তখনই সার্জেন্ট হোটেল থেকে বেরিয়ে আমার কাছে এল। ওর নিচু, জড়ানো, অনেকটা ঘোঁত ঘোঁত-করা আওয়াজে বলা কথার মানে বোঝার পর আমার রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল।
কোচ আজ রাতে ছাড়বে না। তাতে গণ্ডগোল ধরা পড়েছে। না, অন্য কোনও যানবাহনও পাওয়া যাবে না, যা আমাকে আজ রাতে আর্কহ্যাম, নিউবারিপোর্ট, ইন্সউইচ বা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারে। তাই আজ রাত্তিরটা আমাকে গিলম্যান হাউসেই কাটাতে হবে। যাতে আমার জন্য স্পেশাল রেট দেওয়া হয়, সেটা সার্জেন্ট নিশ্চিত করবে। সে অত্যন্ত দুঃখিত… ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই অবস্থায় কিছুই করার থাকে না। আমি কোচ থেকে নেমে হোটেলে ঢুকলাম। ক্লার্ক চোখ কুঁচকে আমাকে দেখল, তারপর জানাল, ৪২৮ নম্বর ঘরটা আমাকে দেওয়া যাবে। ঘরটায় জলের সাপ্লাই নেই, তবে ওটা বেশ বড়। ভাড়া পড়বে মাত্র এক ডলার। আমি পেমেন্ট করে রেজিস্টারে সই করলাম। তারপর মাথা নিচু করে, আরেক বিষবদন অ্যাটেন্ডেন্টের পিছুপিছু ধূলিধূসর সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে গেলাম। ঘরটা যাচ্ছেতাই, আসবাবগুলো সস্তা এবং জঘন্য, এমনকী জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে একটা নোংরা উঠোন আর দূরে জলাজমি ছাড়া কিছু দেখা যায় না। ঘরের বাইরে, করিডরের শেষ প্রান্তে একটা দুর্গন্ধযুক্ত, মলিন, নিবু নিবু আলো-জ্বলা টয়লেট।
থাকার এমন ব্যবস্থা দেখে মুষড়ে পড়াই স্বাভাবিক। নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য খাবারের সন্ধানে নীচে নামলাম। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে বলে বাধ্য হয়ে হোটেলের রেস্তরাঁতেই ডিনার সারলাম। কপাল ভালো, প্যাকেট আর টিনের জিনিসই ওখানে গরম করে দেওয়া হয়। নইলে ওই নোংরা শহরে যে কী খায় লোকে…! খাওয়া সেরে, কাউন্টারের পাশ থেকে একটা খবরের কাগজ আর একটা পত্রিকা নিয়ে আমি নিজের ঘরে গেলাম। দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলাম, কারণ সেটাকে আটকানোর মতো কোনও তক্তা বা পাল্লা ছিল না। এই শহরের আরও অনেক অকেজো জিনিসের মতো ওটাও ভেঙে গেছে ভেবে আমি ঘরের মলিন আলোটা জ্বালোম। তারপর শব্দছক সমাধান করতে ব্যস্ত হলাম, যাতে ঘুমোনোর আগের সময়টা ঠিকঠাক কাটে।
অনেক চেষ্টা করেও কাগজে বা পত্রিকায় মন বসাতে পারলাম না। জাড়কের উপাখ্যান আর গিলম্যান হাউসে সেই ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর কী শুনেছিলেন, সেই নিয়ে ভাবনা, দুইয়ে মিলে আমার মাথায় নানা দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছিল। ঠিক কীসের ভয় আমাকে পেয়ে বসেছিল, বলতে পারব না। তবে সেই ভয়ের তাড়নাতেই দরজাটা ভালো করে দেখতে বাধ্য হলাম। কম আলোতেও বোঝা গেল, একটা পাল্লা ওখানে ছিল, কিন্তু সম্প্রতি সেটাকে সরানো হয়েছে। ঘরটার আগাপাশতলা খুঁজে জামাকাপড়ের আলমারিতে একটা ওই মাপের জিনিস পাওয়া গেল। ঘোরাঘুরি করার অঙ্গ হিসেবে আমাকে নিজের সঙ্গে কয়েকটা জরুরি জিনিস রাখতেই হয়। তেমনই একটা ছুরি-কাম-ক্রুড্রাইভার দিয়ে ওটাকে জায়গামতো ফিট করলাম। ঘরে আরও দুটো দরজা ছিল। সেগুলোকেও বন্ধ করে তবে নিশ্চিন্ত হলাম। আমি জামাকাপড় ছাড়িনি। বরং একেবারে সাজগোজ করেই ওই শক্ত বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল, ঘুম না-আসা অবধি হাবিজাবি যা পাই তা-ই পড়ব। কিন্তু সারাদিনের হাঁটাহাঁটির ফলে আলো জ্বেলে পড়তে ইচ্ছে করছিল না, আবার যা শুনেছি আর দেখেছি, তার ঠ্যালায় ঘুমও আসছিল না। এভাবে কতক্ষণ কেটেছিল জানি না, তবে হঠাৎ মনে হল, আমি যেন আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। যেন সিঁড়ি দিয়ে কেউ বা কারা সন্তর্পণে উঠে আসছে!
উঠে বসলাম। কান পেতে কিছু শুনতে পেলাম না। নিজেকে একপ্রস্থ গালাগাল দিলাম উলটোপালটা গল্প শুনে নার্ভ উত্তেজিত করে তোলার জন্য। একবার মনে হল, লাইট জ্বালিয়ে আশপাশটা দেখি, যদি তাতে মাথা একটু ঠান্ডা হয়। নিজেকে এ-ও বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমার কাছে যে টাকাপয়সা নেই, সেটা নিশ্চয় ইন্সমাউথের লোকেরাও বুঝেছে। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠে লাইটের সুইচ অবধি যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না, তাই চুপচাপ শুয়ে রইলাম। সে জন্যই কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারলাম, ওই আওয়াজটা আমি কল্পনা করিনি!
সিঁড়ি দিয়ে কেউ উঠে এসেছে। এবং শুধু উঠে আসাই নয়, আমি বুঝতে পারলাম, সে আমার ঘরের দরজার হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতে চেষ্টা করছে!
অন্য সময় বা অন্য কোথাও এই জিনিস হলে বোধহয় ভয়ে আমি জমে যেতাম। কিন্তু হোটেলে ঢোকার পর থেকে নিজের অজান্তেই আমি সতর্ক এবং প্রস্তুত ছিলাম। এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে হয়নি যে, ভুল করে বা মদের নেশায় কেউ আমার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে। একেবারে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, আমার একেবারে শিয়রে শমন! তবু, আশঙ্কা সত্যি হলেও ধাক্কাটা জোরেই লাগে।
কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও আমার ঘরের দরজাটা খুলতে পারল না হানাদার, সে যে-ই হোক না কেন। চাবির আওয়াজ শুনে বুঝলাম, আমার পাশের ঘরে কেউ চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকল। তারপর ওই ঘর থেকে আমার ঘরের দিকে আসার দরজাটা খোলার চেষ্টা হল। কিন্তু পাল্লাগুলোর জন্য সে গুড়েও বালি পড়ল। একই জিনিস হল একটু পরে অন্য ঘরেও। দরজা না ভেঙে আমার ঘরে ঢোকা যাবে না বুঝে লোকটা এবার চলে গেল। আমি প্রথমে করিডরে, পরে সিঁড়ি দিয়ে তার সাময়িক পশ্চাদপসরণের শব্দ পেলাম।
