নকশাটা মাথায় রেখে হাঁটছিলাম আমি। আমার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণদিকের জেটি আর রাস্তাগুলো, যার ওপাশেই সমুদ্র। ওইদিকটা যে একেবারে নির্জন– এটা ভেবেই ঠিক করেছিলাম, অ্যালেনের সঙ্গে আলাপ ওখানেই সারব। মেইন স্ট্রিট অবধি পৌঁছোনোর আগেই পেছন থেকে ফাঁসফেঁসে গলায় একটা শুনছেন? ও মশাই! আওয়াজ পেলাম। চুপচাপ দাঁড়ালাম। জাডক এসে, একেবারে তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো আমার কাছ থেকে বোতলটা নিয়ে নিল। হাঁটতে হাঁটতে ওর চুমুক দেওয়া, আর আমার হালকা-পলকা প্রশ্নমালা চলতে থাকলেও ও সাড়া দিচ্ছিল না। অবশেষে, ওয়াটার স্ট্রিট পেরিয়ে একটা ঘাসজমি দেখলাম। ওটার একদিকে ভাঙাচোরা নিচু দেওয়াল, অন্যদিকে সমুদ্র, আর সামনে থেকে শহরটার দিকে নজর রাখা যায়। ওখানে কয়েকটা শ্যাওলা-ধরা পাথরও ছিল। মাছের আঁশটে গন্ধ আর জায়গাটায় লেগে-থাকা মৃত্যুর আবহ আমার মাথায় চেপে বসছিল। তবু ঠিক করলাম, ওখানেই জাডক অ্যালেনের গুপ্তকথা শুনব।
রাত আটটার কোচ ধরে আর্কহ্যামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে আমার হাতে ঘণ্টা চারেক সময় ছিল। বুড়োর মুখ খোলানোর জন্য ওকে মদ খাওয়াতে গিয়েও আমাকে খেয়াল রাখতে হচ্ছিল, যাতে বেশি খেয়ে ও ঘুমিয়ে না পড়ে। বুড়ো বকবক করছিল, তবে দুনিয়ার অন্য সব কিছু নিয়ে। এইভাবে প্রায় দু-ঘণ্টা কাটলে আমার চিন্তা শুরু হল। মনে হল, এই এক বোতল মদে বোধহয় বুড়োর গলা আসল কথা বলানোর মতো ভিজবে না। ঠিক তখনই একটা ঘটনা ঘটল।
সমুদ্রের দিকে পিঠ দিয়ে আমি বসেছিলাম। আমার মুখোমুখি বসেছিল জাডক। তীর থেকে অনেকটা দূরে হলেও জলের ওপর ভেসে-থাকা ডেভিলস রিফকে তখন একদম স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। দৃশ্যটা জাড়কের পছন্দ হয়নি। নিচু গলায় ও গাল পাড়তে শুরু করল। খানিকটা ঝোঁকের মাথায় ও আমার কোটের হাতা ধরে সামনে এগিয়ে এল। তারপর বলল, ওই যে! শয়তানের জায়গা! ওখান থেকেই গভীর জল শুরু। এত গভীর জায়গাটা, যে কোনও তলই পাওয়া যায় না ওখানে। তবে একজন তল পেয়েছিল। ওবেদ মার্শ।
ঘড়ঘড়ে গলায় বলা কথাটা সেই কমে-আসা আলোয় আমার হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। কিন্তু একটা কথাও না বলে আমি মুখ বন্ধ করে রইলাম। আমি জানতাম, জাডক অ্যালেনের মুখ খুলে গেছে।
সময়টা তখন বড় খারাপ ছিল, বুঝলেন। ব্যাবসাপত্তর লাটে উঠেছে। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক-এক করে। এখানে জাহাজের কারবার যারা করত, সে আইনি হোক বা বেআইনি, সবাই ১৮১২-র যুদ্ধে খুব ঝাড় খেয়ে আর মাথা তুলতে পারেনি! তখন এই শহরে ব্যাবসা করার মতো দম ছিল শুধু ক্যাপটেন ওবেদ মার্শের। ওঁর তিনটে জাহাজ ছিল, ব্রিগ্যান্টাইন কলাম্বি, ব্রিগ হেটি আর বার্ক সুমাত্রি কুইন। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোর সঙ্গে ব্যাবসা করতেন মার্শ। হয়তো ওখানেই ওঁর মতিগতি বিগড়ে গিয়েছিল। নইলে ওইরকম কথা কেউ বলে?
