আহা, শুনিই না, কী বলে জাডক। আমি তোয়াজের সুরে বললাম, তারপর না-হয় সত্যি-মিথ্যের ব্যাপারটা বোঝা যাবে।
ওই আর কী। বুঝতে পারলাম, ছেলেটা হয় কিছু জানে না, নয়তো বলতে চাইছে না। জাডক এক ভয়ংকর দানবিক প্রাণীর কথা বলে। বহিরাগতরা সত্যিই নাকি মাঝেমধ্যে ওইরকম একটি প্রাণীকে রাতের ইন্সমাউথে দেখেছে। মুশকিল হল, রাতে এখানকার রাস্তাঘাট ঘোর অন্ধকার থাকে বলে এমনিতেই বাইরে থাকা নিরাপদ নয়। ফলে কে যে কী দেখেছে, তা বলা কঠিন।
এখানে মাছ ধরা ছাড়া আর কিছু হয়? নিজের টেনশন চাপা দিয়ে, বোর-হওয়া গলায় জানতে চাইলাম।
মার্শ রিফাইনারি! ছেলেটা সোৎসাহে বলল, তবে মার্শের সঙ্গে আপনার দেখা হবে না।
আমি নিতান্তই সাধারণ মানুষ, তায় ট্যুরিস্ট। কাঁধ ঝাঁকালাম আমি, দেখা হওয়ার কারণ থাকবেই বা কেন?
সে জন্য নয়। ছেলেটার মুখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, বয়স হয়ে যাওয়ার পর থেকে ওঁকেও আর দেখতে পাওয়া যায় না। শুধু উনি নয়, ওঁর ছেলেমেয়েদেরও এখন আর প্রকাশ্যে দেখা যায় না। শুনেছি, ওঁদের সবার স্বাস্থ্যই নাকি ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে ইদানীং। মার্শের এক মেয়ের বীভৎস চেহারার বর্ণনা শুনে তো গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। তবে সেই মহিলা বাইরে বেরোলে অদ্ভুত গড়নের নানা গয়না পরেন। এখানে যে আজব টাইপের চার্চ জনপ্রিয়, তার যাজকরাও শুনেছি ওইরকম উদ্ভট গয়না আর পোশাক পরেন। এই গয়নাগুলোই বোধহয় মার্শ রিফাইনারিতে ঢুকে বাট হয়ে বেরোয়।
প্রথমে চেহারা, আর তারপর স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার এই অসুখটা তো গোটা শহরেই আছে বলে মনে হচ্ছে। আমি চিন্তিত গলায় বলি, এটা ছোঁয়াচে নয় তো?
না বোধহয়। ছেলেটা বলল, যারা অনেক দিন ধরে এখানে আছে, কিন্তু এখানকার লোকেদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক গড়েনি, তাদের মধ্যে আমি এমন কিছু দেখিনি। তবে এটাও সত্যি যে, শুধু মার্শ নয়, গিলম্যান, ইলিয়ট বা ওয়েটসদের মতো সব কটা বনেদি পরিবারই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে।
এরপর আর কথা বলার মতো কিছু ছিল না। শহরটার অধিকাংশ আলো কাজ করে না, রাস্তার নাম-লেখা ফলকগুলোও নেই। তাই ছেলেটাই আমার জন্য একটা মোটামুটি স্কেচ ম্যাপ এঁকে দিল। রেস্তরাঁটা দেখে ভক্তি হয়নি। দুপুরের খাবার হিসেবে একগাদা চিজ ক্র্যাকার আর ওয়েফার কিনে আমি ইন্সমাউথ-পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লাম।
