তারপর? আমার মুখ থেকে প্রশ্নটা আপনা থেকেই বেরোল।
ওবেদ মার্শের কারবার মার খেয়ে গেল। ওঁর নিজস্ব জাহাজি ব্যাবসায় তখন মন্দা চলছিল। তা-ও, যদি এটা শুধু ওঁর ব্যাবসার লাভ-লোকসানের কথা হত, তাহলে ব্যাপারটা ওইদিকে বাঁক নিত না।
কোন দিকে?
আরে বাবা, মার্শের ব্যাবসার ওপর তো সরাসরি বা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে গোটা ইন্সমাউথ নির্ভর করত। অন্যান্য ব্যাবসাবাণিজ্য সবই তো প্রায় লাটে উঠেছে তখন। মাছ নেই, কারখানা বন্ধ, আর ওই বছরের পর সোনার কারবারও বন্ধ। কী অবস্থা হল শহরটার, ভাবতে পারেন?
অধিকাংশ মানুষ ভাগ্যের কাছে নিজেকে ছেড়ে দিল। তখনও এই শহরে কিছু কিছু ক্রিশ্চান মিশন ছিল। লোকে পেটের টানে সেখানেই হাত পাতল, সপরিবারে।
কিন্তু ওবেদ মার্শ সেটা করেননি! উনি অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন। উনি সরাসরি বলেন, চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করে কোনও লাভ নেই। বরং উনি এমন দেবতাদের কথা জানেন, যারা প্রার্থনায় সাড়া দেয়, এনে দেয় মাছ আর… সোনা! ওঁর জাহাজগুলোয় যারা কাজ করত, তারা তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলে, মার্শ কী বলতে চাইছেন। কিন্তু ওরা কথাগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও, শহরের বাকি লোকেদের সেই ইচ্ছে বা উপায় ছিল না।
এই অবধি বলার পর জাডক অ্যালেন চুপ করে গেল। ও বারবার আশপাশে তাকিয়ে দেখছিল। মনে হল, ও আশঙ্কা করছে, কেউ আমাদের এই কথাগুলো শুনছে। আমি অন্য কথা ভাবছিলাম। এইসব কিংবদন্তির গভীরেও একটা সত্যি থাকে। এখানেও নিশ্চয় সুদূর কোনও দ্বীপ থেকে নিয়ে-আসা একটা চর্মরোগ বা আরও গুরুতর অসুখের কথাই বলা হয়েছে। সঙ্গে মিশে গেছে লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু গোছের উপদেশ। কিন্তু জাড়কের গল্পে এমন একটা আতঙ্কের ভাব ছিল, যেটা নীতিকথার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছিল না। তা ছাড়া নিউবারিপোর্ট মিউজিয়ামের সেই টায়রা গোছের গয়নাটা তো আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তাহলে…?
জাডককে বোতলটা দিলাম। একেবারে শেষ বিন্দুটা গলায় না-গড়ানো অবধি ওটাকে ও মুখেই ধরে রইল। লোকটা এতটা মদ, তা-ও একেবারে নির্জলা, খেল কীভাবে? তবে ওসব জিজ্ঞেস করিনি আমি। ওর জড়ানো গলায় বলা কথাগুলোর মানে বোঝার জন্য আমাকে লোকটার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছিল। কিছুক্ষণের চেষ্টায় জাডক অ্যালেন নিজের গলার আওয়াজ খুঁজে পেল, তারপর বলতে শুরু করল।
ম্যাট চেষ্টা করেছিল। শহরের লোকেদের ও বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কেন ওইসব দেবতা মোটেই সুবিধের জিনিস নয়। কিন্তু কী হল? কিসসু না! মেথডিস্ট, ব্যাপটিস্ট… অন্য যা কিছু চার্চ ছিল তখন এখানে, সেগুলো ফাঁকা হয়ে গেল। যারা ওদের হয়ে প্রচার করত, তারা হয় শহর ছাড়ল, নয় স্রেফ গায়েব হয়ে গেল। ঈশ্বরের নামের বদলে শহরের বাতাসে ভাসল অন্য অনেকগুলো শব্দ– ডেগন, আশতরেথ, বেলিয়াল, বিইলজেবাব! কানান আর ফিলিস্তিনের সেইসব ভুলে-যাওয়া, ভয়ংকর দেবতারা…!
