আমার হঠাৎ মনে হল, এই চলাফেরার আওয়াজ যাদের, তাদের গলার আওয়াজ কেমন হবে? তখনও অবধি আমি কারও গলা শুনিনি। শোনার ইচ্ছেও ছিল না, এটাই সত্যি।
বড়রাস্তা আর চার্চ স্ট্রিটে দুটো একদা সুন্দর, এখন স্রেফ ধ্বংসস্তূপ হয়ে থাকা চার্চ পেছনে ফেলে আমি এলাকাটা থেকে বেরিয়ে এলাম। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বুঝলাম, ভেতরে ভেতরে কতটা টেনশন জমে উঠেছিল আমার মধ্যে! এরপর ভাবলাম, এখানকার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জমায়েতের জায়গা নিউ চার্চ গ্রিন-এ টু মারি। কিন্তু দোকানের ছেলেটা বলেছিল যে ওটা এখন ডাগনের দলবলের আচ্ছা, তাই বহিরাগতদের পক্ষে বিপজ্জনক। তা ছাড়া ওই বাড়ির বেসমেন্টেই আমি ভয়ানক চেহারাটা দেখেছিলাম। যাজকমশাইয়ের অমন চেহারা বিশেষ গয়না পরার ফলেই হোক বা কোনও শিরস্ত্রাণ পরার ফলে, ওখানে যেতে আমার সাহসে কুলোল না।
চার্চটাকে এড়িয়ে আমি আবার ফেডারেল স্ট্রিট ধরে শহরের বনেদি জায়গাটায় ঢুকলাম। কাউকে দেখতে না পেলেও মনে হল, শহরের এইদিকের বাড়িগুলোয় বোধহয় কিছু লোক থাকে। অবহেলা আর নির্জনতা অধিকাংশ বাড়িকে গিলে ফেললেও জায়গাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমান্স আছে, মানতেই হবে। বাড়িগুলোর পুরোনো গড়নের খুঁটিনাটি, হাড়-বের করা রাস্তার দু-ধারে গাছের ঝিমন্ত সারি– এসব দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলাম। ওয়াশিংটন স্ট্রিটে পরপর গোটা চারেক বাড়ি দেখলাম, যারা শক্তপোক্ত অবস্থাতেই আছে। তাদের মধ্যে একটা বাড়ি বিশাল জায়গা জুড়ে বানানো। সেটা দেখতে সুন্দর, তার সবুজ লন আর সযত্নলালিত চেহারা দেখে মনে হল, মার্শ রিফাইনারির মালিকের বাড়ি এটাই হতে পারে।
লোকজন না দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম ততক্ষণে। কিন্তু আমার তাজ্জব লাগছিল এটা ভেবে যে, গোটা শহরে কোনও কুকুর-বেড়াল দেখতে পাচ্ছি না কেন? তা ছাড়া সব বাড়িতে, এমনকী যেগুলোর অবস্থা বেশ ভালো, তাতেও তিনতলা আর ছাদের ঘরগুলো দেখলাম একেবারে সিল করার মতো বন্ধ হয়ে আছে। এর কোনও ব্যাখ্যাও আমি খুঁজে পেলাম না।
গোটা শহরটায় মৃত্যুর এমন একটা ছায়া পড়েছিল, যে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বন্ধ জানলার পেছন থেকেই হয়তো বহু চোখ আমায় দেখছে। তখনই বড় ঘড়িতে তিনটে বাজল। সেই শব্দে, আর তার চেয়েও বেশি করে ওই ঘড়ি যে চার্চে আছে, তার কথা ভেবে আমার একেবারে পিলে চমকে গেল!