আমার প্ল্যান ছিল সরু গলি এড়িয়ে যথাসম্ভব বড়রাস্তায় ঘোরা, কোনও বহিরাগতকে দেখতে পেলে তার সঙ্গে গল্প জমিয়ে শহরটা নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া, শেষে রাত আটটার কোচটা ধরা। সেইমতো বেরিয়ে আমি আগে ব্রিজ পেরিয়ে রিফাইনারির দিকেই এগোলাম। একটা কারখানা বলতেই যে পরিমাণ আওয়াজ বা হট্টগোলের কথা আমরা ভাবি, তার কিছুই শুনতে পেলাম না। ওর চেয়ে বেশি আওয়াজ তুলে মানুক্সেট নীচে, সমুদ্রের দিকে লাফিয়ে পড়ছিল। ওখানে একটা খোলা জায়গার চারপাশে রেডিয়াল প্যাটার্নে বেশ কয়েকটা রাস্তা দেখলাম। মনে হল, টাউন স্কোয়্যার তৈরি হওয়ার আগে ওটাই বোধহয় শহরের প্রধান জায়গা ছিল।
বড়রাস্তা ধরেই এগোলাম। ব্রিজ পেরোনোর পর শহরের যে অংশটায় ঢুকলাম, সেটা পুরোপুরি পরিত্যক্ত বলে মনে হল। বাড়িগুলোর শুধু ছাদ ঢালু হয়ে নীচে নামেনি, আস্ত বাড়িগুলোই পড়ো-পড়ো হয়ে আছে। এর সঙ্গে যোগ করুন সারি সারি খোলা, ফ্রেম-ভাঙা জানলার সারি। কয়েকটা বাড়ির একতলায় লোক থাকে বলে মনে হল, কিন্তু সেগুলোর জানলা একেবারে তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দেখলাম। সব মিলিয়ে, রাস্তা ধরে যেতে যেতে অব্যাখ্যাত একটা ভয় আমার ওপর চেপে বসছিল। মনে হচ্ছিল, শহরটা অজস্র অন্ধ চোখ মেলে আমাকে দেখছে আর গিলে খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে!
বড়রাস্তা থেকে ফিশ স্ট্রিট। ফাঁকা হলেও তার দু-ধারের বেশ কিছু গুদাম আর বাড়িঘরের অবস্থা বেশ ভালো দেখলাম। ওয়াটার স্ট্রিটের অবস্থাও তথৈবচ। পুরো এলাকায় কয়েকজন জেলে ছাড়া আমি কাউকে দেখতে পাইনি। মানুক্সেটের আছড়ে পড়ার শব্দ ছাড়া কিছু শুনতেও পাচ্ছিলাম না। স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়ছিল। ওখানে আর বেশিক্ষণ থাকতে ভরসা পেলাম না। ফিশ স্ট্রিট ব্রিজ ভাঙা, এমনটাই এঁকেছিল ছেলেটা। তাই আমি বড়রাস্তার ব্রিজ ধরেই নদীর উত্তরদিকে এগোলাম। তার মধ্যেও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে হচ্ছিল, কেউ আমার পিছু নিয়েছে কি না!
নদীর উত্তরে মনে হল, লোকজন থাকে। ওয়াটার স্ট্রিটের কয়েকটা গুদামে লোকেদের মাছ প্যাক করতে দেখলাম। চিমনি থেকে ধোঁয়াও বেরোচ্ছিল কোনও কোনও বাড়িতে। আলোছায়ায় ভুলও দেখতে পারি, তবে সরু গলিতে কিছু কিছু চেহারাকে চলতে-ফিরতেও দেখলাম। হ্যাঁ, তাদের দেখে আমার মনে হল, অসুখই হোক বা রক্তের দোষ, ইন্সমাউথ লুক বলতে যে জিনিসটা আমি বুঝেছি, সেটার প্রাদুর্ভাব শহরের এই অংশে আরও বেশি। কিন্তু আমার কাছে পরিবেশটা অস্বস্তিকর হচ্ছিল কিছু শব্দের জন্য। শব্দগুলো খুবই সাধারণ, ঘষটানো, দ্রুতপায়ে কারও সরে যাওয়া, ভারী গলায় কিছু দুর্বোধ্য শব্দ…! এমনিতে এগুলোতে আমার কিছুই মনে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু শব্দগুলো আসছিল এমন সব বাড়ি বা গুদাম থেকে, যার জানলা-দরজা সব একেবারে বোর্ড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে!
