আশপাশটা আবার ফাঁকা হয়ে গেলে আমি লাফায়েত স্ট্রিট, আর তারপর ইলিয়ট স্ট্রিট প্রায় দৌড়েই পেরোলাম। সাউথ স্ট্রিট এড়ানো অসম্ভব বুঝে আমি চেষ্টা করলাম আগের মতোই ঘষটে ঘষটে জায়গাটা পেরোতে। আমার কপাল খুবই ভালো ছিল বলে টাউন স্কোয়্যারের দিক থেকে কোনও দল সেই মুহূর্তে ওখানে আসেনি, নইলে…! জায়গাটা নিরাপদে পেরিয়ে আমি আবার জলের ধারে এসে পড়লাম। আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমি অন্যদিকে নজর সরাতে পারলাম না। সমুদ্র আমার নজর টেনে নিল।
না, সমুদ্রে কোনও জাহাজ ছিল না। তবে একটা দাঁড়-টানা নৌকোকে আমি দেখলাম পরিত্যক্ত জেটিগুলোর দিকে যেতে। মনে হল, নৌকোয় কেউ, বা কিছু একটা জিনিস ঢাকা দিয়ে রাখা রয়েছে। যারা দাঁড় টানছিল, তাদের চেহারায় একটা বীভৎসতা ছিল। নৌকোর আশপাশে বেশ কিছু সাঁতারুকেও দেখলাম। দূরে ডেভিলস রিফ-এ তখন একটা মৃদু, কিন্তু স্থির আলো জ্বলেছিল। আলোটার রং আমার কাছে অজানা। উলটোদিকে গিলম্যান হাউসও তখন একদম অন্ধকার।
রাস্তাটা পুরোপুরি পার হওয়ার আগেই জোরালো গুঞ্জন শুনলাম। দেখলাম, উত্তরদিক থেকে ওয়াশিংটন স্ট্রিট ধরে একটা বড় দল এগিয়ে আসছে। চাঁদের আলো খুব স্পষ্ট ছিল বলেই লোকগুলোর চেহারার বিকৃতি আমার নজর এড়াল না। শুধু মুখের গড়ন নয়, কয়েকজনের শরীর দেখে মনে হচ্ছিল, তাতে বাঁদর আর ব্যাং, দুয়ের মিশ্রণ ঘটেছে! ওই দলেই আমি আলখাল্লা-পরা, মাথায় টায়রা-চড়ানো একজনকেও দেখলাম। মনে হল, এই দলটাই গিলম্যান হাউসে আমার সন্ধানে হানা দিয়েছিল। ঠিক তখনই ওদের একজন আমার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য আমি ওখানেই থমকে গিয়েছিলাম। তবে মাথা ওই অবস্থাতেও কাজ করছিল। যথাসাধ্য স্বাভাবিকভাবে, একজন স্থানীয় লোকের মতো করেই আমি হেঁটে জায়গাটা পেরোলাম। আমার নকলনবিশি নির্ঘাত জবরদস্ত ছিল, কারণ দলটা আমাকে উপেক্ষা করে, নিজেদের মধ্যে কোনও বিজাতীয় ভাষায় কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেল।
অন্ধকারে আমি আবার ছোটা আর হাঁটার মাঝামাঝি গতিতে এগোতে থাকলাম। বেটস স্ট্রিটে দুটো বাড়ি দেখে বুঝলাম, তাতে তোক থাকে। তবে আমার নিঃশব্দ পদসঞ্চার কারও ঘুম ভাঙায়নি। অ্যাডামস স্ট্রিটে পৌঁছে আমি নিজেকে একটু নিরাপদ মনে করছিলাম। কিন্তু তখনই একটা বিপর্যয় হতে যাচ্ছিল। একটা অন্ধকার দরজা থেকে একজন বেরিয়ে একেবারে আমার সামনেই পড়েছিল। আবার ভাগ্য প্রসন্ন হল। লোকটা মদের নেশায় এমনই টলমল অবস্থায় ছিল যে, ও আমার উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই আমি ব্যাংক স্ট্রিটের ভাঙা গুদামগুলোর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম।
