আশপাশের জায়গার লোকেদের চোখ টাটাল। কিংসপোর্ট থেকে ক-জন এখানে মাছ ধরতে এল বটে, তবে তারপর তাদের কী হল, কেউ জানে না। কিন্তু সেই নিয়ে কে ভাববে? তত দিনে শহরের লোকেদের হাতে পয়সা আসছে। ব্রাঞ্চ রেললাইন বসেছে। ওই সময়েই মার্শ আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা এসোটেরিক অর্ডার অব ডেগন নামে একটা নতুন ধর্ম চালু করেন। সেই ডাগনের দলবল প্রথমেই ক্যালভারি কমান্ডারির লাগোয়া ম্যাসনিক হল কিনে নিজেদের চার্চ বসায়।
ম্যাট একে ম্যাসন ছিল, তায় এই ব্যাপারটা ও কিছুতেই সহ্য করেনি। এবার ও একেবারে রাস্তায় নেমে ওবেদ মার্শ এবং তাঁর চালু করা নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে। তারপর ওকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি! আমি বলছি না যে, মার্শ সরাসরি এতে জড়িত ছিলেন, তবে সোনা আর মাছের লোভ যে কী জিনিস…!
এভাবেই চলল বেশ ক-বছর। তবে ১৮৪৬-এ একটা ঘটনা ঘটল। সেই সময় শহরের সুস্থ মস্তিষ্কের লোকেদের মগজে অবশেষে বোধবুদ্ধি গজাল। কমবয়সি ছেলেমেয়েদের নিরুদ্দেশ হওয়া, ডেভিলস রিফ-এ গিয়ে কিছু লোকের রহস্যময় কাজকারবার, এবং অন্য সব চার্চ বন্ধ হয়ে ডাগনের প্রতিপত্তি বেড়ে যাওয়া এই জিনিসগুলোর মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, এটা অনেকেই তখন বুঝে ফেলেছিল। একদিন যখন ওবেদের নৌকো ডেভিলস রিফ গেছে, তখন তাদের পিছু নিয়ে অন্য বেশ কয়েকটা নৌকোও যায় সেদিকে। প্রথমে গুলিগোলা, তারপর একটা বিরাট ধরপাকড় চলে। প্রায় শ-দেড়েক লোক গ্রেফতার হয়, যাদের মধ্যে ওবেদ মার্শও ছিলেন। কিন্তু এই উত্তেজনায় কী হয়েছিল, জানেন?
কেউ খেয়াল করেনি, কিন্তু প্রায় এক মাস ডেভিলস রিফ-এ কাউকে বলি দেওয়া হয়নি!
সেই রাতে আমি ছাদের টালির ফাঁকে লুকিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওই অদ্ভুত না-মানুষ, না-মাছ, না-ব্যাং চেহারাগুলোকে আমি উঠে আসতে দেখি সমুদ্র থেকে। ওরা প্রথমে দরজার কড়া নেড়েছিল। যারা খুলেছিল, তাদের সেখানেই…! নয়তো কারও রান্নাঘরে ঢুকে, কাউকে শোয়ার ঘরে, কাউকে রাস্তায় মেরে ফেলেছিল ওরা!
জেলের দরজা ভেঙে ফেলা হয়েছিল সেই রাতে। চারদিকে আর্তনাদ, চিৎকার, কান্না, গুলির শব্দ। রাত ভোর হলে দেখেছিলাম, শুধু ক্যাপটেন ওবেদ মার্শ আর তার সঙ্গী বা অনুগামীরা বেঁচে আছে। বাকি গোটা শহর জুড়ে শুধু লাশের স্তূপ। টাউন স্কোয়্যার, রাস্তা, ঘর… সর্বত্র শুধু রক্ত। মার্শের সঙ্গীরা রটিয়ে দিল, শহরে অজানা রোগের থেকে মড়ক হয়েছিল। সেই মড়কেই বাকিদের সঙ্গে আমার বাবাও…!
থরথর করে কাঁপছিল জাডক। আমার কাঁধ শক্ত করে ধরে ও নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল, তবে সেটা অন্য কারণে। ততক্ষণে জোয়ার এসেছে। আমার পেছনের পাথরে ছলাৎছল আওয়াজ তুলছিল সমুদ্রের ঢেউ। কিন্তু আঁশটে গন্ধটা কমছিল না, বরং বাড়ছিল।
পরদিন সকালে সব সাফ করা হল, কিন্তু রক্তের দাগ কি সহজে মোছে? ক্যাপটেন মার্শকে দেখে বুঝলাম, ওঁর মাথা খারাপ হতে আর বিশেষ বাকি নেই। আমাদের উদ্দেশে চিৎকার করছিলেন উনি। বলছিলেন, যারা আমাদের সোনা আর মাছ দেয়, তাদের পাওনা মেটাতেই হবে। অন্য কারও নয়, শুধু তাদেরই পুজো করতে হবে আমাদের। আমাদের এই মর্মে শপথ করতে হল। বলা হল, আমরা যেন বাইরের লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা না করি। কেউ কিছু জানতে চাইলে যেন মুখ না খুলি। ব্যাস!
