কিন্তু আমার পক্ষে নিশ্চিন্ত হওয়া অসম্ভব ছিল। তা ছাড়া মন বলছিল, এই শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে নিরস্ত্র অবস্থায় আমার জেতার কোনও সম্ভাবনা নেই। আমাকে পালাতে হবে। সামনের দরজা বা সিঁড়ি দিয়ে নয়, অন্য কোনও পথে। এখনই!
আমার লক্ষ্য ছিল ব্যাগটা রেখে, স্রেফ জরুরি কয়েকটা জিনিস নিজের সঙ্গে নিয়ে পালানো। লাইটের সুইচ টিপলেও আলো জ্বলল না। বুঝতে পারলাম, আমাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। কী করব ভাবছিলাম, কিন্তু তখনই নীচের তলায় বেশ কয়েকটা গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেগুলোর ওঠানামা থেকে গলার আওয়াজ বলেই মনে হয়। তবে মানুষের গলায় ওইরকম আওয়াজ…? বেশি ভাবার সময় ছিল না আমার কাছে। ফ্ল্যাশলাইটের সাহায্যে নিজের পকেটে জরুরি কিছু জিনিস ভরে নিলাম।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, সরকারি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও হোটেলে কোনও ফায়ার-এসকেপ নেই। লাফালে তিনতলা নীচের উঠোনে পড়ে হাড়গোড় ভাঙবেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝলাম, আমার থেকে দুটো ঘর পরে একটা জানলা দিয়ে লাফালে পাশের একটা বাড়ির নিচু আর ঢালু ছাদের নাগাল পাওয়া যাবে।
কিন্তু ওই ঘর অবধি যাব কীভাবে? করিডরে বেরোনো যাবে না, কারণ তাহলেই নীচে আমার শত্রুরা আওয়াজ পেয়ে যাবে। একমাত্র উপায় হল ঘরের মাঝের দরজাগুলো। সেগুলো যদি এমনি বন্ধ করা থাকে, তাহলে ধাক্কা দিয়ে ভাঙা যাবে, কারণ হোটেলটার সব কিছুই জরাজীর্ণ। কিন্তু আমার মতো করে সেগুলোতেও যদি কেউ পাল্লা লাগিয়ে থাকে? ওসব ভেবে লাভ নেই। আর এই কাজ নিঃশব্দে করাও যাবে না। তাই আমাকে গতির ওপর নির্ভর করতে হবে, যাতে শত্রুরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক ঠিক দরজাটা খোলার আগেই আমি গিলম্যান হাউস থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।
আমি জানতাম, আমার পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া, মোটামুটি অক্ষত দেহে পাশের বাড়ির ছাদে পৌঁছোতে পারলেও নীচে নামা কঠিন। নেহাত, পাশের বাড়িগুলো একেবারে পরিত্যক্ত মনে হচ্ছিল। গোটা এলাকাতেই খুব বেশি জনপ্রাণী আছে বলে মনে হচ্ছিল না। তাই যা-থাকে-কপালে ভেবে আমি তৈরি হলাম। অন্ধের যষ্টির মতো ম্যাপটা দেখে ঠিক করলাম, শহর ছেড়ে বেরোনোর সেরা রাস্তা দক্ষিণদিকে যাওয়া। পথে কী কী বিপদ আসবে, সেই নিয়ে ভাবিনি, কারণ ভেবে কোনও লাভ হত না।