কীরকম কথা? নিচু গলায় প্রশ্নটা করলাম।
অসহায় হয়ে যারা ক্রিশ্চান মিশনে সাহায্য চাইত, মার্শ তাদের ব্যঙ্গ করতেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল জাডক, উনি বলতেন, লোকেদের উচিত অন্য দেবতার উপাসনা করা। এমন কোনও দেবতা, যে কথা শুনবে। যে ওদের দেওয়া উপচার আর উৎসর্গ গ্রহণ করে ওদের ভালো রাখবে।
চুপ করে রইলাম। জাডক জড়ানো গলায় বলে চলল।
মার্শের ফার্স্ট মেট ছিল ম্যাট ইলিয়ট। ওর একটু বকবক করার স্বভাব ছিল। ওর কাছে শুনেছিলাম, নাবিকরা নাকি ধর্মের নামে উলটোপালটা কাজ করছে। আর এই ব্যাপারটা হয়েছে জাহাজগুলো একটা বিশেষ দ্বীপে যাওয়ার পরেই। দ্বীপটার কাছে একটা আগ্নেয়গিরি আছে। তবে আসল জিনিস ছিল ওই দ্বীপের ধ্বংসস্তূপ! সেগুলোর নাকি বয়সের গাছপাথর নেই। ম্যাট বলছিল, তাতে বিশাল বিশাল সব মূর্তি আছে, প্রাসাদ আছে, আর সেসবের গায়ে এমন সব কারুকাজ আছে, যা দেখলে রাতের ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু সব কিছুই দেখে মনে হয়, যেন দ্বীপটা অনেক অনেকদিন জলের তলায় ছিল।
সে তো অনেক জায়গা দেখেই মনে হয়। আলতো করে বললাম, নাবিকরা তারপর বদলে গেল কেন?
ম্যাট বলেছিল, ওই দ্বীপে যারা থাকে, তাদের নাকি মাছের কোনও অভাব হয় না। মানে ব্যাপারটা ভাবুন! প্রায় পাশের দ্বীপে যারা থাকে, তারাও মাছ খুঁজে হয়রান হয়, কিন্তু ওই দ্বীপে মাছের ভারে জাল ভেঁড়ার জোগাড়। আর শুধু কি মাছ? দ্বীপে যারা থাকত, তারা আজব ডিজাইনের গয়না পরত। আজব… মানে তাতে যেসব নকশা থাকত, ওই জিনিস আপনি আর কোথাও দেখবেন না। মাছ আর ব্যাঙের মাঝামাঝি অনেক প্রাণীর চেহারা নকশা করে বসানো থাকত ওই গয়নাগুলোতে। কোত্থেকে ওই গয়নাগুলো পাওয়া যায়, এই নিয়ে ওখানকার লোকেদের যতই জিজ্ঞেস করা হোক, তারা বলত না, বা বলতে পারত না।
ওবেদ মার্শের চোখে আরও দুটো জিনিস ধরা পড়ে ওই দ্বীপে থাকার সময়। প্রথমত, ওখানে বুড়ো লোকেদের দেখা পাওয়া যেত না। কমবয়সি যাদের দেখা যেত, তাদের চেহারা ওই তল্লাটের অন্যান্যদের থেকে… আলাদা। দ্বিতীয়ত, দ্বীপের কমবয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে থেকে কেউ-না-কেউ প্রতি বছরেই উধাও হয়ে যেত। ওদের ভেতরের ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক নয়, কিন্তু জিনিসটা মার্শ খেয়াল করেছিলেন।
আর কেউ এই জায়গায় কী করত জানি না, কিন্তু মার্শের ধৈর্য আর বুদ্ধি, দুটোই গড়পড়তা লোকের চেয়ে বেশি ছিল। ওই দ্বীপের বাসিন্দাদের নেতার নাম ছিল ওয়ালাকিয়া। ওর সঙ্গে কথা বলে মার্শ জানতে পারেন, কাদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ওই গয়নাগুলো। হাহ্ সেসব কি আর কেউ বিশ্বাস করবে! তবে হ্যাঁ, আপনি করলেও করতে পারেন। আপনার চোখজোড়া ক্যাপটেন মার্শের মতোই ধারালো ঠেকছে। তাই আপনাকে বলা যায়।
