কানাকিয়া, মানে ওই দ্বীপে যারা থাকত, সেই উপজাতির লোকেরা এক বিশেষ ধরনের দেবতার পুজো করত। গয়নার গায়ে নকশাগুলো মনগড়া নয়, সেগুলো নাকি ওইসব দেবতার চেহারা। তাদের পুজো মানেও খুব সহজ ব্যাপার। দ্বীপের কমবয়সি ছেলেমেয়েদের ওই দেবতাদের কাছে বলি দিলেই তাঁরা তুষ্ট হয়ে গয়না, অঢেল মাছ এসবের ব্যবস্থা করেন। ওই দেবতারা জলের নীচে নানা শহরে বাস করেন। ওই দ্বীপটাও নাকি জলের তলা থেকেই উঠে এসেছে ভূমিকম্পের ফলে। আশপাশের দ্বীপ থেকে যখন লোকে এই দ্বীপে আসে, তখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ওই দেবতাদের কাউকে কাউকে তারা দেখতে পায়। তারপর একটু একটু করে ভাবের আদানপ্রদান হয়। শেষে এই ব্যবস্থা চালু হয়।
ওই দেবতা বা প্রাণীরা নরবলি জিনিসটা খুব পছন্দ করত। এককালে নাকি মানুষ ওদের কাছে নরবলি দিত, কিন্তু সে বহু যুগ আগের ব্যাপার। বলি পেলে ওরা গোটা সমুদ্রের মাছ নিয়ে আসবে ওই দ্বীপের কাছে এই শর্ত দেওয়া হল। তখন ওই দ্বীপের বাসিন্দাদের আপত্তি করার মতো অবস্থা ছিল না। তারা রাজি হল।
প্রথমদিকে কানাকিয়ারা ওই আগ্নেয় দ্বীপটার কাছে নৌকো করে যেত বলি হিসেবে ছেলেমেয়েগুলোকে রেখে আসতে, আর ওই প্রাণীদের তরফে উপহার হিসেবে পাওয়া গয়না নিয়ে আসতে। পরে ওই প্রাণীরা মূল দ্বীপেও আসতে থাকে। তারপরেই ওরা…!
জাডক অ্যালেন চুপ করে যাওয়ায় আমার প্রথম চিন্তা হল, মদ কি শেষ? বোতলে তখনও জিনিস আছে দেখে আমি লোকটার মুখের দিকে তাকালাম। ওর মুখে ঘেন্না আর ভয়ের এমন একটা মিশ্রণ ফুটে উঠেছিল, যেটা আমি বোঝাতে পারব না। একটু চুপ করে থেকে ও আবার বলতে শুরু করল।
তারপরেই ওরা বলে, দ্বীপের মানুষদের সঙ্গে ওরা মেলামেশা করতে চায়। মানে শরীরী মেলামেশা! শুনে কানাকিয়ারাও ভড়কে গিয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই। তবে ওই প্রাণীরা ওদের বোঝায়, সৃষ্টির একেবারে আদি যুগে সবরকম প্রাণই তৈরি হয়েছিল জলের গর্ভে। তাই চেহারায় সামান্য কিছু অদলবদল করে নিলে ব্যাপারটা নাকি অসম্ভব কিছু নয়। তা ছাড়া…
আমার গা গোলাচ্ছিল। তবু যথাসাধ্য স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলাম, তা ছাড়া?
তা ছাড়া, ওইরকম… মেলামেশার ফলে যেসব সন্তানসন্ততি জন্মাবে, তাদের কিছু বিশেষত্ব থাকবে। জন্মের পর থেকে একটা বয়স অবধি তাদের চেহারা থাকবে মানুষেরই মতো। তারপর তারা ক্রমেই বদলে গিয়ে ওই প্রাণীদের মতো হয়ে যাবে। তখন জলের অতলে হারিয়ে-যাওয়া শহর, দেশ, মহাদেশ… এগুলোই হবে তাদের বাসস্থান। সবচেয়ে বড় কথা কী জানেন? সেই সন্তানদের স্বাভাবিক মৃত্যু হবে না, যদি না কেউ তাদের মেরে ফেলে।
নিজের না হলেও, সন্তানের অমরত্ব… এই জিনিসের টান কতটা ভাবতে পারছেন?
