শুভ নীতিজ্ঞান যুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা
তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফস কলেজে ছাত্রাবস্থায় শোনা রেভারান্ড ফাদার কালাথিলের বক্তৃতাগুলি এখনও আমার স্মৃতিতে আছে। জেস্যুইট প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রধান। প্রতি সোমবার তিনি একটি একঘণ্টার ক্লাস নিতেন। প্রাচীন এবং বর্তমান সময়ের আদর্শ কিছু মানুষ সম্পর্কে তিনি সেই ক্লাসে বলতেন। গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, সন্ত অগাস্টিন, কালিফা ওমর, মহাত্মা গাঁধী, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, এবং আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলতেন। তিনি আমাদের সভ্যতার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু নীতিকাহিনিও বলতেন। মরাল সায়েন্স ক্লাসে ফাদার কালাথিল বুঝিয়ে দিতেন যে, কীভাবে অভিভাবকদের যত্ন, শিক্ষা আর ভাল বইয়ের সান্নিধ্যে এসে এই মহাপুরুষরা বিকশিত হয়েছিলেন।
১৯৫০-এর দশকে যখন আমি কলেজ ছাত্র, তখন শোনা সেই বক্তৃতা আজও ছ’টি দশক পার করে আমায় উদ্বুদ্ধ করে। আমি মনে করি, স্কুলে বা কলেজে প্রতি সপ্তাহে ভারতের সভ্যতার ঐতিহ্য বিষয়ে এক ঘণ্টার একটি বক্তৃতা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি প্রত্যেক ভাল শিক্ষকের। এর ফলে শিক্ষার্থীরা থাকবে এক শুভ নৈতিক যাপনে। এর থেকেই দেশের প্রতি, দশের প্রতি একটি ভালবাসা জন্ম নেবে। তরুণ বয়স থেকেই প্রতিটি নাগরিকের ভিতর প্রোথিত হয়ে যাবে নীতিজ্ঞান।
রাষ্ট্রনির্মাণের ক্ষমতা
সব থেকে মূল্যবান যে কর্মকাণ্ডে শিক্ষকরা নিজেদের যুক্ত করতে পারেন তা হল রাষ্ট্রনির্মাণের ক্ষমতা সৃষ্টি করা। শিক্ষার পরিমণ্ডলে কী ধরনের মানুষ আমরা হতে চাই? আমাদের সন্তানদের আমরা কোন কোন ক্ষমতা দিতে চাই? আমরা যদি তাদের কোনও ক্ষমতা দিতে আগ্রহী হই, তো আমাদের প্রশ্ন করতে হবে: কীসের জন্য সেই ক্ষমতা? আমরা আমাদের সন্তানদের দেব অর্থনীতির উন্নতি আনার আর রাষ্ট্র গড়ার ক্ষমতা। কোন ধরনের রাষ্ট্র ভারত গড়তে চায়?
ভারতকে ২০২০ সালের ভিতর এক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে আমাদের লক্ষ্য। পাঁচটি ক্ষেত্র আছে যেখানে একযোগে উন্নয়ন করতে হবে: কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়া; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি; পরিকাঠামো উন্নয়ন যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নদী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক; এবং জটিল প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা।
এই লক্ষ্য পূরণে স্কুলগুলিতে আর তার পড়ুয়াদের ভিতর যে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন সেগুলি হল: গবেষণা ও অনুসন্ধানের ক্ষমতা; মননশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিশেষ করে তথ্য হস্তান্তরে মননশীলতা; উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা; উদ্যোগী নেতৃত্বের ক্ষমতা; এবং নৈতিক নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা।
১। গবেষণা ও অনুসন্ধান
আমাদের আঙুলের গোড়ায় জ্ঞান ও তথ্যের যে ভাঁড়ার তার ব্যবস্থাপনা হবে একুশ শতকের অভিমুখ। আমাদের সন্তানদের দিতে হবে সেই ক্ষমতা যার সাহায্যে তারা জ্ঞান ও তথ্যের সাগর সাঁতরে পার হয়ে তার সঠিক প্রয়োগ করবে। প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা আজ সততই হতে পেরেছি জীবনভরের পড়ুয়া, যে পড়ুয়াদের প্রয়োজন হয় যে-কোনও নিরন্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতিতে।
২। মননশীলতা ও উদ্ভাবন এবং তথ্যের মননশীল হস্তান্তর
অন্যকে শিক্ষাদানে আমাদের নিজেদের শিক্ষা হয় সব থেকে ভাল। একুশ শতকে জ্ঞানের ব্যবস্থাপনা কোনও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতার বাইরে। যে তথ্য ভাণ্ডার থেকে কিছু আহরণ করা সম্ভব তার পরিমাণ এত বৃহৎ যে, তা কোনও ব্যক্তিবিশেষের আয়ত্তে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং তথ্যের ম্যানেজমেন্ট ব্যক্তির আওতা থেকে সরে গিয়ে তা এখন সমাজের আওতায় চলে গেছে। সকলে মিলে সংঘবদ্ধ হয়ে কী করে তথ্যের পরিচালনা করা যায়, তা আমাদের শিখতে হবে। অর্থাৎ, নিজেদের শুধু শিক্ষিত করে তুললে হবে না, অন্যকেও শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
৩। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার
আমাদের স্কুলগুলির প্রতিটি শিক্ষার্থীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে, তার শিক্ষা পদ্ধতির প্রয়োজনেই। স্কুলগুলির উচিত আধুনিক হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থায় সুসজ্জিত থাকা। সেই রকম বাতাবরণ তৈরির প্রয়োজন আছে যাতে পড়ুয়ারা তাদের শিক্ষাগ্রহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে।
৪। উদ্যোগী নেতৃত্ব
উদ্যোগী নেতৃত্বের তিনটি দিক আছে। প্রথম, সমস্যার খোঁজ করে তাকে উন্নয়নের প্রেক্ষিতে সমাধান করে ফেলা। উদ্যোগপতি হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হল আমাদের চাহিদা কী তা বুঝে নেওয়া এবং তার সঙ্গে বুঝে নেওয়া যে, মানুষ হিসেবে সকলেরই চাহিদা একই ধরনের হয়। দ্বিতীয়, ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা। উদ্যোগপতি অন্যের থেকে ভিন্নভাবে কাজ করেন, সাহসী চিন্তা করেন, এবং তা সকল সময়েই হয় ঝুঁকিপূর্ণ। বৃহৎ লাভের জন্য কেমন ভাবে পরিকল্পিত ঝুঁকি নিতে হয়, তার শিক্ষা আমাদের সন্তানদের দিতে হবে। তৃতীয় অংশটি হল সঠিকভাবে কাজ করার সদিচ্ছা।
৫। নৈতিক নেতৃত্ব
নৈতিক নেতৃত্বের দু’টি বিষয় আছে। প্রথমত, বাধ্যকারী এবং শক্তিশালী স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা থাকতে হবে, যার লক্ষ্য হবে মানুষের কল্যাণ। অর্থাৎ, যে অবস্থায় আজ মানুষ আছে, ভবিষ্যতে তার থেকে উন্নত অবস্থায় তাকে তুলে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে উদ্যোগী নেতৃত্ব চায় মানুষ সঠিক কাজ করার অভ্যাস করুক, সেখানে নৈতিক নেতৃত্ব সঠিক কাজ করার সদিচ্ছা তৈরি করে দেবে, এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্যকেও সেই সঠিক কাজ করার প্রেরণা দেবে।
