এই হোটেলে আমার অন্তিম গন্তব্য যে ঘরটা, সেটার দরজায় চাবি ঢোকানোর আওয়াজ পেলাম আমি।
তখনও আমি ওই ঘরে যাওয়ার দরজাটা খুলতে পারিনি৷ যদি পাল্লা না-ও দেওয়া থাকে, তা-ও ওটা ভাঙতে আমার কিছুটা সময় লাগবেই। কিন্তু তার মধ্যে তো ওই ঘরে ঢুকে পড়বে আমার শত্রুরা! যে ঘরে এখন আমি আছি, সেটাতে তো জানলাও নেই। তাহলে? একরকম গা-ছাড়া ভঙ্গিতেই আমি পাশের ঘরে যাওয়ার দরজাটা আলগাভাবে ঠেলোম।
দরজাটা খুলে গেল!
আমি কিছু ভাবিনি। যখন আমি ওই ঘরে ঢুকেছি, তখন করিডরের দিকের দরজাটা খুলে যাচ্ছে। তবে যে ওটা খুলছিল, সে বোধহয় ভাবতে পারিনি, আমি ইতিমধ্যেই ওখানে এসে যাব। তাই আমি যখন দরজাটার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটাকে ঠেলে বন্ধ করলাম, তখন সে বাধা দিতে পারেনি। দরজা বন্ধ করে, পাল্লাটা টেনে দিলাম। তারপর খাট আর আলমারি টেনে ঘরের দুটো দরজাকেই দুর্ভেদ্য করলাম। দুটো দরজার ওপরেই হামলা শুরু হয়েছিল। তবে আমি জানতাম, স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে আমি পেইন স্ট্রিটে পৌঁছোতে পারব। পাশের বাড়ির ছাদটা এমনই ঢালু যে, ওতে লাফালে পা পিছলে যেতে পারে। একটু ভেবে আমি একটা জানলা বাছলাম, যেখান থেকে লাফিয়ে ছাদে পড়ে একটু গেলেই একটা ভাঙা স্কাইলাইট পাওয়া যাবে। ওটা দিয়ে আমার পক্ষে নীচে, রাস্তায় পৌঁছোনো সম্ভব হবে।
ঘরটা ভালোভাবে দেখে বুঝলাম, আমার ভাগ্য সত্যিই ভালো। জানলার ওপরে ভারী পর্দা আর পর্দা ঝোলানোর স্ট্যান্ড আছে। জানলাটাকে বাইরে খুলে রাখার জন্য ছিটকিনির মতো আংটাও আছে বাইরের দেওয়ালে। ততক্ষণে ঘরের দরজার কাঠ ভেঙে পড়ছে, কিন্তু খাট আর আলমারি আমার শত্রুদের ঠেকিয়ে রেখেছে। সেই অবস্থাতেও মাথা ঠান্ডা রেখে আমি পর্দা সমেত স্ট্যান্ড টেনে নামালাম। সেটাকে বাইরের আংটায় খুঁজে আমি নীচে নামার মতো একটা দড়ির সিঁড়ি টাইপের জিনিস বানালাম। তারপর ওটা ধরে নীচে ঝুলে, পাকাপাকিভাবে ছাড়লাম আমি।
খাড়া ছাদে লাফিয়ে নামলেও ভারসাম্য রাখতে পেরেছিলাম। দেখলাম, ঘরের জানলা অবধি তখনও পৌঁছোতে পারেনি কেউ। তবে দূরে অর্ডার অব ডেগন আর অন্য চার্চগুলোয় আলো জ্বলছে। স্কাইলাইট থেকে লাফিয়ে নীচে নেমে ধুলো আর ইট-পাটকেল, ভাঙা পিপে –এসবের স্কুপের মধ্যে পড়লাম, তবে তাতে আমার হাত-পা ভাঙেনি। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় ঘড়ি দেখে বুঝলাম, রাত দুটো বাজে। পেইন স্ট্রিটের দিকের দরজাটা খুঁজে পেলেও আমি ওদিকে গেলাম না। বরং উলটোদিকের অন্ধকার চাতাল দিয়ে ওয়াশিংটন স্ট্রিটে যাওয়াটাই আমার কাছে বেশি নিরাপদ মনে হল।
চাতালে চাঁদের আলো তখনও পৌঁছোয়নি। তবে অন্ধকারে চোখ সয়ে গিয়েছিল। ওয়াশিংটন স্ট্রিটের দিকে পরপর বেশ কয়েকটা দরজা আধভাঙা বা খোলা ছিল। আমি তাদের একটা দিয়ে ঢুকে দেখলাম, একটা অন্ধকার হলঘরে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু রাস্তার দিকের দরজাটা দেখলাম, একেবারে তক্তা আর পেরেক দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশের দরজাটা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করতে যাব বলে আবার চাতালের দিকে আসছিলাম। কিন্তু বেরোনোর মুখেই থেমে গেলাম।
গিলম্যান হাউস থেকে ওখানে বেরিয়ে এসেছে একটা বেশ বড়সড় দল। চাঁদের আলো না এলেও সেই দলের লোকেদের চেহারা বোঝা যাচ্ছে। তবে তার চেয়েও স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে আলখাল্লা দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢাকা, অদ্ভুত গড়নের শিরস্ত্রাণ পরে থাকা একজনের চেহারা!
