একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করল জাডক। কিন্তু আমার মাথায় ততক্ষণে অন্য একটা প্রশ্ন উঠে এসেছে।
এই মেলামেশা কারা করত? মানে নাবিকরা বা রিফাইনারির কর্মীরা? নাকি…?
ঘোলাটে চোখে আমাকে দেখল জাডক। তারপর আবার কথা শুরু করল।
১৮৪৬ সালে ওবেদ মার্শ আবার বিয়ে করেন। লোকে বলে, ওঁর ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু এ-ও নাকি সেই ধর্মের অঙ্গ। সেই বউকে কেউ দেখেনি। তাঁর গর্ভে ওবেদের তিন সন্তান হয়। দু-জন কম বয়সেই নিখোঁজ হয়ে যায়। তবে একজন, একটি মেয়ের চেহারা একেবারে স্বাভাবিক ছিল। তাকে ইউরোপে শিক্ষাদীক্ষা দেওয়ানো হয়। তারপর ভুলিয়ে ভালিয়ে আর্কহ্যামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে মেয়েটির বিয়েও দেওয়া হয়, এমনটাই শুনেছি।
মার্শের প্রথম পক্ষের বড় ছেলের বউকেও কেউ দেখেনি। শুনেছি, সে-ও নাকি ওই দেবতাদের একজন ছিল। তার ছেলে, মানে ওবেদের নাতি বার্নাবাস মার্শ এখন রিফাইনারির মালিক। শুনেছি, ওর চেহারাও এখন নাকি একেবারে বদলে গেছে। ওবেদ মারা যান ১৮৭৮-এ৷ ওঁর প্রথম পক্ষের ছেলেরাও কেউ বেঁচে নেই। বার্নাবাসও প্রায় বছর দশেক ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে আছে। হয়তো আর কিছু দিনের মধ্যেই ওকে জলে চলে। যেতে হবে! মার্শ বংশের আর কেউ আছে কি? মনে তো হয় না।
জোয়ারের দাপট তখন ক্রমেই বাড়ছে। জলের ছিটে আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আমি দেখছিলাম, কীভাবে জলের আওয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল জাড়কের পাগলাটে ভাবসাব।
কিছু বলছেন না যে? অ, আমার কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছে না, তা-ই তো? হবে, হবে। থাকুন-না এই মরা শহরে, সব বিশ্বাস করবেন আপনি। যখন বুঝবেন, বন্ধ জানলার ওপাশে যার পায়ের আওয়াজ পাচ্ছেন, সে মানুষ নয়, বরং একটা নরকের কীট, তখন বুঝবেন! যখন চোখের সামনে দেখবেন, কার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আপনার মেয়েকে, তখন মানবেন আমার কথাগুলো।
সবজান্তার মতো আমার দিকে চেয়ে থাকবেন না, বুঝলেন! আমি যা দেখেছি তা দেখলে আপনি এতক্ষণে ল্যাজ গুটিয়ে পালাতেন এই নরক থেকে। কী দেখেছি আমি? জানতে চান, কী দেখেছি আমি? আমি দেখেছি, ওই দেবতারা আর জলের নীচে থেকেই। খুশি নন। সমুদ্রের লাগোয়া বাড়িগুলো এখন ওদের মেলামেশার জায়গাই শুধু নয়, ওদের আড়া। ওরা আসছে! অসংখ্য, অগুনতি! আর তারপর ওরা কী করবে, বুঝতে পারছেন আপনি?
জাডকের শেষদিকের কথাগুলো চিৎকার ছাপিয়ে আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছিল। আমি উত্তর দিতে গিয়ে দেখলাম, ওর মুখ বেঁকে যাচ্ছে। ভাবলাম, এটা কি মৃগী বা মদ্যপানের ফল? পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম, নিঃসীম আতঙ্কে প্রায় দিশেহারা হয়ে গেছে জাডক অ্যালেন। আর সেই আতঙ্কের উৎস রয়েছে আমার পেছনেই!
