দেবতাদের কাছাকাছি পৌঁছে-যাওয়া এই প্রাণীদের এত কাছ থেকে দেখাটাও একটা অভিশাপ। আমার মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছিল, তাই নিজের মাথা নিচু রেখেছিলাম। ভাগ্যিস! নইলে এরপর ওখান দিয়ে যে গেল, তাকে দেখলে আমি চুপ করে থাকতে পারতাম না।
আমি কি ভুল দেখেছিলাম? হতেই পারে। ইন্সমাউথে গোটা একটা দিন কাটিয়ে, জাডক অ্যালেনের ওইসব আখ্যান শুনে, তারপর অজ্ঞাত শত্রুদের হাত থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালাতে গিয়ে আমার স্নায়ুতে যে কতটা চাপ পড়েছিল, তা আমিই জানি। কিন্তু পরে যখন সরকার ওখানে তদন্ত চালিয়েছিল, তখন জানা গিয়েছিল, আমি ভুল দেখিনি।
কী দেখেছিলাম আমি?
আমি একঝাঁক অদ্ভুত প্রাণীকে সারিবদ্ধভাবে এগোতে দেখেছিলাম। তাদের মাথায় আর গলায় ছিল বিচিত্র গড়নের গয়না বা শিরস্ত্রাণ। কিন্তু তারা হাঁটছিল না, বরং লাফিয়ে বা পিছলে এগোচ্ছিল। মানুষের মতো দ্বিপদ চেহারা ছিল ওই প্রাণীদের। কিন্তু তাদের চকচকে, সবজেটে শরীর, পিঠে খাঁজকাটা ভাব, মুখের দু-পাশের ফোলা কানকো আর সাদা পেট… এগুলো মাছ, ব্যাং, সরীসৃপ– এই তিন ধরনের প্রাণীকেই মনে করায়।
সৃষ্টির কোন পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল এই প্রাণীরা? তখন পৃথিবী কি নরক ছিল, না স্বর্গ? জানি না, তবে ওই প্রাণীদের আমি চিনতে পারলাম। নিউবারিপোর্টের মিউজিয়ামে সেই টায়রাটার গায়ে এদের ছবিই তো নকশা করে আঁকা ছিল।
সংখ্যায় ওরা কত ছিল? অগুনতি! আমি যাদের দেখেছিলাম, সেই বিরাট সংখ্যাও নিশ্চয় ওদের মোট সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। তবে আমি আর ওইসব ভাবতে পারিনি। ইন্সমাউথে আসার পর অনেক কিছু দেখেও আমি অনড় ছিলাম। কিন্তু সেই সময় আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম।
.
০৫.
বৃষ্টির ছাট যখন আমার ঘুম ভাঙাল, তখন দিনের আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। নিচু খাত থেকে সাবধানে বেরিয়ে আমি চারপাশে দেখলাম। না, কোনও সাম্প্রতিক পায়ের ছাপ বা দাগ দেখিনি। দূরে তাকিয়ে ইন্সমাউথের জনহীন পরিত্যক্ত বাড়িঘর দেখতে পেলাম, তবে একটাও শব্দ শুনতে পেলাম না। এমনকী আঁশটে গন্ধটাও মনে হল যেন কম লাগছে। ঘড়ি দেখে বুঝলাম, বেলা দুটো বাজে।
খিদেয়, তেষ্টায়, ক্লান্তিতে শরীর ঝিমঝিম করছিল। কিন্তু ইন্সমাউথ থেকে যথাসম্ভব দূরে যাওয়ার ইচ্ছেটা এতই জোরালো ছিল যে, আমি ওসব পাত্তা দিইনি। রোলি রোড ধরে টানা হেঁটে আমি সন্ধের মধ্যে একটা গ্রামে পৌঁছেই। সঙ্গে যা টাকাপয়সা ছিল তা-ই দিয়ে খাদ্য, পানীয় এবং নতুন এক সেট পোশাক জোগাড় করতে অসুবিধে হয়নি। সেই রাতের ট্রেনেই আমি আর্কহ্যাম পৌঁছেই। প্রথমে সেখানে, তারপর বস্টনে, তারপর আরও বেশ কয়েক জায়গায় সরকারি দফতরগুলোতে গিয়ে আমি যা দেখেছি আর জেনেছি, তার বিবরণ দিই। তার ফলে কী হয়েছিল তা সবাই জানে। সেই কথাগুলো বলেই আমি এই লেখা শুরু করেছি।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ হলে সবচেয়ে ভালো হত, তা-ই না? কিন্তু বাস্তব আমার আপনার ইচ্ছেমতো চলে না।