জাডকের চোখ বুজে এসেছিল। আমার ভয় হল, অতখানি তরলের চাপে ও বোধহয় এবার ঘুমিয়েই পড়েছে। লোকটার কাঁধ ধরে আলতো ঝাঁকুনি দিতেই ওর চোখ খুলে গেল। একদম স্পষ্ট গলায় ও বলে উঠল, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না, তা-ই তো? তাহলে বলুন তো, ক্যাপটেন ওবেদ মার্শ আর তাঁর সঙ্গে এই শহরের জনা কুড়ি লোক ওই ডেভিলস রিফ-এ গিয়ে কী করতেন? ওখানে যেদিকটায় সমুদ্র এত গভীর যে, আজ অবধি তল পাওয়া যায়নি, সেখানে ওরা বস্তায় ভরে কী… বা কাদের ফেলত? সেই ধাতুর টুকরোটা দিয়ে কী করেছিলেন ওবেদ মার্শ? বছরের বিশেষ বিশেষ তিথিতে ওখানে গিয়ে কোন মন্ত্র পড়া হয়? সবচেয়ে বড় কথা, নতুন-হওয়া এই চার্চগুলোয় যাজকরা কেন কাপড়, ওবেদের আনা ওই গয়নার মতো অলংকার, আর বিশেষ ধরনের শিরস্ত্রাণে নিজেদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখে?
লোকটার গলায় এমন একটা হিংস্রতা ফুটে উঠেছিল যে, আমি কিছুটা পিছিয়ে গেলাম। সেই দেখে বিশ্রীভাবে হেসে উঠল জাডক। তারপর আবার কথা শুরু করল।
ভয় পাচ্ছেন? শুধু আমার কথা, আমার এই গল্প শুনেই ভয় পাচ্ছেন? তাহলে আমি যা দেখেছি তা দেখলে কী করতেন? আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে আমি অনেক কিছুই দেখতাম। আড়ি পেতে ওবেদ মার্শের ব্যাবসা আর জাহাজের সঙ্গে যুক্ত লোকেদের অনেক কথাই শুনতাম। তবে সেগুলো যে সত্যি, সেটা বুঝলাম নিজের চোখে ওদের দেখে।
কাদের?
ডেভিলস রিফ থেকে যারা উঠে আসে, তাদের। কী করে দেখলাম জানেন? আমার বাবার একটা নৌকো ছিল। সেটা নিয়ে চুপিচুপি মার্শের নৌকোর পিছু নিয়েছিলাম। মেঘলা রাতেও বুঝতে পারছিলাম, রিফের ওপরে থিকথিক করছে কারা যেন। চাঁদ উঠল। ওই প্রাণীগুলো ঝপাঝপ জলে নেমে পড়ল, কিন্তু আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না! আমি দেখেছিলাম, ওরা মানুষ নয়। ওরা কথা বলে, তবে ইশারায়। আর সেই ইশারা…!
জাডকের কথাগুলো ক্রমেই অসংলগ্ন হয়ে উঠছিল। তবু আমি বুঝতে পারছিলাম, ও কী বলতে চাইছে।
একরাতে আপনি দেখলেন, ওখানে কিছু ফেলা হল। পরদিন সকালে আপনি জানলেন, আপনার তরতাজা জোয়ান বন্ধুটি হারিয়ে গেছে। আপনি দুইয়ে দুইয়ে চার করতে পারবেন না? বিশেষ করে যখন ওবেদ মার্শের কপাল খুলে গেল, ঠিক সেই সময়েই! ওঁর পরিবারের মেয়েদের গায়ে নতুন ডিজাইনের গয়না উঠল। ওঁর রিফাইনারির চিমনি দিয়ে আবার ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল। নিউবারিপোর্ট, আর্কহ্যাম, বস্টন– এমন নানা বন্দরে আবার শুরু হল জিনিস পাঠানো। আর এল মাছ! এত মাছ, ইন্সমাউথের মানুষ জীবনে দেখেনি।
