ঠিক কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্য নিয়ে শহরে এত রাতেও আলোড়ন চলছে, বুঝতে পারছিলাম না। যদি আমাকে খুঁজে বের করাই এসবের লক্ষ্য হত, তাহলে অন্যরকম হত ব্যাপারটা। তবে আমি শহরটা ছেড়ে বেরোতে চাইছিলাম শুধু। আমি জানতাম, ধুলোয় আমার পায়ের দাগ থেকে সহজেই বোঝা যাবে, কীভাবে আমি গিলম্যান হাউসের চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। তাই আমার পেছনে একটা বড় দলের লেগে পড়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
আমি বিনা ঝামেলায় জায়গাটা পার হচ্ছিলাম। ওখানে একটা পার্ক আছে, যেটা দিনের বেলায় সেভাবে খেয়াল করিনি। কিন্তু চাঁদের আলোয় ওই নিষ্প্রাণ সবুজটুকুও অন্যরকম হয়ে উঠেছিল। ওখান থেকে একদিকে টাউন স্কোয়্যার। শুনতে পাচ্ছিলাম, সেদিক থেকে একটা জোরালো গুঞ্জন উঠছে। ভাবছিলাম, ওদিক থেকে কেউ যদি এইদিকে তাকাইয়, তাহলে ধু-ধু ফাঁকা রাস্তায় আমাকে একেবারে স্পষ্ট দেখা যাবে। সন্দেহ হতেই পারে কারও, তখন….
কিন্তু এই দুশ্চিন্তার পৃথিবী থেকে দু-দণ্ডের জন্য আমাকে সরিয়ে নিল সমুদ্র। চাঁদের আলোয় তার সফেন সৌন্দর্য দেখে আমি সব ভুলে গেলাম। অলসভাবে ওখানে আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম, জানি না। তবে আমার খোয়াব চুরমার হল অন্য একটা জিনিসে।
দূরে ডেভিলস রিফ-এর কালো রেখার ওপর কয়েকটা আলোর ঝলক দেখলাম।
বিদ্যুৎচমকের মতো আমার খেয়াল হল, কী ভয়ানক বিপদের মাঝে রয়েছি আমি। আপনা থেকেই আমার নজর ঘুরে গেল স্কোয়্যার-লাগোয়া গিলম্যান হাউসের দিকে।
গিলম্যান হাউসের ছাদ থেকেও ভেসে এল আলোর বেশ কয়েকটা ঝলক! আমার জ্ঞানগম্যি খুব একটা বেশি নয়। তবে এটা যে সিগনাল বিনিময় হল, সেটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল। কীসের সিগনাল, সেই নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমার তখন কাজ ছিল নিজেকে সামলানো। আমার শরীর, মন, প্রবৃত্তি প্রবলভাবে বলছিল, পালাও! পালাও! কিন্তু আমি জানতাম, দৌড়োতে গেলেই আমি ধরা পড়ে যাব শত্রুদের হাতে। সেই ঘষটে ঘষটে হাঁটা আর ছোটার মাঝামাঝি ভঙ্গিতে এগোনোর অবস্থা আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে তার মধ্যেও আমাকে ডেভিলস রিফ-এর দিকে নজর রাখতে হচ্ছিল। মন বলছিল, নরকের ওই দরজা দিয়ে আজ রাতে বিশেষ কেউ উঠে আসতে পারে, হয়তো আমার খোঁজে!
লনের মতো ঘেরা জায়গাটা পার হয়ে আমি স্বাভাবিকভাবেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি একটা জিনিস দেখতে পেলাম।
রিফ আর সমুদ্রতটের মাঝের জল ফাঁকা নয়! সেখানে জেগে উঠেছে অজস্র মাথা। কিন্তু তাদের গড়ন, আর যে ভঙ্গিতে তারা সাঁতরে আসছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা মানুষ নয়।
আমি পাগলের মতো দৌড়োলাম। একটা ব্লক পেরিয়ে বুঝতে পারলাম, আমার সন্ধানে একাধিক দল বেরিয়ে পড়েছে। ফেডারেল স্ট্রিট ধরে দক্ষিণে এগোলাম যত দ্রুত সম্ভব। আওয়াজ পেতেই একটা ভাঙা বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। বাইরে থেকে আসা আওয়াজ, হইচই, কয়েকটা গাড়ির এদিক-ওদিক যাওয়ার গর্জন– এগুলো থেকে বুঝতে পারছিলাম, ইন্সমাউথ থেকে বেরোনোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে!