নদীখাতের পাশের রাস্তাটা তখন একেবারে শুনশান। জলের গর্জনে আমার পায়ের শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছিল। গুদামগুলোর অন্ধকারে কী থাকতে পারে ভাবলে হাত-পা অচল হয়ে যেতে পারে ভেবে আমি মাথাটা ফাঁকা রাখার চেষ্টা করছিলাম। স্টেশনটার আলোছায়া ধ্বংসস্তূপে আমি দাঁড়ালাম না, সোজা রেললাইন ধরে এগোতে শুরু করলাম। জং-ধরা লাইনগুলো ঠিক থাকলেও তাদের মাঝের পাটাতন আর জয়েন্টগুলো খুলে এসেছিল। ওইরকম লাইন ধরে হাঁটা ভয়ানক বিপজ্জনক। কিন্তু ওসব ভাবার অবস্থা ছিল না। নিচু হয়ে, নদীখাত একপাশে রেখে আমি রেললাইনের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ঢাকা ব্রিজটার কাছে পৌঁছোলাম। যদি রেল ব্রিজটা আমার শরীরের ভার নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকে, তাহলে আমি ওটা পেরিয়ে ওদিকে যাব। নইলে আমাকে একটা রাস্তা খুঁজতেই হবে ওদিকে যাওয়ার।
চাঁদের আলোয় যত দূর বুঝলাম, তাতে সামনের দিকে কয়েকটা জয়েন্ট আমার ভার নেওয়ার অবস্থায় ছিল। কিছুটা এগিয়ে আমাকে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতেই হল। তাতে আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় বাদুড়দের একটি বিরাট দল বিরক্ত হয়ে ব্রিজের ছাদ থেকে নেমে আসে। তাতে চমকে গিয়ে আমি আর-একটু হলেই ব্রিজ থেকে নীচে পড়ছিলাম। শেষ অবধি আমার কিছু হয়নি। সাবধানে জয়েন্টে পা রেখে, কয়েক জায়গায় লাফিয়ে ভাঙা অংশ পেরিয়ে আমি যখন ওপাশে পৌঁছে চাঁদের আলোয় দাঁড়ালাম, তখন এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে নিরাপদ মনে হল।
রিভার স্ট্রিটের একধার দিয়ে গিয়েছিল রেললাইন। কিছুটা এগিয়েই আমি বুঝলাম, ইন্সমাউথের ওই ভয়ানক আঁশটে গন্ধের এলাকা ছাড়িয়ে আমি সত্যিকারের গ্রামীণ এলাকায় ঢুকছি। কাঁটা আর ঝোপঝাড়ে আমার পোশাক ছিঁড়ে যাচ্ছিল ঠিকই। তবে আমি জানতাম, রোলি রোড থেকে তাকালেই আমাকে দেখা যাবে, যদি না এই ঝোপঝাড় আমাকে লুকিয়ে রাখে। একটু পরেই জলাজমি শুরু হল। তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক জায়গায় রেললাইনটা নিচু একটা খাতের মধ্য দিয়ে গেছে। জায়গাটা কাঁটাগাছ আর বুনো লতায় ভরতি। আমি আবার নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলাম, কারণ রোলি রোড ওই জায়গাটার একেবারে লাগোয়া। নিচু খাতের মধ্য দিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেলে রোলি রোড, এবং নজরদারদের থেকে দূরে চলে যেতে পারব আমি।
জায়গাটাতে ঢোকার আগে আমি পেছনে তাকালাম। না, কেউ আমাকে অনুসরণ করছিল না। এক মুহূর্তের জন্য ইন্সমাউথের ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর দিকে আমার চোখ গেল। মনে হল, এখন অভিশপ্ত হলেও একসময় শহরটা সত্যিই সুন্দর ছিল। চোখটা নামাতে গিয়েই অত্যন্ত অসুন্দর কিছুতে আমার চোখ আটকে গেল।