সমুদ্রের লাগোয়া কয়েকটা বাড়ি আলাদা করে দেওয়া হল, যেখানে ওই দেবতারা এসে মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন। কথাগুলো না মেনে আমাদের উপায় ছিল না। শুধু লোভ নয়, ভয়টাও কাজ করছিল যে। আগের রাতে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, ডেভিলস রিফ-এর তলায় ওইরকম প্রাণীদের সংখ্যা খুব খুব বেশি। ওদের বিরুদ্ধে লড়ব কী নিয়ে? কানাকিয়ারা এমন কিছু মন্ত্র জানত, বা ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কিছু থেকে শিখে নিয়েছিল, যা দিয়ে ওদের ঠেকিয়ে রাখা যায়। আমরা সেগুলো কীভাবে জানব, বলুন?
আমি যা দেখেছি, যা জেনেছি, সেগুলোর জন্য অনেক আগেই ওরা আমাকে মেরে ফেলত। নেহাত শপথ নিয়ে রেখেছি। তাই যতক্ষণ না ওরা প্রমাণ করতে পারছে যে, আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে বাইরের কারও কাছে এই নিয়ে মুখ খুলেছি, ততক্ষণ ওরা আমাকে কিছু করবে না। এসব কথা বাইরে বেরোলে যে ওদের খুব অসুবিধে হবে। ওরা সবাই একসঙ্গে প্রার্থনা করে ওই ডেগনের চার্চে–ওদের বাচ্চারা নাকি আর মরে না, ফিরে যায় সমুদ্রে মা হাইড্রা আর বাপ ডেগনের কাছে। ওরা গান গায় –লা! লা! কথুলু ফ্যাগন! ফ্যাগলুই ম্যাগলনফ কথুলু রেলিওয় ওয়াহ-নাগল ফ্যাগন –
লোকে এসব কথা বিশ্বাসই করবে না। আমি বলতে বাধ্য হলাম, তা ছাড়া সোনা এমনই জিনিস যে, গালগল্প ছড়ালে ওই ব্যাবসায় লোকসান নেই, বরং লাভ আছে। তাহলে ভয়টা কীসের?
ভয়টা খানপানের নয় স্যার, বরং খানদানের। ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল জাডক, লোকে। ভাবে, ইন্সমাউথ থেকে বেরোনো সোনার উৎস হল জলদস্যুদের লুটের মাল। সোনা কোত্থেকে আসছে– এটা নিয়ে তারা ভাবতেই রাজি নয়। কিন্তু ইন্সমাউথের লোকেদের চেহারা এরকম হওয়ার কারণটা তারা বুঝলে কী হবে, ভাবতে পারছেন? ওই দেবতাদের সঙ্গে মেলামেশা করার ফলে যারা জন্মায়, তাদের অনেকেই গৃহযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তারা যখন ফিরে আসে, তখন তাদের চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। বাইরের লোকে ভাবে, এটা সেই মড়কের ফল, বা নাবিকদের সঙ্গে অন্য দেশের মেয়েদের…! কিন্তু আসল ব্যাপারটা এখন আন্দাজ করে শুধু অবলা প্রাণীরা। ঘোড়া, খচ্চর –এমন প্রাণীরা ইন্সমাউথের লোকেদের কছে এলেই অস্থির হয়ে ওঠে। গাড়ি আসার পর সেই ঝামেলাটা মেটে, কিন্তু তদ্দিনে শহরের অবস্থা আবার খারাপ হচ্ছে। বন্দরটা বালি আর পলিতে বুজে আসছে বলে জাহাজগুলো আর ভিড়তে পারত না। কারখানা বন্ধ হল। রেললাইনটাও উঠে গেল। কিন্তু ওই দেবতাদের আসা বন্ধ হল না! মেলামেশাও বন্ধ হল না। একটা একটা করে বাড়ির জানলা বোর্ড দিয়ে, পেরেক ঠুকে বন্ধ করে দেওয়া হল, যাতে সূর্যের আলো ভেতরে ঢুকতে না পারে। সবাই চলে যেতে শুরু করল… নীচে, মাটির নীচে, তারপর জলের নীচে!