দারুণ হতাশায় আমার শরীর-মন নুয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, তাহলে কি এখানেই, এভাবেই আমি শেষ হব? ইন্সমাউথের এই ভাঙা বাড়িটাই কি তাহলে আমার জীবনের শেষ স্টেশন?
স্টেশন!
অন্ধকার রাতে বিদ্যুৎ ঝলসালে যেমন সব কিছু সাদা আর স্পষ্ট হয়, ঠিক সেভাবেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল রোলির দিকের ব্রাঞ্চ রেললাইন! পাথর, ঘাস, আগাছা আর কাঁটালতায় ভরা ওই লাইনটা দিয়ে শহর ছেড়ে পালানোর কথা কেউ ভাববে না। তাই হয়তো ওই রাস্তাটা বরাবর পাহারা থাকবে না। হোটেলের জানলা দিয়ে যা দেখেছি, তাতে এটা স্পষ্ট যে রোলি যাওয়ার রাস্তা, বা গিলম্যান হাউসের মতো উঁচু বাড়ি থেকে রেললাইনটা অনেক দূর অবধি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কিন্তু আমি যদি লাইনের পাশের ঝোপঝাড় দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোই তাহলে হয়তো…!
সাবধানে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নকশাটা দেখলাম। বুঝতে পারলাম, ব্যাবসন স্ট্রিট ধরে সোজা গিয়ে, তারপর লাফায়েত স্ট্রিট ধরে এগোতে হবে আমাকে। তারপর বেটস, অ্যাডামস, এবং অবশেষে ব্যাংক স্ট্রিট ধরে এগোলে আমি নদীখাত একপাশে রেখে পরিত্যক্ত স্টেশনটায় পৌঁছোব। এভাবে গেলে আমি ওই খোলা জায়গাটা আর সাউথ স্ট্রিটের বিশাল চওড়া এলাকাটা এড়িয়ে যেতে পারব। বেরিয়ে পড়লাম তারপরেই।
ফেডারেল স্ট্রিট থেকে আওয়াজ আসছিল। রাস্তার মোড় ঘুরতে গিয়ে বুঝলাম, যে বাড়িটায় আমি সাময়িক আশ্রয় পেয়েছিলাম, সেটার কাছেই আলো নিয়ে একটা দল ঘোরাঘুরি করছে। ব্যাবসন স্ট্রিটের কোণে একটা বাড়ির জানলায় পর্দা দেখে বুঝলাম, সেখানে লোকজন থাকে। তবে বাড়িটা অন্ধকার ছিল, আমিও নির্বিঘ্নেই জায়গাটা পেরিয়ে এলাম। ভাঙা বাড়িগুলোর ছায়ায় নিজেকে মিশিয়ে এগোনোর সময় বেশ কয়েকটা দলকে দেখলাম ইলিয়ট স্ট্রিট হয়ে ইউইচের দিকে যাওয়ার রাস্তায় উঠতে। একটা দল কাছে আসামাত্র আঁশটে গন্ধে আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। সেই দলে দু-জনের সর্বাঙ্গ আলখাল্লায় ঢাকা ছিল। একজনের মাথায় একটা উঁচু গয়না বা মুকুট চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছিল। তবে আমার আতঙ্কের মাত্রাটা বেড়ে গিয়েছিল একটাই কারণে। মনে হচ্ছিল, আলখাল্লার আড়ালে ওই প্রাণী দুটি হাঁটছিল না, থপথপিয়ে লাফাচ্ছিল।