আমার চোখে অবিশ্বাসের ভাবটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে জাডক একটু থতিয়ে গেল। তারপর আবার বলতে শুরু করল দুলে দুলে।
এইসব কথা কি আর সহজে মানা যায়? ওবেদ মার্শও মানেননি। কিন্তু দিনের পর দিন ধরে দ্বীপের লোকজনের সঙ্গে সহজভাবে, সাবধানে কথা বলে মার্শ বোঝেন, ওয়ালাকিয়া মিথ্যে বলেনি। সত্যিই ওই দ্বীপের সব্বার শিরায় ওইসব প্রাণীর রক্ত বইছে, কম বা বেশি মাত্রায়। একটা বয়সের পর চেহারা পালটে যায় ওদের। যারা জলে যেতে পারে, তারা চলে যায়। মাঝেমধ্যে নিজের বংশজদের সঙ্গে দেখা করার জন্য তারা ফিরেও আসে, এমনকী কয়েকশো বছর পরেও, কারণ তাদের মৃত্যু নেই। যারা জলে যেতে পারে না, তারা থেকে যায় ডাঙাতেই, তবে তাদের দেখে মানুষ বলে চেনার উপায় থাকে না। কিন্তু জলে হোক বা স্থলে, ওদের মৃত্যু হয় শুধু অন্য দ্বীপবাসীদের সঙ্গে লড়াইয়ে, বলি হিসেবে, আর নয়তো বাইরে থেকে আসা কোনও মানুষের দ্বারা বাহিত রোগজীবাণুর আক্রমণে।
অন্য কেউ এইরকম অবস্থায় কী করত? বলা কঠিন, তবে ওবেদ মার্শ বিস্তর ভেবে সিদ্ধান্ত নেন, দ্বীপবাসীরা যা করেছে, তার মধ্যে কোনও অন্যায় নেই। অবশ্য জলের নীচ থেকে আসা সেই আদিম প্রাণীদের দেখা পাননি মার্শ। তবে ওয়ালাকিয়াকে বিস্তর চাপ দিয়ে উনি কয়েকটা মন্ত্র শিখে নিয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন একটা ধাতুর টুকরো। ওয়ালাকিয়া মার্শকে বলেছিল, যেরকম জায়গায় ওইসব প্রাণী থাকতে পারে, তেমন কোথাও ওই ধাতুর টুকরোটা ফেলে দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করলে তারা উঠে আসে। তারপর তাদের সঙ্গে বোঝাঁপড়ায় আসা… সেটা মার্শের দায়িত্ব।
ম্যাট, মানে ওবেদের ফার্স্ট মেট ওই দ্বীপের ত্রিসীমানায় থাকার পক্ষপাতী ছিল না। কিন্তু ক্যাপটেন ওর কথা শোনেননি। ওবেদ বুঝে গিয়েছিলেন, ওই গয়নাগুলো সরাসরি বেচতে গেলে লোকে ভড়কে গেলেও ওগুলো গলিয়ে-পাওয়া সোনা বেচে ভালো রোজগার করা যায়। উনি নিজের বাড়ির মহিলাদের কিছু গয়না পরতে দিতেন। আর কিছু নাবিক, তাদের বারণ করা সত্ত্বেও কিছু গয়না বাজারে বেচে দিত। তবে এই কারবার ১৮৩৮ অবধি চালানো গিয়েছিল। ওই বছর দ্বীপে পৌঁছে জানা যায়, দ্বীপে আর কেউ বেঁচে নেই। খোঁজ নিয়ে মার্শ জানতে পারেন, অন্যান্য দ্বীপের বাসিন্দারা খবর পেয়েছিল, ওই দ্বীপে কী হচ্ছে। তারাই নাকি আক্রমণ করে দ্বীপের প্রতিটি প্রাণীকে নিকেশ করেছিল! শুধু প্রাণীই নয়, মূর্তি, প্রাসাদ, ধ্বংসস্তূপ হয়ে-থাকা দালানকোঠা, সবই প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তারা।