আমি আওয়াজ না করে একটা আলমারি নিজের দরজাটার সামনে আনলাম, যাতে ওটা ভাঙতে একটু বেশি কষ্ট হয়। দক্ষিণমুখো যে ঘরটা আমার লাগোয়া, সেটার দরজা পরীক্ষা করে বুঝলাম, ওটা আমার দিকেই খোলে। ওটা ভেঙে পাশের ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই, বরং ওটার সামনে আমার খাটটা যথাসম্ভব নিঃশব্দে এনে রাখলাম। উত্তরদিকের ঘরের দরজাটা ওই ঘরের দিকে খোলে। চাপ দিয়ে বুঝলাম, ওটা পাল্লা দিয়ে আটকানো আছে। কিন্তু তবু এটা আমার কাছে স্পষ্ট হল, আমাকে ওখান দিয়েই বেরোতে হবে। প্রথমে পাশের ঘর, সেখান থেকে তার পাশের ঘর, সেখান থেকে পাশের বাড়ির ছাদ, সেখান থেকে পেইন স্ট্রিট, আর সেখান থেকে ওয়াশিংটন স্ট্রিট। দমকলের দফতরটা সারারাত খোলা থাকতে পারে, তাই সেটাকে পাশ কাটাতে হবে। নইলে আমাকে কেউ দেখে ফেলতে পারে।
চাঁদ উঠছিল। সেই আলোয় বাইরে নিচু আর নোংরা ছাদের সমুদ্রও ঝকমকিয়ে উঠছিল। তার ওপাশে মানুক্সেটের খাত, পরিত্যক্ত কারখানা, ভাঙাচোরা রেল স্টেশন, জং-ধরা আর আগাছায় ঢাকা রেললাইন, ঝোপঝাড়ে ভরা জমি শেষ হয়ে শুরু হওয়া জলা– এগুলো ওই সাদা আলোয় কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছিল। আর্কহ্যামের দিকে যাওয়ার কোনও রাস্তাই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে উত্তরে ইন্সউইচের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য চিন্তায় পড়ে গেলাম।
তাহলে কি উত্তরদিকে যাওয়াই ঠিক হবে? এর বেশি কিছু ভাবার সুযোগ পেলাম না, কারণ তখনই আমার কানে এল একটা অন্যরকম শব্দ। একটা ভারী পায়ের শব্দ শুনলাম, যা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। তার পেছনে একটা গুঞ্জনও উঠছে, যেন বেশ কিছু লোক উত্তেজিতভাবে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে কাউকে। কিছুক্ষণ পরেই আমার ঘরের দরজায় একটা জোরালো নক করল কেউ।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি একদম অনড় হয়ে গেলাম। পরমুহূর্তেই একটা তীব্র আঁশটে গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠল। ওতেই আমার মাথা আবার কাজ করতে শুরু করল। দরজায় আওয়াজটা জোরালো হল। বুঝতে পারলাম, ভাবাভাবি পরে হবে, এবার চাই অ্যাকশন! উত্তরদিকের দরজার পাল্লা সরিয়ে নিজের পুরো জোর দিয়ে দরজাটা ভাঙতে চেষ্টা করলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, দারুণ জোরে দরজাটা যে পেটাচ্ছে, তার আওয়াজেই আমার দরজা ভাঙার শব্দ ঢাকা পড়বে।
সর্বাঙ্গে কালশিটে পড়ে গেলেও আমি ধাক্কা মারা ছাড়িনি। তারই পুরস্কার হিসেবে সশব্দে দরজাটা ভেঙে পড়ল ওপাশে। মুশকিল হল, আওয়াজটা এতই জোরালো ছিল যে, আমার শত্রুরা চট করে বুঝে ফেলল, কী ঘটছে। আমার ঘরের দরজায় এবার প্রায় দুরমুশ শুরু হল। তার পাশাপাশিই আমি চাবি ঘোরানোর আওয়াজ পাচ্ছিলাম। আগে আমার দক্ষিণের ঘরটাতেই ঢুকল একটা দল। তারপর সেদিকের দরজাটায় শুরু হল খোলা বা ভাঙার চেষ্টা।
প্রায় লাফিয়ে আমি যে ঘরে ঢুকেছিলাম, সেটার পাল্লাটা আটকালাম। মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম দুটো দরজাকেই আলমারি আর খাট দিয়ে আরও দুর্ভেদ্য করে রেখেছি বলে। কিন্তু তখনই দারুণ হতাশায় আমার মনটা প্রায় ভেঙে গেল।