প্রায় দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ওদের ভাবসাব দেখে মনে হল, আমি কোথায় আছি, সেই সম্বন্ধে ওদের কোনও ধারণা নেই। তবে চাতালে বেরোনো যাবে না আর। কিন্তু এই অন্ধকার হলঘরেও কি আমি নিরাপদ? ওই প্রাণীটির শরীর থেকে বেরিয়ে-আসা আঁশটে গন্ধের ঢেউ আমার মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিল। ওখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে আমি অজ্ঞানই হয়ে যেতাম। হঠাৎ খেয়াল হল, একটা জানলায় লাগানো বোর্ডের নীচটা ফাঁক হয়ে আছে। ঝটপট ওখানে গিয়ে আমি কাজে লেগে পড়লাম। গোটা দুই পেরেক খুলে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। আমার চেষ্টায় আরও একটা খুলে গেল। নিঃশব্দে তাটা সরিয়ে আমি জনমানবহীন ওয়াশিংটন স্ট্রিটে বেরিয়ে এলাম। তারপর তক্তাটা সযত্নে, বরং আগের চেয়ে একটু ভালোভাবেই জায়গামতো ফিট করে, আমি দক্ষিণদিকে এগোলাম। ততক্ষণে দূরে দূরে আমি গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমাকে খুঁজে বের করার জন্য অনেকগুলো দলকে কাজে লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিছু আওয়াজ শহরের দক্ষিণ থেকেও আসছিল, তবে আমি ওই নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমি জানতাম, এই শহরে এতই ফাঁকা আর ভাঙা বাড়ি আছে যে, আমি ওদের নজর এড়িয়ে যেতে পারব। রাস্তায় আলো জ্বলছিল না। এটা অন্য সময় হলে বাজে লাগত, তবে তখন অন্ধকার আমার কাছে খুব জরুরি ছিল।
ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর গা ঘেঁষে যত দ্রুত সম্ভব হাঁটছিলাম। আমার চেহারা উশকোখুশকো হলেও এমন কিছু অস্বাভাবিক ছিল না, যা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তবে আমি ঝুঁকি নিতে চাইছিলাম না। বেটস স্ট্রিটের কাছে দু-জনকে আসতে দেখলাম, যাদের হাঁটাটা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। আমি তৎক্ষণাৎ পাশের একটা ভাঙা দরজার আড়ালে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু এরপরেই এল একটা চওড়া জায়গা, যেখানে ইলিয়ট স্ট্রিট আর ওয়াশিংটন স্ট্রিট কাটাকুটি খেলেছে। নকশা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা, কারণ এখানে চাঁদের আলো পড়বে একেবারে সোজাসুজি। কাছেপিঠে কোনও বাড়িঘর না-থাকায় আমার পক্ষে লুকোনোও সম্ভব ছিল না। আবার জায়গাটা এড়িয়ে যেতে গেলেও এত ঘুরতে হবে, যার অন্য বিপদ আছে। তাই আমি স্থানীয় মানুষদের হাঁটার ভঙ্গি অনুকরণ করে, যথাসাধ্য স্বাভাবিকভাবে জায়গাটা দিয়ে হাঁটলাম।
