একইভাবে আমাদের এই গ্রহ অন্তহীনভাবে সচল রয়েছে, আবর্তিত হচ্ছে তার কক্ষ পথে। এ গ্রহের সবকিছুই পৃথিবীর মুভমেন্টের অংশ, যদিও আমাদের কাছে মনে হয় আমরা স্থির ও গতিহীন অবস্থায় রয়েছি। আমি যেহেতু এ গ্রহেরই অংশ সেহেতু আমিও সচল শক্তির অংশ। এ গ্রহের যে মূল পরিচালনা শক্তি, তা আমার ভেতরেও রয়েছে।
ডায়ারের মতে, আমরা আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করতে এই শক্তিকে কাজে লাগাতে পারি। কারণ আমাদের ভেতরে যেমন আকাঙ্ক্ষা আছে তেমনি আকাঙ্ক্ষা পূরণের শক্তিও আছে। এটা মূলত একটা বিন্যাসের মত বিষয় যা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে প্রচণ্ডভাবে কেন্দ্রীভূত করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক দর্শন এক হয়েছে। আমি বেশ কয়েক বছর ধরে কিছু পবিত্র স্থান পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে সাধক তাপস ও ভবিষ্যতদ্রষ্টাদের মাজার ও তীর্থস্থানে গিয়েছি। আমার ভেতরে যে দর্শন লুকায়িত ছিল সে সব স্থানে গিয়ে তা নিজেই আবিষ্কার করেছি। এসব জায়গায় ভ্রমন করে দেখেছি বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে এক অপূর্ব সুফী সাধক ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের কাছে অনুসরণীয় হয়ে ওঠেন।
একবার এক ধর্মগুরুর সংগে বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের সংমিশ্রণ বিষয়ে আলাপ করেছিলাম। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন এক পূণ্যাত্মা কীভাবে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন। এমন কি সাধারণ মানুষের খাবার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
তার আশ্রমের এক অংশে দেখলাম রোগীদের চিকিৎসা চলছে। অন্যত্র দেখলাম একটি ধ্যানাগার যেখানে মেডিকেল সায়েন্স ও যোগসাধনার তালিম দেওয়া হচ্ছে।
আহমেদাবাদে অবস্থিত স্বামী নারায়ণ সংস্থার আচার্য প্রমুখ স্বামী মহারাজার সংগে ২০০১ সালের ১৩ জুন আমি দেখা করেছিলাম। স্বামীজীর সংগে আমার আলোচনার বিষয় ছিল বিজ্ঞান ও ধর্মের সংমিশ্রন চিন্তা এবং এই চিন্তা কীভাবে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রায় ১ ঘণ্টা আমাদের কথোপকথন হয়। স্বামীজীকে আমি যেসব প্রশ্ন করেছিলাম এবং তিনি উত্তরে যা যা বলেছিলেন তার কিছু অংশ উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না।
আব্দুল কালাম (আ: কা:) : স্বামীজি, ১৮৫৭ সাল থেকেই ভারত স্বাধীনতা লাভের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের সময় লেগেছে ৯০ বছর। পরাধীনতার এই সময়ে গোটা জাতি তরুণ-বৃদ্ধ, ধনী-গরীব, শিক্ষিত-নিরক্ষর সবাই তাদের উদ্দেশ্য লাভের ক্ষেত্রে ছিল সম্মিলিত ও একান্নবর্তী।
তখন সবার লক্ষ্য ছিল একটাই, সবার সচেতন দাবি ছিল শুধুই স্বাধীনতা। স্বামীজি, আজ এই স্বাধীন ভারতের সবার প্রধান চাওয়া কি হতে পারে? গত পঞ্চাশ বছর ধরে ভারত উন্নয়নশীল একটি দেশ। কারণ আর্থিকভাবে এদেশ শক্তিশালী নয়, সামাজিকভাবে এটি সুস্থিত নয়, প্রতিরক্ষায় এদেশ এখনও স্বয়ং সম্পূর্ণতা পায়নি। এসব কারণেই ভারতকে বলা হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ। টিআইএফএসি (টেকনোলজি ইনফরমেশন, ফোকাসিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট কাউন্সিল)র প্রায় ৫ শ সদস্য ভারতের পরবর্তী প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে তাদের মতামত ব্যাখ্যা করেছেন। আগামী ২০ বছরের মধ্যে ভারতকে উন্নয়নশীল থেকে কীভাবে উন্নত দেশে পরিণত করা যায়? আমরা এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্নয়ন করা দরকার বলে মনে করছি। সেগুলো হল : শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা, কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগ, ভৌত অবকাঠামো এবং উন্নত প্রযুক্তি। স্বামীজি, আমরা আমাদের কর্মপরিকল্পনা ও প্রকল্প সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে পারি, কিন্তু আমাদের এই বিশাল পরিকল্পনায় জনগণকে কীভাবে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করব?
আমাদের দরকার দক্ষ ও সচেতন জনশক্তি। তা না হলে আমাদের জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার সম্ভব হবে না। এ লক্ষ্য অর্জনে আপনার পরামর্শও প্রয়োজন স্বামীজি!
স্বামীজি : এই পাঁচটির সংগে আরেকটি বিষয় যোগ করতে হবে। ষষ্ঠ বিষয়টি হলো ঈশ্বরে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মবাদের মাধ্যমে জনগণকে গড়ে তোলা। এটা খুবই জরুরী। আমাদের প্রথমে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ক্ষেত্র গড়ে তুলতে হবে। আজকের এই দুর্নীতি ও অপরাধ কবলিত সমাজকে শুদ্ধ করতে পারে শুধুমাত্র নৈতিক মূল্যবোধ যা ধর্মপালনের মাধ্যমে অর্জন করা সহজ হয়। আমাদের এমন জনশক্তি তৈরী করতে হবে যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এবং তার অলিখিত আইন মেনে চলে। এজন্য দরকার এক পুনরুদ্দীপ্ত বিশ্বাস। এতে আমাদের লক্ষ্য পূরণ সহজ হয়ে পড়বে। আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারব।
আ: কা: স্বামীজি, ভারতভূমিকে উন্নত দেশে রূপান্তরের মত এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কি প্রথমে আমাদের ঈশ্বরে বিশ্বাসের মত স্পিরিচুয়াল ট্রেডিশান গড়ে তুলতে হবে? তারপর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিতে হবে? নাকি যুগপৎভাবে সব বিষয়কে নিয়ে এগুতে হবেঃ
স্বামীজি : সবগুলো বিষয়কে একত্রে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগুতে হবে। দেশের অগ্রগতির জন্য তোমার বিশেষজ্ঞদল যে পাঁচ বিষয়কে চিহ্নিত করেছে তার সবগুলোই একটি অন্যটির সহযোগী হিসেবে এগিয়ে যাবে। আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি আমাদের পারা (আধ্যাত্মিক) ও অপারা (পার্থিব) উভয় বিদ্যা অর্জনের শিক্ষা দেয়। সে মতে অপারা বিদ্যা অর্জনের সংগে সংগে একজন মানুষ পারা বিদ্যাও অর্জন করতে পারে। যে এই মন্ত্রের গুঢ়ার্থ বুঝতে পারবে তখন ধর্ম ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির ওপর তার অপারা বিদ্যা প্রতিষ্ঠিত হবে।
