যদি আমাদের স্কুলগুলি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি একুশ শতকের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে চায়, তা হলে শিক্ষা প্রদানকারীদের নিজেদের মধ্যে নৈতিক নেতৃত্বের চর্চা করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করতে হবে। স্কুলগুলির জন্য এবং স্কুলশিক্ষার বিষয়ে তাঁদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পড়ুয়ারা অধ্যয়নের মাধ্যমে স্বশাসিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
আমাদের সন্তানদের জন্য তেমনই এক শিক্ষার প্রয়োজন যা রাষ্ট্রকে দেবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একনিষ্ঠ নেতা, যারা ভারতকে এক সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, সুখী রাষ্ট্রে রূপান্তর করে দেবে।
এই পাঁচটি গুণ যদি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রোথিত করে দেন তাদের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা, তা হলে তাদের মধ্যে তৈরি হবে জীবনভর জ্ঞানার্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অন্যের কাছে তা হবে এক দৃষ্টান্তও। অর্থাৎ, তারা হয়ে উঠবে আদর্শ শিক্ষার্থী। ক্লাসরুম ছাড়াও তারা শিক্ষা নেবে তাদের পারিপার্শ্বিক থেকে। আমি নিশ্চিত করে বিশ্বাস করি যে, প্রত্যেক শিক্ষকের লক্ষ্য হল তেমনই আদর্শ শিক্ষার্থী তৈরি করা। এই কথা মনে রেখে আমি একটি এগারো-দফার শপথ তৈরি করেছি যা আমি চাই সারা ভারতের সব শিক্ষক যেন মেনে চলেন:
১। সর্বাগ্রে, আমি শিক্ষাদানকে ভালবাসব। শিক্ষকতাই হবে আমার আত্মা।
২। আমি মনে করি যে, আমি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই নয়, আমি গড়ে তুলব সেই সব প্রজ্বলিত মনের তরুণদের যারা পৃথিবীতে, পৃথিবীর উপরে ও পৃথিবীর নীচে সর্বশক্তিমান সম্পদ। আমি এই শিক্ষকতার মহান মিশনে থাকব সম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ও একনিষ্ঠ।
৩। আমি নিজেকে একজন মহান শিক্ষক হিসেবে দেখব কারণ, একজন সাধারণকে অসাধারণ স্তরে উন্নীত করে দিতে পারে আমার শিক্ষাদান।
৪। উদারতা ও স্নেহ দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আমার সকল কাজ চালিত করব। তাদের কাছে আমি হব একাধারে মাতা, ভগিনী, পিতা বা ভ্রাতা।
৫। আমি আমার জীবনকে এমনভাবে চালিত করব যে, আমার জীবনই হবে আমার শিক্ষার্থীদের কাছে এক বার্তা।
৬। আমার ছাত্রছাত্রীদের আমি উৎসাহিত করব যাতে তারা প্রশ্ন করে আর তাদের মধ্যে একটা অনুসন্ধিৎসার স্পৃহা জন্মায়, যাতে তারা মননশীল আলোকপ্রাপ্ত নাগরিক হয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে।
৭। আমার সকল ছাত্রছাত্রীকে আমি সমান চোখে দেখব এবং ধর্ম, বর্ণ বা ভাষার ভিত্তিতে তাদের পৃথকীকরণকে সমর্থন করব না।
৮। আমি আমার শিক্ষকতার ক্ষমতাকে সর্বক্ষণ বর্ধিত করার চেষ্টা করব যাতে আমি আমার শিক্ষার্থীদের দিতে পারি উৎকৃষ্ট শিক্ষা।
৯। আমার শিক্ষার্থীদের জন্য আমি অসম্ভব গর্বিত হব।
১০। আমি উপলব্ধি করি যে, সব ধরনের জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পে এক শিক্ষক হিসেবে আমার মূল্যবান যোগদান আছে।
১১। আমার সর্বক্ষণের প্রচেষ্টা থাকবে যাতে উৎকৃষ্ট চিন্তায় আমার মন ভরে থাকে এবং যাতে আমি সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারি চিন্তায় ও কর্মে আভিজাত্য।
.
আট : কৃষক
কবি-সন্ত তীরুভাল্লুভারের ভিটে তামিলনাডু থেকে আমি এসেছি। প্রায় ২২০০ বছর আগে তিনি রচনা করেছিলেন ১৩০০ দ্বিপদী যাকে একত্রে বলা হয় তীরুক্কুরাল। এর মধ্যে দশটি দ্বিপদী কৃষকদের উদ্দেশে রচিত যেখানে তাঁদের পেশাকে উদ্যাপিত করা হয়েছে। তীরুক্কুরাল পাঠ করেই আমি বড় হয়েছি। আমাদের দেশের কৃষকদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী ভারতে রয়েছেন ১২ কোটি চাষকর্মী। প্রায় ৫০ শতাংশ কর্মশক্তি আমাদের দেশে রয়েছে কৃষিতে, যা গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (জিডিপি)-র ১৩.৭ শতাংশ।
তিনটি অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই, যা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ভারতের কৃষিসমাজ আমাদের রাষ্ট্রকে মহান করে তুলে ধরতে পারে। একটি কাহিনি বিহারের, অন্যটি তামিলনাডুর আর তৃতীয়টি গুজরাতের।
দ্বিগুণ উৎপাদনশীলতা, বিহার
টেকনোলজি ইনফর্মেশন, ফোরকাস্টিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট কাউন্সিল (টিআইএফএসি) দল ২০০০ সালে বিহারের আরপি চ্যানেল ৫ আর মাঝোলি শাখানদী অঞ্চলে একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। পরবর্তী সময়ে কৃষকদের অনুরোধে তা সম্প্রসারিত হয় পালিগঞ্জ ও পাঁচটি অন্য শাখানদী অঞ্চলে। এই পরীক্ষাটি টিআইএফএসি পরিচালনা করলেও সঙ্গে ছিল কৃষকদের একটি সমবায় সমিতি, ভারতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থা (আইএআরআই), এবং বিহারের পুসাতে অবস্থিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারে উৎপাদন হল দ্বিগুণ। এই পদ্ধতিগুলির মধ্যে ছিল মাটির শ্রেণিগত চরিত্র নিরূপণ, মাটির চরিত্র অনুযায়ী সঠিক বীজের নির্বাচন, সময়মতো রোপণ, সার ও কীটনাশকের সঠিক নির্বাচন, জলের ব্যবস্থা এবং ফসল তোলার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী প্রণালীর সঠিক প্রয়োগ। প্রতি হেক্টর জমিতে ২ টনের জায়গায় ৫.৮ টন ধান চাষ হল। গমের ক্ষেত্রে ০.৯ টনের পরিবর্তে ২.৬ টন প্রতি হেক্টর। বর্তমানে ধান ও গম চাষ হয় ২৫০০ হেক্টর জমিতে এবং সেখানে যুক্ত আছেন ৩০০০ জন কৃষক।
অন্যান্য রাজ্যেও এই সাফল্য কাহিনির পুনরাবৃত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।
প্রিসিশন চাষ পদ্ধতি, তামিলনাডু
