একটি বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে যে এই তিন বিজ্ঞানী বুঝতে পেরেছিলেন বিজ্ঞান কীভাবে দেশের জন্য কাজ করে তা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বুঝতে হবে। তাদের বক্তব্য ছিল–
যে সকল প্রযুক্তি জনগণের জন্য দ্রুত উন্নয়ন বয়ে আনে সেগুলোর ব্যবহার প্রচলন করতে হবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়, তা সে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন। এদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিজ্ঞান ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্বের উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক বিজ্ঞানই হল মুখ্য। আন্তরিকভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মূল্য বুঝতে হলে তাদের কাছ থেকে আমাদের নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে হবে।
১৯৬২ সালে ডক্টর সারাভাই এবং ডক্টর ভাভা বিষুবীয় অঞ্চলে স্পেস রিসার্চ স্টেশন প্রতিষ্ঠার জন্য উপযোগী একটি জায়গা খুঁজছিলেন।
বিষুবীয় এলাকার নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কেরালার থাম্ব অঞ্চলটাকেই তাদের কাছে অবশেষে আয়োনেস্ফেরিক গবেষণার জন্য সবচে উপযোগী মনে হল। হাজার হাজার দরিদ্র জেলের বাস ছিল থাম্বা জেলায়। সেখানে ছিল সেন্ট ম্যারি ম্যাগডালেন্স চার্চ নামে সুন্দর একটি গীর্জা আর বিশপদের কোয়ার্টার। রিসার্চ সেন্টার গঠনের জন্য ওই জমি অধিগ্রহণ করতে কোন বেগ পেতে হয়নি।
ডক্টর সারাভাই প্রধান ধর্মযাজক ডক্টর পিটার বার্নার্ড পেরেইরার সংগে এক শনিবার দেখা করে জায়গাটি গবেষণাগারের জন্য ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলেন। বিশপ প্রশান্তভাবে হেসে সারাভাইকে পরের দিন আবার আসতে বললেন। রোববার সারাভাইকে সাথে নিয়ে বিশপ তার সাপ্তাহিক ভাষণে বললেন, শিশুরা, আমার সংগে একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী রয়েছেন। তিনি তার বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রের জন্য আমাদের এই গীর্জা ও আমার ভবনটি প্রার্থনা করছেন। বিজ্ঞান সত্যের অনুসন্ধান করে যা মানবজীবনকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তোলে। আধ্যাত্মিক সাধনাই সর্বোত্তম ধর্ম। ধর্মোপদেশ দাতারা মানবাত্মার শান্তির জন্য করুণাময় ঈশ্বরের সাহায্য চান। আসল কথা হলো, বিক্রম সারাভাই যা করছেন এবং আমি যা করছি–এ দুটোই এক অর্থে সমপর্যায়ের। বিজ্ঞান ও ধর্মের মূল কাজ হলো মানুষের দেহমনের কল্যাণ বয়ে আনার জন্য ইশ্বরের সহায়তা প্রার্থনা। আমার শিশুরা, আমরা কি বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য পূরণের জন্য ঈশ্বরের এ ঘর তাদের হাতে হস্তান্তর করতে পারি?
খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতার পরে অগনিত শিশুর সম্মতিসূচক আমেন ধ্বনিতে গীর্জা কক্ষ যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো।
১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ডক্টর বিক্রম সারাভাইয়ের সংগে কাজ করার দুর্লভ অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। তরুণ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার অধীনে থিরুভানানথাপুরাম স্পেস স্টেশনে আমি কম্পোজিট টেকনোলজি, এক্সপ্লোসিভ সিস্টেম এবং রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমের ওপর কাজ করেছি।
এ সময়টাতে তার নেতৃত্ব থেকে আমি এক দুর্লভ শক্তি সঞ্চয় করি। যদিও আমাদের দেশে তখন প্রযুক্তিগতভাবে শৈশবে নিজেদের নির্মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের স্বপ্ন দেখছিলাম। তার স্বপ্ন ছিল ভারতের মাটি থেকে সানসিস্ক্রোনাস কক্ষপথে রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট এবং জিওসিংক্রানাস কক্ষপথে কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট পাঠাতে হবে। আজ জিএসএলভি (জিওসিষ্ক্রোনাস লাঞ্চ ভেইকল) উৎক্ষেপনের মাধ্যমে তার সে স্বপ্ন সফল হয়েছে।
এছাড়াও কক্ষপথে ইণ্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অরগানাইজেশন আইআরএস ও ইনস্যাট সিস্টেম প্রতিস্থাপন করেছে যাতে সাধারণ মানুষও স্পেস বা মহাকাশযানের সুফল ভোগ করতে পারে।
ডক্টর সারাভাইয়ে স্পেস প্রোগ্রাম সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। অবশ্য এ বিষয়ে আমি আমার উইংস অব ফায়ার বইয়ে সংক্ষিপ্তাকারে লিখেছি।
ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট মহাযান এসএলভি-৩-এর ডিজাইন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার (ভিএসএসসি) থেকে। রকেট, তাপরোধক প্রক্রিয়া এবং গাইডেন্স সিস্টেমের প্রত্যেকটি পর্যায়ের ডিজাইন নির্বাচিত প্রকল্প নেতৃবৃন্দের হাতে দেওয়া হয়েছিল। এসএলভি-৩ এর চতুর্থ পর্যায়ের ডিজাইন প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলাম আমি। আমার প্রকল্পাধীন পর্যায়টি ছিল রকেটের ওপরের দিকের অংশ যেটি মহাযান রোহিনীকে কক্ষপথে চূড়ান্ত ভাবে প্রতিস্থাপন করতে সহায়তা করবে। রকেটের এই অংশটি নির্মাণ করতে দরকার হয় সর্বাধুনিক শক্তিশালী ধাতব উপাদান যেটি প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন কিন্তু ওজনে হাল্কা। এটা সর্বোচ্চ পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জ্বালানীও বহন করার কাজ করে। ১৯৭০ সালে যখন আমি রকেটে এ অংশের ডিজাইনের কাজে ব্যস্ত, তখন খবর পেলাম ডক্টর সারাভাই ফরাসী স্পেস এজেন্সি সিএনইএসর চেয়ারম্যান হুবার্ট কিউরিয়েনকে সাথে নিয়ে থিরুভানানথাপুরাম পরিদর্শনে আসছেন।
কিউরিয়েনের টীমের কাছে চতুর্থ পর্যায়ের ডিজাইন সম্পর্কে আমাকে বলতে বলা হল। আমার ডিজাইন তাদের কাছে উপস্থাপনের পর জানলাম, ফ্রান্সের ডায়ামন্ট পি-৪ উৎক্ষেপন যানেও আমার ডিজাইনকৃত চতুর্থ পর্যায়টির মতো ডিজাইন ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিএনইএস জানাল তাদের আমাদের চেয়ে দ্বিগুন ওজনের একটি অ্যাপোজি রকেট মটর এবং আমাদের ডিজাইনকৃত চতুর্থ অংশের মত একটি অংশ দরকার।