আমি পেছনে ঘুরে ঢেউ ছাড়া কিছু দেখতে পেলাম না। কিছুটা দূরে যেখানে ব্রেকারগুলো আছে, তার কাছে কিছু একটা ছিল কি?
জাডকের দিকে ঘুরে দেখলাম, ভয়ে লোকটার মুখ থেকে ফেনা বেরোনোর জোগাড় হয়েছে। চিৎকার করে আমাকে বলল বুড়ো, বেরোও এখান থেকে! এক্ষুনি! এই মুহূর্তে। ওরা জেনে গেছে যে, আমি তোমাকে সব বলে দিয়েছি। যাও!
একটা বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ল ভাঙা পাঁচিলের পাথরগুলোর ওপর। জলের গুঁড়োয় ঝাপসা বাতাস একটু পরিষ্কার হলে দেখলাম, প্রাণপণে উত্তরদিকে হাঁটছে… না, প্রায় দৌড়োচ্ছে জাডক অ্যালেন। আশপাশে আর কিছুই বা কাউকে দেখলাম না। চুপচাপ হাঁটা দিলাম। ওয়াটার স্ট্রিটে পৌঁছে আবার এদিক-ওদিক দেখলাম, কিন্তু লোকটাকে আমি আর দেখতে পেলাম না।
.
০৪.
দোকানের ছেলেটা বলেছিল বটে, কিন্তু জাডক অ্যালেনের গল্পগুলো যে কতটা ভয়ানক, সেটা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলাম। ঘড়ির কাঁটা বলছিল, সওয়া সাতটা বাজে। মাতালের প্রলাপ হলেও জাড়কের কথাগুলো আমাকে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছিল। মনে হচ্ছিল, মাছ আর মৃত্যুর গন্ধ-মাখা এই জীর্ণ শহরটা ছেড়ে যেতে না পারলে খুব বড় বিপদ হবে। তবে আমি দৌড়োইনি। নিজের মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু মার্শ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে গিয়েই বুঝলাম, কিছু একটা গোলমাল আছে। এতক্ষণ ফাঁকা-থাকা রাস্তাগুলোয় জটলা দেখছিলাম। ছোট ছোট দলে যারা জমা হচ্ছিল, তাদের চেহারায় ইন্সমাউথের লক্ষণ ফুটে উঠছিল স্পষ্টভাবে। আমার দিকে কয়েকজন ইশারা করল। আমার ইচ্ছে করছিল দৌড়োতে, কিন্তু কষ্ট করে হলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখলাম। গিলম্যান হাউসের কাছে পৌঁছে বুঝলাম, এই দলগুলোর লক্ষ্যও ওই বাড়িটা। ওরা যখন হোটেলটাকে ঘিরে ফেলছে, আমি তখন শান্তভাবে নিজের ব্যাগ নিয়ে হোটেল থেকে চেক-আউট করছি।
আমি শান্তভাবেই স্কোয়্যারে গিয়ে কোচের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। ইতিমধ্যে গিলম্যান হাউসের ভেতরে ঢুকে লোকগুলো কিছু একটা করছিল বা বলছিল। কোচ আটটার একটু আগেই এসে গেল। ওখান থেকে ড্রাইভার, মানে ওই সার্জেন্ট নেমে একটা চিঠির বান্ডিল, আর কয়েকটা খবরের কাগজ ছুঁড়ে দিল বাইরে, তারপর হোটেলে ঢুকল। সকালে যে তিনজন লোক নিউবারিপোর্টে নেমেছিল, তারাই এবার বাস থেকে নামল। ফুটপাথে দাঁড়ানো একটা নোংরা চেহারার লোকের সঙ্গে তারা কী ভাষায় গুজগুজ-ফুসফুস করল, তা আমি জানি না। তবে আমার আর কিছু দেখার ধৈর্য ছিল না। চুপচাপ কোচে উঠে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম শহরটা ছেড়ে যাওয়ার জন্য।