ওয়াশিংটন স্ট্রিট ধরে নদীর ধার দিয়ে হেঁটে আমি শহরের আরও একটা একদা ব্যস্ত, এখন পরিত্যক্ত এলাকায় এলাম। কারখানাগুলো ভেঙে মাটি আর বালিতে মিশে যাচ্ছে। রেললাইনে মৃতপ্রায় ঘাসেরা দুলছে। রেল স্টেশনের কয়েকটা টুকরো শুধু পড়ে আছে। রেল ব্রিজটার গায়ে বড় বড় করে সাবধান লেখা থাকলেও আমি কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই সেটা পার হলাম। ওপাশে, মানে নদীর দক্ষিণ তীরে আমি আবার কিছু মানুষ দেখলাম। কিন্তু তাদের নিশ্চুপ চলাফেরা, আমাকে আড়চোখে দেখা… এসব আর নিতে পারছিলাম না। ঠিক করে ফেললাম, পেইন স্ট্রিট ধরে আমি হোটেলে নিজের ঘরে ফিরে যাব, আর রাত আটটায় ওই বদখত কোচ আমাকে এই যাচ্ছেতাই শহর ছেড়ে কত তাড়াতাড়ি নিয়ে যাব, তার অপেক্ষায় থাকব। সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, ডানদিকে একটা জরাজীর্ণ দমকল দফতর। সেখানে রংচটা উর্দি-পরা দু-জন দমকলকর্মীকে দেখলাম, যাদের চেহারা অগোছালো হলেও তাতে ইন্সমাউথ-সুলভ কিছু নেই। তারা এক লালমুখো, দাড়িওয়ালা, ঘোলা চোখের বুড়োর সঙ্গে খোশগল্প করছিল।
বুঝতে পারলাম, ভয়াল-ভয়ংকর গল্প আর শোনা কথার ভাণ্ডারী, মাতাল ও অতি-প্রাচীন জাডক অ্যালেনের সন্ধান পেয়ে গেছি!
.
০৩.
ভাগ্য? নিয়তি?? ওরকম কিছু একটাই সে দিন আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল। মন চাইছিল স্কোয়্যারে ছুটে গিয়ে বাসটার জন্য অপেক্ষা করতে, যাতে ওই যাচ্ছেতাই জায়গাটা ছেড়ে চলে যাওয়া যায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু আমি থেমে গেলাম ওই বুড়োকে দেখে। জানতাম, লোকটা যা বলবে, তার প্রায় সবটাই নেশাগ্রস্ত মগজ আর জরাজীর্ণ স্মৃতির ফসল। এ-ও জানতাম যে, লোকটার সঙ্গে কথা বলছি দেখলে স্থানীয় লোকজন রেগে যাবে। তবু মনে হল, একসময়ে গমগম-করা ইন্সমাউথের আজকের এই দশা হওয়ার কারণটা বুঝতে গেলে আমার জাডক অ্যালেনের সঙ্গেই কথা বলা দরকার। শুনেছিলাম, সবচেয়ে ভয়ংকর বা রং-চড়ানো গল্পগাছার পেছনেও একটা সত্যের বীজ থাকে। তাতেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাস। তাই মনে হল, অ্যালেনের সেই গল্পগুলো শোনা যাক। হয়তো সত্যিটা আমি বুঝে, বা খুঁজে নিতে পারব।
ওখানে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গেলে দমকলকর্মীদের সঙ্গে ঝামেলা হতে পারে– এটা ভেবে আমি একটা প্ল্যান করলাম। দোকানের ছেলেটা আমাকে বলেছিল কোথায় মদ কিনতে পাওয়া যায়। ঠিক করলাম, মদের একটা বোতল জোগাড় করে এই জায়গাটার আশপাশে অলসভাবে ঘোরাঘুরি করব। পাঁড়মাতাল জাডক যদি বোতলের টানে আমার সঙ্গে ভাব জমায়, তাহলে নিশ্চয় কারও কিছু বলার থাকবে না।
ইলিয়ট স্ট্রিটের একটা নোংরা দোকান থেকে এক বোতল মদ জোগাড় করলাম। দোকানদারের মধ্যে ইন্সমাউথের চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো সবে দেখা দিতে শুরু করেছিল। হয়তো আমার মতো অনেক বাইরের লোক-এর সঙ্গে মেলামেশা করতে হয় বলেই লোকটির আচরণ বেশ ভদ্র ছিল। কপাল ভালো বলতে হবে, কারণ বোতল হাতে বেশি ঘুরতে হল না। পেইন স্ট্রিটের বাইরে গিলম্যান হাউসের এক কোণেই জাডক অ্যালেনের শীর্ণ, লম্বা, টলমলে চেহারাটা দেখতে পেলাম। বোতলটা হাতে ধরে ওয়েইট স্ট্রিটের দিকে বাঁক নিতেই বুঝলাম, কাজ হয়েছে। চুম্বকের টানে আলপিনের মতো অ্যালেন আমার পিছু নিয়েছে।
